ছবি সংগৃহীত

মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজারের কেজি স্কুল (কিন্ডারগার্টেন) গুলো হাইকোর্টের নির্দেশনা না মেনে শিশুদের প্রতিক্লাসে ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত ৯ টি থেকে ১৫ টি পর্যন্ত অননুমোদিত বই জোর করে কিনাচ্ছে। ফলে কেজি স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা অপ্রয়োজনীয় বই এর ভারে অনেকটা ন্যূজ হয়ে পড়ছে। পারছেনা কোমলমতি শিশুরা অপ্রয়োজনীয় বইয়ের চাপ সামলাতে। অথচ ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত অননুমোদিত বইগুলোর আদৌ কোন প্রয়োজন নেই।

২ বছর আগে মহামান্য হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ শিশুদেরকে ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বই দিয়ে বোঝা না চাপানোর জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কক্সবাজারের কেজি স্কুল গুলো হাইকোর্টের এ আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কোমলমতি শিশুদেরকে অপ্রয়োজনীয় ও অননুমোদিত বই ৪/৫ গুন বেশি মুল্যে কিনতে ও বহন করতে বাধ্য করছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ডিপিইও) মোঃ শফিউল আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি সিবিএন-কে জানান, লোকবল সংকটের কারণে কক্সবাজারের কেজি স্কুল গুলোকে পর্যাপ্ত দেখভাল করা সম্ভব হচ্ছেনা। প্রয়োজনের তুলনায় যে অপ্রতুল লোকজন রয়েছে, সে গুলো দিয়ে কোনরকমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রেজিস্ট্রাড প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলো নিয়ন্ত্রণ করছি। ফলে জেলার কেজি ও কেজি মানের স্কুল গুলো দেদারসে বেপরোয়া শিক্ষা বাণিজ্য করে যাচ্ছে। অনেকটা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে কক্সবাজারের কেজি স্কুল গুলো।

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা কিন্ডারগার্ডেন স্কুল এসোসিয়েশনের সভাপতি ও কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের ফোরামটা শুধুমাত্র বৃত্তি পরীক্ষা কেন্দ্রীক। অন্যান্য বিষয় প্রত্যেক কেজি স্কুল স্বাধীনভাবে নিজ নিজ স্কুলের পাঠ্যক্রম ও বই নির্ধারণ করে থাকে। তবে প্রত্যেক কেজি স্কুলে ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বই ছাত্র ছাত্রীদের দিয়ে আবশ্যিকভাবে ক্রয়, বহন ও পড়ানো হয় বলে তিনি সিবিএন-এর কাছে স্বীকার করেন। অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, তাঁর নিজের বিদ্যালয় কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজে আগামী ২০২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত কোন বই ছাত্র ছাত্রীদের পড়ানোর জন্য দেওয়া হবেনা। বই ক্রয় বাবদ কোন কমিশন, ডোনেশন বা উপঢৌকন আগামী ২০২১ সাল থেকে লাইব্রেরি বা প্রকাশক হতে নেওয়া হবেনা। এ বিষয়ে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ পরিচালনা পর্ষদের ১৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে তিনি সিবিএন-কে জানান। অতি প্রয়োজনীয় ও মান সম্মত ২/১ টি বই প্রয়োজন হলে সেগুলোতে কোন অবস্থাতেই কোন প্রকার ডোনেশন নওয়া হবেনা। অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, মঙ্গলবার ১৪ জানুয়ারি তাঁদেরকে জেলা প্রশাসন ডেকেছিলো। তাঁরা সেখানে ১৯৬২ সালের শিক্ষা অর্ডিন্যান্স ও ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত কোন বই ছাত্র ছাত্রীদের তাঁর স্কুলে না পড়ানোর জন্য কমিটি সহ সকলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন। একইভাবে অন্যান্য কেজি স্কুল গুলোকেও জেলা প্রশাসন এ বিষয়ে কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন বলে তিনি সিবিএন-কে জানান।

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা কিন্ডারগার্ডেন স্কুল এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও শহরের নতুন বাহারছরা ছিদ্দিকিয়া কেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল হাসেম সেলিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি সিবিএন-কে বলেন, প্রত্যেক কেজি স্কুলে ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বই আগে থেকে কেনা ও পড়ানো হয়, আমরাও সেভাবে ছাত্র ছাত্রী এবং তাদের অভিবাবকদের জাতীয় পাঠ্যক্রমের বাইরে কিছু বই ক্রয় করতে বলেছি। তিনি বলেন, অন্যান্য কেজি স্কুল নির্দিষ্ট লাইব্রেরি থেকে জাতীয় পাঠ্যক্রমের বাইরে বই ক্রয় করতে দিলেও আমাদের স্কুলের বই সকল লাইব্রেরি কেনা যাবে। ছিদ্দিকিয়া কেজি স্কুলের ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বই এর জন্য কোন লাইব্রেরি নির্ধারিত নাই বলে প্রধান শিক্ষক আবুল হাসেম সেলিম দাবি করেন। তবে তাঁর দাবির বিপরীতে কক্সবাজার জেলা পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি ও শহরের রক্ষিত মার্কেটের রহমানিয়া লাইব্রেরির মালিক নুরুল ইসলাম বলেছেন, ছিদ্দিকিয়া কেজি স্কুলের বই শুধুমাত্র তাঁর লাইব্রেরিতে বিক্রির জন্য ছিদ্দিকিয়া কেজি স্কুল কর্তৃপক্ষ ও বই এর প্রকাশক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। রহমানিয়া লাইব্রেরির মালিক নুরুল ইসলাম বলেন, তাই ছিদ্দিকিয়া কেজি স্কুলের বই আমার লাইব্রেরি থেকেই বিনা কমিশনে অভিবাবকদের নিতে হয়। প্রাথমিক শিক্ষার বই এর বোঝা বিষয়ক মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা ও ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বই পড়াতে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতির বিষয়ে ছিদ্দিকিয়া কেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল হাসেম সেলিমের কিছু জানা নাই বলে সিবিএন-কে জানিয়েছেন। প্রসঙ্গত, কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র ও কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের মরহুম পিতা আলহাজ্ব ছিদ্দিক কোম্পানির নামে এই কেজি স্কুলটির নামকরণ করা হয়েছে।

গত ১৩ জানুয়ারি কক্সবাজারের কেজি স্কুল গুলোর ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বই এর অধিকাংশ বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার জেলা পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও শহরের রক্ষিত মার্কেটের রহমানিয়া লাইব্রেরির মালিক নুরুল ইসলাম ও সমিতির সাবেক সভাপতি ও মোহাম্মদী লাইব্রেরির মালিক মাওলানা ওমর ফারুককে জেলা প্রশাসন ডেকে তাদেরকে ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বই বিক্রি না করার জন্য কড়াভাবে সতর্ক করে দিলেও তারা প্রকাশ্যে ও নিয়মিত চড়া দামে কেজি স্কুলের প্রদত্ত তালিকা মতে ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বই প্রশাসনের নির্দেশনাকে তোয়াক্কা না করে বিক্রি করছেন অবাধে। এবিষয়ে মোহাম্মদী লাইব্রেরির মালিক মাওলানা ওমর ফারুক সিবিএন-কে বলেন, ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত কেজি স্কুলের প্রদত্ত তালিকার বই ৮০% আগেই বই এর গায়ে লাখা দামে বিক্রি করে ফেলেছি। এখন বাকী ২০% বিক্রি করছি। প্রশাসনের বিধি বিধান মানছেন না কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদী লাইব্রেরির মালিক মাওলানা ওমর ফারুক সিবিএন-কে বলেন, এটা প্রকাশক ও সংশ্লিষ্ট কেজি স্কুলের বিষয়।

একই বিষয়ে কক্সবাজার জেলা পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও শহরের রক্ষিত মার্কেটের রহমানিয়া লাইব্রেরির মালিক নুরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি সিবিএন-কে বলেন, ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত কেজি স্কুলের প্রদত্ত তালিকার বই কি বিক্রি না করতাম? এরকম বলে তার ফোনটির লাইন কেটে দেন। পরে তাকে কল করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
এবিষয়ে জানতে পর পর দুই দিন কক্সবাজার জেলা কিন্ডারগার্ডেন স্কুল এসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কক্সবাজার সরকারি কলেজ গেইটের
এজি মডেল কেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ইসলাম মাহমুদের সেল ফোনে অনেকবার কল করার পর বার বার রিং হলেও তিনিও কল রিসিভ করেননি।