মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজার শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় কেজি (কিন্ডারগার্ডেন) স্কুল অথবা কেজি সিলেবাস নিয়ে পাঠদান করে এমন স্কুলের সংখ্যা প্রায় ২ শ’। এসব কেজি মানের স্কুলে প্রায় ৫৫ হাজার ছাত্র-ছাত্রী প্রাথমিক পর্যায়ে লেখা পড়া করছে। এই অর্ধ্ব লক্ষাধিক কোমলমতি ছাত্র ছাত্রী কক্সবাজার শহরের ২ টি লাইব্রেরির কাছে সম্পূর্ণ জিম্মি হয়ে পড়েছে। লাইব্রেরি ২টির একটি হলো-শহরের প্রধান সড়কের ফজল মার্কেটের সামনে অবস্থিত মোহাম্মদী লাইব্রেরি, অপরটি হলো-শহরের রক্ষিত মার্কেটে অবস্থিত রহমানিয়া লাইব্রেরি।

দেশের ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত কোন বই কেজি স্কুলে পড়াতে হলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ডিপিইও) থেকে অনুমতি নিয়েই পড়াতে হবে, সরকারের এরকম কঠোর বিধান রয়েছে। কিন্তু কক্সবাজার জেলা শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় ২শ’ কেজি স্কুলের মধ্যে ২ টি কেজি স্কুল ছাড়া এ বিধান কেউ মানছেনা। কেজি স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজেরা প্রাক প্রাইমারির আগে আরো ২ টি ক্লাস সৃষ্টি করেছে। প্রাক প্রাথমিক সহ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত তাদের মোট ক্লাসের সংখ্যা মোট ৮ টি। এই ৮ টি শ্রেণিতে কেজি স্কুল গুলো প্রতিটি শ্রেণীতে ৯ থেকে ১৩ টি পর্যন্ত ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বিভিন্ন কোম্পানির বই আবশ্যিকভাবে ক্রয় করার জন্য ছাত্র ছাত্রীদেরকে বাধ্য করছে। আবার এসব ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বিভিন্ন কোম্পানির বই উল্লেখিত মোহাম্মদী লাইব্রেরি ও রহমানিয়া লাইব্রেরির যেকোনো একটি থেকে অবশ্যই কিনতে হবে। ক্রয়কৃত বইয়ে সেই লাইব্রেরির অবশ্যই সীল মোহর থাকতে হবে। না হয়, সংশ্লিষ্ট কেজি স্কুল সে বই পড়াবে না, স্কুলের ভিতরে ঢুকাতেও দেবেনা। কেজি স্কুলের নির্ধারণ করে দেওয়া নিদিষ্ট লাইব্রেরি ছাড়া অন্য কোন লাইব্রেরি থেকে বই ক্রয় করলে অভিবাবকদের সে বই আবার ফেরত দিয়ে সংশ্লিষ্ট নির্ধারিত লাইব্রেরি থেকে অবশ্যই কেজি স্কুল কর্তৃপক্ষ বাধ্য করে বই কিনিয়ে নিচ্ছে। আবার সে বই গুলো বাজার মূল্যের চেয়ে কমপক্ষে ৩/৪ গুন দামে নির্ধারিত লাইব্রেরি থেকে কিনতে হয়। কোন কমিশন কিংবা অন্য কোন ছাড় ক্রেতা অভিবাবকদের বই দেওয়া হয়না। আর ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বিভিন্ন কোম্পানির এই বইগুলোর কোন পাঠ ও শিক্ষা ভ্যালু নেই। কোন কোন কেজি স্কুলে ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বিভিন্ন কোম্পানির এই বইগুলো একেবারেই পড়ানো হয়না। অধিকাংশ কেজি স্কুলে পড়ানোর শিক্ষকও নেই। আবার নির্ধারিত লাইব্রেরি থেকে এই বই গুলোর ক্লাস অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কেজি স্কুলের দেওয়া তালিকার পুরো সেট কিনতে হবে। লাইব্রেরি মালিকেরা বই এর ক্লাস ভিত্তিক পূর্ণ সেট ছাড়া অভিবাবকদের বই বিক্রি করবেনা। লাইব্রেরি গুলো যোগসাজস করে এক কেজি স্কুলের বই নির্ধারিত লাইব্রেরি ছাড়া অন্য লাইব্রেরিতে রাখবেনা। রাখলেও সেটা সহজে বিক্রি করবেনা। এভাবে কক্সবাজার শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার অর্ধ্ব লক্ষাধিক ছাত্র ছাত্রীকে জিম্মি করে দেড় হাজার টাকা থেকে ৩ হাজার টাকার পর্যন্ত ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বিভিন্ন কোম্পানির বই ক্রয় করতে বাধ্য করাচ্ছে কেজি স্কুল গুলো। ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে কেজি স্কুল গুলোর এ ধরনের নৈরাজ্য ও ছড়া ব্যবসার বিষয়ে অভিবাবকেরা অনেকটা অসহায় হয়ে এ বিষয়ে মুখ খুলতে পারছেননা। কারণ অভিবাবকদের কলিজার টুকরা সন্তানেরা সেখানে পড়ছে। তাই ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত বিভিন্ন কোম্পানির অতিরিক্ত বই কেনার বিষয়ে মুখ খুললে কেজি স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের সন্তানদের বারটা বাজাবে।

এ বই নৈরাজ্যের বিনিময়ে কেজি স্কুল গুলো লাইব্রেরি গুলো থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা আগাম ও পরবর্তীতে বিক্রি অনুযায়ী টাকা নেওয়ার চরম অভিযোগ উঠেছে। এই বিষয়ে বছর শুরু হওয়ার আগে থেকেই কেজি স্কুল কর্তৃপক্ষ লাইব্রেরি গুলোর সাথে মৌখিক চুক্তি করে ফেলে। এভাবে লাইব্রেরি ও কেজি স্কুল গুলো তাদের বাণিজ্যের যাঁথাকলে পিষছে কক্সবাজারের অর্ধ্ব লক্ষাধিক কোমলমতি শিশুকে। পবিত্র শিক্ষার নামে রমরমা বই ব্যবসা করছে দেশের আইন কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। অথচ শিক্ষাবান্ধব কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক যেন মানসম্মত শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে ও বিনামূল্যে সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ মানুষের দ্বোরগোড়ায় পৌঁছাতে প্রতিদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন। আর শিক্ষাকে ব্যবসার পণ্য করে রক্তচোষা কেজি স্কুল ও লাইব্রেরি গুলো কক্সবাজারে ছুটিয়ে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ কক্সবাজার শহরের গোলদীঘির দক্ষিণে ঘোনার পাড়া বিবেকানন্দ বিদ্যা নিকেতন ও গোলদীঘির উত্তর পাড়ের নিকটে হলি চাইল্ড স্কুলের সিলেবাসের বই কোন নির্ধারিত লাইব্রেরি হতে ক্রয় করতে হয়না। তাদের বই গুলো যে কোন লাইব্রেরি থেকে ক্রয় করা হলে, যে কোম্পানির বই হোক না কেন, কোন কথা ছাড়াই লাইব্রেরিওয়ালারা অভিবাবকদের বই এর গায়ে লেখা মূল্যের উপর ৪৫% কমিশন (ডিসকাউন্ট) দিয়ে থাকে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি এহসানুল কবিরের কাছে জানতে চাইলে তিনি সিবিএন-কে জানান, “কক্সবাজারের যেসব লাইব্রেরি কেজি স্কুলের বই এ কমিশন দেয়না সেসব লাইব্রেরি কেজি স্কুল গুলোকে নিয়মিত ডোনেশন দিয়ে থাকে। আর যেসব লাইব্রেরি অভিবাবকদের কমিশন দেয়, সেসব লাইব্রেরি কেজি স্কুল গুলোকে কোন ডোনেশন দেয়না। লাইব্রেরি গুলোকে চুক্তিবদ্ধ কেজিস্কুলেই ডোনেশন দেওয়ার জন্য বেশী দামে ও কমিশনবিহীন বই বিক্রি করতে হয় বলে এহসানুল কবির সিবিএন-কে জানান।”

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও উল্লেখিত রহমানিয়া লাইব্রেরির মালিক নুরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি সিবিএন-কে জানান, “আমরা স্কুলের সাথে চুক্তি করিনা, কেজি স্কুল গুলোই বই প্রকাশক কিংবা বই মার্কেটিংএ সংশ্লিষ্টদের সাথে চুক্তি করেন। তখন প্রকাশকের সাথে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী কেজি স্কুল গুলো লাইব্রেরি নির্ধারণ করে দেন।” আপনার রহমানিয়া লাইব্রেরির সাথে কয়টি কেজি স্কুলের চুক্তি চুক্তি করেছেন বই বিক্রির জন্য-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “২০ টি কেজি স্কুলের বেশী হবে।”

এবিষয়ে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি কক্সবাজার জেলা শাখার সাবেক সভাপতি ও মোহাম্মদী লাইব্রেরির সত্বাধিকারী মাওলানা ওমর ফারুকের কাছে জানতে চাইলে তিনি সিবিএন-কে জানান, “আমি এ বছর আগের মতো বেশী কেজি স্কুলের সাথে কন্ট্রাক করিনি। এবছর কেজি স্কুল গুলো সরাসরি প্রকাশকদের সাথে কন্ট্রাক করেছে। কেজি স্কুল গুলো তাদের পছন্দের প্রকাশক গুলোর সাথে কন্ট্রাক করে আমাদের তালিকা ও বই সরবরাহ দিয়েছে। আমরা কেজি স্কুল গুলোর দেওয়া তালিকা মতো কোন কমিশন ছাড়া ক্রেতাদের বই বিক্রি করে থাকি।” ডোনেশন দেন কিনা-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সেটা বইয়ের প্রকাশক আমাদের কাছ থেকে নিয়ে কেজি স্কুল গুলোতে দিয়ে থাকে।”

কক্সবাজারের বৃহৎ কেজি স্কুল বাহারছরার কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম থেকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সিবিএন-কে বলেন, আমারা নির্ধারিত ২ টি নবারুণ ও এক্সপ্লোর প্রকাশনী থেকে বই সিলেক্ট করে দিয়েছি। সেই বই গুলো শুধুমাত্র রহমানিয়া লাইব্রেরিতে বিক্রি করা হবে বলে তাদেরকে বইএর প্রকাশকেরা জানানোর ফলে অন্য কোন লাইব্রেরিতে এসব বই পাওয়া যায়না এবং প্রকাশকেরা কমিশন না দেওয়ায় ক্রেতাদের কমিশন দেওয়া হয়না। ফলে বাধ্য হয়ে অভিবাবকদের রহমানিয়া লাইব্রেরি থেকেই বই কিনতে হয়। রহমানিয়া লাইব্রেরি থেকে কোন ডোনেশন নেন কিনা-এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, “সব কেজি স্কুল কিছু না কিছু উপহার ডোনেশন হিসাবে পান, সেরকম আমরাও পাই।”

এবিষয়ে তারাবনিয়ার ছরার শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউটের প্রধান শিক্ষক নেসারুল হক থেকে জানতে চাইলে তিনি সিবিএন-কে জানান, “আমাদের নির্ধারিত বই মোহাম্মদী লাইব্রেরি ছাড়া অন্য লাইব্রেরি গুলো এভেলএভেল না আনাতে মোহাম্মদী লাইব্রেরি থেকেই বই ক্রয় করার জন্য প্রতিবছরের মতো অভিবাবক ও ছাত্র ছাত্রীদের জানিয়ে দিয়েছি।” মোহাম্মদী লাইব্রেরি থেকে ডোনেশন পান কিনা-এ প্রশ্নের উত্তরে, তিনি তা অবগত নন বলে সিবিএন-কে জানান।

এবিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ শফিউল আলম বলেন, সম্পূর্ণ সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে কক্সবাজারের কেজিস্কুল গুলো ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত অননুমোদিত বই ছাত্র ছাত্রীদের কিনাচ্ছে এবং ক্লাসে পড়াচ্ছে। তিনি বলেন, কেজিস্কুল গুলো ন্যাশনাল কারিকুলাম বর্হিভুত অননুমোদিত বই ছাত্র ছাত্রীদের কিনিয়ে তারা রম রমা ব্যবসা বাণিজ্য করছেন, অন্যদিকে, অভিবাবকদের তারা আর্থিক ক্ষতি করেছেন। শিক্ষার্থীদের উপর অপ্রয়োজনীয় বই এর বোঝা চাপাচ্ছেন। তারা সরকারি বিধিও লঙ্গন করছেন। এরকম নৈরাজ্য বন্ধ হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, অননুমোদিত বই কোমলমতি শিশুদের পড়ানো কোন অবস্থাতেই সঠিক হচ্ছেনা।

এবিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) মোহাম্মদ আল আমিন পারভেজ সিবিএন-কে জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর সোমবার ১৩ জানুয়ারি শহরের মোহাম্মদী লাইব্রেরির মালিক মাওলানা ওমর ফারুক ও রহমানিয়া লাইব্রেরির মালিক নুরুল ইসলামকে ডেকে এনে এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছি। কিন্তু এরপরেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি, লাইব্রেরি ২ টি পূর্বের ন্যায় অননুমোদিত বই কেজি স্কুল গুলোর দেওয়া তালিকামতে ছড়াদামে বিক্রি করছে। তাই তদন্ত করে অভিযোগ সঠিক পাওয়া গেলে অভিযুক্ত লাইব্রেরি গুলোর বিরুদ্ধে শিঘ্রী কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি সিবিএন-কে জানান। তিনি বলেন, বই সহ শিক্ষা উপকরণ নিয়ে জিম্মি করে কক্সবাজারে কাউকে বাণিজ্য করতে দেওয়া হবেনা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •