আজিম নিহাদ:
কক্সবাজার জেলার আট থানায় ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মানবপাচার মামলা হয়েছে ৪৬৭ টি। কিন্তু দীর্ঘ আট বছরে একটি মামলাও নিষ্পত্তি হয়নি। স্বাক্ষীর অভাবে অধিকাংশ মামলারই অচলাবস্থা। মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে মানবপাচারের শিকার লোকজন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং বিচার বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি পাচারকারীদের শাস্তি না হওয়ায় থামছেনা মানবপাচারও।

মানবপাচার মামলার বিচারে গতি আনয়ন বিষয়ক একটি সভায় বেসরকারি সংস্থা নোঙর এ তথ্য তুলে ধরেন। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের আটটি থানায় ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৪৬৭ টি মানবপাচার মামলা হয়েছে। এরমধ্যে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ৯৭ টি, রামু থানায় ২৪ টি, উখিয়া থানায় ৬৮ টি, টেকনাফ মডেল থানায় ২১৮টি, চকরিয়া থানায় ১৯ টি, কুতুবদিয়া থানায় ১টি, মহেশখালী থানায় ৩৬টি এবং পেকুয়া থানায় ৮টি মামলা হয়েছে। থানায় দায়ের হওয়া এসব মামলার বাইরে আরও মানবপাচার মামলা রয়েছে। যেগুলো ট্রাইবুন্যালে দায়ের করা হয়েছে।

মামলাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৪৬৭ মানবপাচার মামলার একটিও নিষ্পত্তি হয়নি। এরমধ্যে আসামী হাজিরার জন্য আছে ৬টি মামলা। এফআইআর পর্যালোচনার জন্য আছে মাত্র ১টি মামলা। চার্জ গঠনের অপেক্ষায় আছে ৭৪টি এবং তদন্তাধীন রয়েছে ২৮ টি মামলা। আমলী আদালতে শুনানীর (কগনিজেন্সের জন্য) অপেক্ষায় আছে ৮০টি মামলা। এবং চার্জ গঠনের অপেক্ষায় আছে ৭৪টি। স্বাক্ষীর অভাবে ১২৮টি মামলায় অচলাবস্থা তৈরী হয়েছে। এক প্রকার থমকে আছে মামলাগুলো। ১৫০ টি মামলায় আসামীদের সম্পদ ক্রোকের জন্য আদালত আদেশ দিলেও একটিও কার্যকর হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারের মানবপাচার মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ার পেছনে একমাত্র কারণ স্বাক্ষী এবং বাদীদের আদালতে হাজির না হওয়া। স্বাক্ষী হাজির না হওয়ার কারণে মানবপাচার মামলায় কোন ধরণের অগ্রগতি নেই। মামলায় স্থবিরতা এবং শাস্তি না হওয়ার কারণে মানবপাচারকারীরা আরও সুযোগ নিচ্ছে। সুযোগ পেলেই জড়িয়ে যাচ্ছে ফের মানবপাচারে। একারণে কক্সবাজার অঞ্চলে মানবপাচার বন্ধ হচ্ছে না।

মানবপাচারের শিকার সুমন বড়–য়া (৩২), বদিউল আলম (৫২) সহ বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, মামলায় স্বাক্ষী দেওয়ার জন্য আদালত বা থানা থেকে কোন ধরণের নোটিশ দেওয়া হয় না। মাঝেমধ্যে আদালতে মামলার বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে গেলে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), পেশকার এবং দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানিয়ে দেন, মানবপাচার মামলাগুলোর বাদী সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে এসব মামলা পরিচালনা হচ্ছে। তাই স্বাক্ষীদের আদালতে যাওয়ার দরকার নেই। পুলিশের পক্ষ থেকেও কিছু জানানো হয় না। এই সুযোগে মানবপাচারকারীরা জামিনে বের হয়ে এসে স্বাক্ষীদের উপর প্রভাব বিস্তার করে।

২০১৯ সালের জুলাই থেকে মানবপাচার মামলায় গতি আনয়নে কাজ করছে বেসরকারী সংস্থা ‘নোঙর’। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) শহরের কলাতলীর একটি হোটেলের সম্মেলন কক্ষে সভার আয়োজন করে নোঙর। সেখানে মানবপাচারের শিকার ব্যক্তি, আইনজীবী ও নোঙরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নোঙরের প্রকল্প কর্মকর্তা হাশেম ভূঁইয়া বলেন, মানবপাচারের শিকার হওয়ার পর তারা আদালতে গেলে সেখানেও হয়রানি-নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়ে স্বাক্ষী দিতে আসতে চায় না। মামলা কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে ভিকটিমদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে নোঙর। এরজন্য সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্যানেল আইনজীবীও নিয়োগ করা হয়েছে। একারণে সম্প্রতি মানবপাচার মামলায় গতি আসতে শুরু করেছে।

জেলা জজ আদালতের আইনজীবী শামসুল হক বলেন, স্বাক্ষীরা স্থানীয়ভাবে চেয়ারম্যান এবং প্রভাবশালীদের চাপে অথবা প্ররোচনায় সামাজিকভাবে সমঝোতা করে। এর ফলে আদালতে স্বাক্ষী দিতে আসে না তারা। এই মামলা কোন অবস্থাতে আপোষ করা যাবে না। এই মামলার শাস্তি হবেই। হয়ত একটু দেরি হচ্ছে।

কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট সাকী-এ-কাউসার বলেন, মানবপাচার মামলা কোনভাবেই আপোষযোগ্য নয়। সঠিক সময়ে আদালতে উপস্থিত হয়ে স্বাক্ষী দিলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং শাস্তি নিশ্চিত হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাড. একরামুল হুদা বলেন, ভিকটিম এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সঠিক সময়ে স্বাক্ষী দিতে আসে না। অনেক ভিকটিম খবরও নেয় না। স্বাক্ষীরা যদি সঠিকভাবে আদালতে এসে স্বাক্ষী দেয় তাহলে মানবপাচার মামলা নিষ্পত্তি করা কোন ব্যাপার না। নোঙরের উদ্যোগের ফলে কিছু কিছু স্বাক্ষী আদালতে আসতে শুরু করেছে। এটি অব্যাহত থাকলে পাচারকারীদের শাস্তি হবেই।

নোঙরের প্রধান নির্বাহী দিদারুল আলম রাশেদ বলেন, কক্সবাজারে মানবপাচারের অহরহ ঘটনা ঘটলেও মামলা হয়েছে গুটিকয়েক। এরমধ্যে একটি মামলারও সুরাহা হয়নি। এটা কোনভাবে কাম্য নয়। যারা দুঃসাহস দেখিয়ে মামলা করার জন্য এগিয়ে এসেছে তাদেরকে সমাধান দিতে না পারাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটার সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা উল্টো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে।

তিনি আরও বলেন, মানবপাচার আইন অনুযায়ী এই মামলার ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগ গঠন এবং ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হল গত আট বছরে একটি মামলারও বিচার কাজ শেষ হয়নি। ফলে মানবপাচার প্রতিরোধে প্রণীত আইনের কোন সুফল পাচ্ছে না ভিকটিমরা এবং পাচারও রোধ করা যাচ্ছে না।

দিদারুল আলম রাশেদ বলেন, কক্সবাজারে বেশির ভাগ মামলা ঝুলে স্বাক্ষীর অভাবে। স্বাক্ষীরা আদালতে হাজির না হওয়ার পেছনে বেশকিছু কারণ খুঁজে পেয়েছি আমরা। সেই কারণগুলো তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করা হয়েছে। সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রত্যেকে মানবপাচার মামলা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে সমস্যাগুলো নিরসনে সহযোগিতা করার আশ^াস দিয়েছেন। নোঙরও সকল স্বাক্ষীদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।

সভায় বক্তব্য রাখেন নোঙরের সহকারী প্রকল্প সমন্বয়ক সোহেল উদ্দিন, প্যানেল আইনজীবী আনোয়ার ইসলাম, রাবেয়া সুলতানা, বিশ^জিত ভৌমিক, জেলা শ্রম ও কর্মসংস্থান কার্যালয়ের প্রতিনিধি মিটুন মুৎসুদ্দী, নোঙরের কর্মকর্তা কানেতা আক্তার প্রমুখ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •