সিবিএন ডেস্ক:
ইরানের এলিট বাহিনী কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পূর্বাপর ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। এতে হত্যার পরিকল্পনা থেকে হত্যাকাণ্ডের পরের এক সপ্তাহের হোয়াইট হাউস, পেন্টাগন ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের অন্দরের চালচিত্র উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনে সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড নিয়েও আছে চমকপ্রদ তথ্য। প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, কূটনীতি ও সমরনীতির অজানা অধ্যায়। প্রতিবেদনটি তৈরিতে নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক পিটার বেকার, রনেন বার্গম্যান, ডেভিড ডি. কিরপ্যাট্রিক, জুলিয়ান ই. বার্নস ও অ্যালিসা জে. রুবিন ছাড়াও ঘটনাসংশ্নিষ্ট অনেকেই অবদান রেখেছেন। আজ ছাপা হলো দ্বিতীয় কিস্তি। ভাষান্তর ইলিয়াস হোসেন

ফ্লোরিডায় টেলিভিশনে এসব অরাজকতা দেখে ট্রাম্প উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি আরও কঠোর জবাব দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সেনা পাঠাতে প্রস্তুত ছিলেন। ৩১ ডিসেম্বর যখন বিক্ষোভ শুরু হয়, তখন ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট ও’ব্রিন স্বাক্ষরিত একটি অতি গোপনীয় নথি বিতরণ শুরু হয়, যাতে ইরানের জ্বালানি স্থাপনা এবং রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল জাহাজে হামলার টার্গেট করা হয়। ইরানের এই জাহাজটি দেশটির জলসীমায় তেল ট্যাঙ্কার ও বোটকে হয়রানির কাজে ব্যবহূত হয়। বেশ কয়েকটি ট্যাঙ্কারে গোপন হামলার কারণে জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ ছিল কয়েক মাস ধরেই।

রবার্ট ও’ব্রিনের নথিতে আরও উত্তেজনাকর বিকল্পও ছিল। তা হলো সামরিক হামলার মাধ্যমে ইরানের নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের হত্যা। বিশেষ করে ইয়েমেনে ইরানের কমান্ডার আবদুল রেজা শাহলাই। তিনি ওই অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়নে নিয়োজিত। জেনারেল সোলাইমানি যুক্তরাষ্ট্রে তেমন পরিচিত ছিলেন না। তবে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা ও মৃত্যুর জন্য তাকেই বেশি দায়ী করে থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা।

এলিট কুদস ফোর্সের প্রধান হিসেবে তিনি ইরানে ছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে ছায়াযুদ্ধে তার হাত ছিল। বিশেষ করে রাস্তার পাশে পুঁতে রাখা বোমা ও অন্যান্য হামলার মাধ্যমে ইরাক যুদ্ধের তীব্র উত্তেজনাময় সময়ে ৬০০ আমেরিকান সেনার মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা হয়।

সরু মুখমণ্ডল, সাদা চুল এবং হালকা দাড়িবিশিষ্ট ৬২ বছর বয়সী জেনারেল সোলাইমানি দেহরক্ষী ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই চলাফেরা করায় খ্যাতি পান। ওই অঞ্চলের কিছু নিষ্ঠুরতম ব্যক্তির সহযোগী হলেও তিনি যোদ্ধাদের পাশে বসে খেতেন এবং তাদের বলতেন, তোমরা মায়ের যত্ন নিও। সিরিয়ার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা একজন হেজবুল্লাহ কমান্ডার এসব তথ্য জানিয়েছেন।

কয়েক দশক নীরবে-নিভৃতে কাজ করার পর আরব বসন্ত ও ইসলামিক স্টেট নামের জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেনারেল সোলাইমানি সবার নজরে আসেন। ইরানের আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ছবিতে দেখা গেছে, তিনি ইরাক ও সিরিয়ার রণাঙ্গনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন; তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে বৈঠক করছেন; লেবাননে হেজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহর পাশে বসে আছেন। গত বছর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ইরান সফরে গেলে জেনারেল সোলাইমানিই তাকে অভ্যর্থনা জানান।

২০১৯ সালের শেষে এসে জেনারেল সোলাইমানি ইরানের অনেক অর্জনের জন্য গর্ব করতে পারতেন। কয়েক বছর বহু রণাঙ্গনে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের পরও ক্ষমতায় টিকে আছেন ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র বাশার আল আসাদ। ইসরায়েল সীমান্তে স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে কুদস ফোর্স। জেনারেল সোলাইমানির মদদপুষ্ট বহু মিলিশিয়া এখন ইরাক সরকারের কাছ থেকে বেতন পায় এবং দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার। অংশত তার সমর্থিত স্থল বাহিনীর কারণে ইরাক ও সিরিয়ায় পরাজিত হয়েছে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এ জায়গাটিতে অবশ্য তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের মিল ছিল।

গত ১৮ মাস ধরে জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার টার্গেট করা নিয়ে আলোচনা করছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। অবশেষে ঐকমত্য হয়, ইরানে তার ওপর হামলা খুবই কঠিন হবে। কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন, সিরিয়া ও ইরাকে তার সফরকালে তাকে টার্গেট করা হবে। এ জন্য তার গতিবিধির ওপর নজরদারি করতে সাতটি ভিন্ন জায়গায় গুপ্তচর নিয়োগ দেওয়া হয়। এগুলো হলো সিরীয় সেনাবাহিনী, দামেস্কে কুদস ফোর্স, দামেস্কে হেজবুল্লাহ, দামেস্ক ও বাগদাদ বিমানবন্দর, কাতাইব হেজবুল্লাহ ও ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স।

গত মে মাসে চারটি তেল ট্যাঙ্কারে হামলার পর ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে ট্রাম্পের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টন সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীকে ইরানি আগ্রাসন ঠেকাতে নতুন পন্থা উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। পরে তার কাছে যেসব বিকল্প উপস্থাপন করা হয়, তার মধ্যে জেনারেল সোলাইমানি ও রেভল্যুশনারি গার্ডের অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার বিষয়টিও ছিল। তখন থেকেই জেনারেল সোলাইমানির চলাফেরার ওপর নিবিড় নজরদারি শুরু হয়।

সেপ্টেম্বর নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এবং জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশন্স কমান্ড সম্ভাব্য অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। বেশ কিছু বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়, যার কিছু সিরিয়া ও ইরাকে বাস্তবায়ন হতে পারে। তবে সিরিয়াকে বেশ জটিল মনে করা হয়। কারণ সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত। তা ছাড়া জেনারেল সোলাইমানি সেখানে বেশিরভাগ সময় কাটান হেজবুল্লাহ নেতাদের সঙ্গে। পাশাপাশি এতে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের আশঙ্কাও ছিল।

সিরিয়া ও ইরাকে নিযুক্ত গুপ্তচররা জেনারেল সোলাইমানির গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য দিতে শুরু করেন। তার ওপর নজরদারিতে নিযুক্ত এক কর্মকর্তা বলেন, জেনারেল সোলাইমানি বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে চলাফেরা করতেন। একটি যাত্রার জন্য একাধিক টিকিটও কিনে রাখতেন, যাতে তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট বোঝা না যায়। একদম শেষ মুহূর্তে তিনি বিমানে উঠতেন এবং তিনি বিজনেস ক্লাসের সামনের সারিতে বসতেন, যাতে তিনি সবার আগে নেমে দ্রুত চলে যেতে পারেন।

জেনারেল সোলাইমানির শেষ যাত্রার তারিখ নির্ধারিত হয় নতুন বছরের প্রথম দিন। তিনি প্রথমে দামেস্ক যাবেন এবং সেখান থেকে গাড়িতে লেবানন গিয়ে হেজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহর সঙ্গে বৈঠক করবেন। এর পর সন্ধ্যায় দামেস্ক ফিরে আসবেন।

পরে এক ভাষণে হাসান নাসরাল্লাহ ওই বৈঠক সম্পর্কে বলেন, তিনি জেনারেল সোলাইমানিকে সতর্ক করে দেন- যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম তার দিকে দৃষ্টি দিয়েছে এবং তার ছবি ছাপাচ্ছে। এটা তাকে হত্যা প্রস্তুতির অংশ। নাসরাল্লাহ বলেন, তার কথা শুনে জেনারেল সোলাইমানি হেসে ওঠেন এবং বলেন, তিনি তো শহীদি মৃত্যুই চান। নাসরাল্লাহ যেন তার জন্য এই দোয়াই করেন।

কাকতালীয়ভাবে সেদিনই সিআইএর সদর দপ্তরে বসে জেনারেল সোলাইমানির সেই ইচ্ছা পূরণে কাজ করছিলেন সংস্থারটির প্রধান গিনা হাসপেল। তিনি জানতে পারেন, জেনারেল সোলাইমানি সিরিয়া থেকে ইরাকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কর্মকর্তারা তাকে জানান, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকান সেনাদের বিতাড়িত করতে ব্যাপকভিত্তিক হামলার পরিকল্পনা করছেন জেনারেল সোলাইমানি। তবে এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ছিল না। বরং সিআইএ কর্মকর্তারা জানান যে, টুকরো টুকরো তথ্যের সমন্বয়ে তারা এমন ইঙ্গিত পাচ্ছেন। একে বলা হয় ‘মোজাইক অ্যাফেক্ট’।

বলা হয়, জেনারেল সোলাইমানি ওই অঞ্চলে বিশেষ করে সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে তাদের প্রক্সি বাহিনীকে সমবেত করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ও ঘাঁটিতে হামলা চালাতে চায় তারা। তবে একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, তাদের কাছে এমন সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না, যার জেরে বলা যায় এই হামলা ছিল ‘আসন্ন’; যেমনটা দাবি করেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। তবে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করছিলেন তারা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •