আবদুর রহমান, (বাংলা ট্রিবিউন) টেকনাফ:
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ সংক্রান্ত মামলায় চারটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছেন জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে)। এ রায়ে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা প্রথম জয়ের স্বাদ পেয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, যুগ যুগ ধরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নির্যাতনের শিকার হলেও কোনও বিচারই পায়নি। এই রায় তাদের স্বস্তি এনে দিয়েছে। গাম্বিয়ার করা মামলায় ছয়টি দাবির মধ্যে চারটি পক্ষে আসায় প্রথম জয় হয়েছে তাদের। এজন্য মনে হচ্ছে প্রথম বিচারের স্বাদ পেয়েছেন তারা। এ রায়ে তারা খুশি। তবে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করারও দাবি তাদের।

বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ সংক্রান্ত মামলায় চারটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে)। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তারা এমন মন্তব্য করেন।

বৃহস্পতিবার বিকালে টেকনাফের লেদা, শালবন নয়াপাড়া ও লেদা রোহিঙ্গা শিবির ঘুরে দেখা গেছে, রায়ের খবর শুনতে ছোট ছোট দোকানে রোহিঙ্গারা ভিড় করছেন।

টেকনাফের নয়াপাড়া নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আবদুল হামিদ বলেন,‘আইসিজের দেওয়া রায়ে আমরা অনেক খুশি, এটি মাত্র শুরু। এটি বিচারের প্রথম স্বাদ। তাছাড়া এই রায় দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চাই। কিন্তু, প্রত্যাবাসনের বিষয়টি যদি সামনে আনা যেত, তাহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরু হতো।’

বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন (ইউকে) প্রধান থুন কিং বলেন, ‘এ রায়ের মাধ্যমে মিয়ানমার আরও বেশি চাপে পড়বে। কেননা, এই মামলায় মিয়ানমার স্টেট কাউন্সিলর প্রধান অং সান সু চি নিজে উপস্থিত ছিলেন। যদি বা বিভিন্ন সময়ে স্বাধীন তদন্ত প্যানেলের নামে বারবার রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত গণহত্যার ঘটনাগুলো এড়িয়ে গিয়ে সরকারি বাহিনীকে রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে।’

রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) সাধারণ সম্পাদক মাস্টার সৈয়দ উল্লাহ বলেন,‘ছয়টি দাবির মধ্যে চারটি আমাদের পক্ষে এসেছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, রোহিঙ্গা গণহত্যার বিরুদ্ধে অং সান সু চির যুক্তি খারিজ করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে সেখানে গণহত্যা হয়েছে। এজন্য রায়ের দিন সু চি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এই রায় থেকে সু চির লজ্জা পাওয়া উচিত। তবে প্রত্যাবাসনের বিষয় নিয়ে যদি আলোচনা করতো, তাহলে আরও ভালো হতো।’

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে শূন্যরেখা রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘আইসিজের রায়ে খুশি, এটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য প্রথম জয়। কেননা, যুগ যুগ ধরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নির্যাতনের শিকার হলেও কোনও বিচার পায়নি। এই রায়ে মনে হচ্ছে প্রথম বিচারের স্বাদ পেয়েছি।’

এদিকে রোহিঙ্গা ওমেন ওয়েলফেয়ার সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডভোকেট রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘এটা মাত্র শুরু, এই রায় স্বপ্ন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘আইসিজের ঘোষিত রায়ের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ক্যাম্পে নজরদারি রাখা হয়েছে।’

বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আইসিজের বিচারক আবদুল কায়ি আহমেদ ইউসুফ এই আদেশ দেন। আদেশে রোহিঙ্গাদের ওপর শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, গণহত্যা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মিয়ানমারকে গণহত্যায় অভিযুক্ত করেছে আইসিজে। গণহত্যা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য গাম্বিয়ার আবেদনকে যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন এই আন্তর্জাতিক আদালত।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরদার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। দেশটির সেনাবাহিনী রাখাইনে হত্যাকাণ্ড, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করলে জীবন বাঁচাতে নতুন করে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এই নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মামলা করে গাম্বিয়া। মামলায় প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও সংঘাত আরও তীব্রতর না হওয়ার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিতে আদালতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল দেশটি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •