বাংলা ট্রিবিউন:

ধর্মীয় বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মসূচি পালন করলেও দেশের বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে কোনও কর্মসূচি নেই ধর্মভিত্তিক দলগুলোর। দলীয় কার্যালয়েও নেই নেতা-কর্মীদের আনাগোনা। বিবৃতি আর সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে বেশির ভাগ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম। তবে এদের থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন। তারা ধর্মীয় ইস্যুর বাইরেও বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে রাজপথে কর্মসূচি পালন করে থাকে, নির্বাচনেও নিয়মিত অংশ নেয়।

নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১০টি দল ধর্মভিত্তিক। সংসদ নির্বাচনে নিয়মিত অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এই ১০ দলের অংশগ্রহণ খুবই কম। আর এর রেশ পড়েছে আগামী ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও। একমাত্র ইসলামী আন্দোলন ছাড়া অন্য কোনও ইসলামি দল গুরুত্বপূর্ণ এ নির্বাচনে কোনও প্রার্থী দেয়নি। এমনকি কাউন্সিলর পদেও নিবন্ধিত ধর্মভিত্তিক দলগুলোর কোনও প্রার্থী নেই।

কেবল নির্বাচনই নয় এসব দলের তেমন কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচিও নেই।  প্রায় সবদলেরই কর্মকাণ্ড বিবৃতি ও প্রেস রিলিজ নির্ভর। বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে নিয়মিত বিবৃতি দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান এসব দলের নেতারা। তবে দেশ-বিদেশের ধর্মীয় ইস্যুতে বিবৃতির পাশাপাশি কর্মসূচি দিতেও দেখা যায় ধর্মভিত্তিকগুলোকে। সম্প্রতি ভারতে বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের রায় দেয় দেশটির আদালত। এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে প্রায় প্রতিটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে দলের সক্ষমতা অনুসারে সমাবেশ ও বিক্ষোভ করে বিভিন্ন দল।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ইসলামপন্থী দলগুলো হলো— ১. বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন (নিবন্ধন নং ০১৯), ২.বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (নিবন্ধন নম্বর ০২০), ৩. জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (নিবন্ধন নম্বর       ০২৩), ৪. জাকের পার্টি (নিবন্ধন নম্বর ০১৬), ৫. ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ (নিবন্ধন নম্বর ০৩০), ৬. ইসলামী ঐক্যজোট (নিবন্ধন নম্বর            ০৩২), ৭. বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (নিবন্ধন নম্বর ০৩৩),৮.ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (নিবন্ধন নম্বর ০৩৪), ৯. বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (নিবন্ধন নম্বর ০৩৫), ১০. খেলাফত মজলিস (নিবন্ধন নম্বর ০৩৮)।

ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক। তবে এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দুভাগ হয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন নূর হোসাইন কাসেমী, অন্য অংশে মুফতি ওয়াক্কাস। দুটি অংশের দলীয় কার্যালয় পল্টনে। সরেজমিনে দেখা গেছে, দুই অংশের কোনও অফিসেই নিয়মিত আসেন না কেন্দ্রীয় নেতারা। বার্ধক্যের কারণে চলাফেরা কম করেন নূর হোসাইন কাসেমী। তিনি বারিধারায় একটি মাদ্রাসা পরিচালনা করেন। দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা প্রয়োজনে সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

পল্টনে আরও রয়েছে খেলাফত মজলিস,বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টির দলীয় কার্যালয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পার্টি অফিসে বিকালে বসেন দলের ছাত্র নেতারা। দলীয় বৈঠক থাকলে মাঝে মাঝে অফিসে আসেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নেতারা। অন্যদিকে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক মোহাম্মদপুরে একটি মাদ্রাসা পরিচালনা করেন। তিনি সেখানেই দলীয় নেতাদের সঙ্গে প্রয়োজন হলে বৈঠক করেন। প্রতিদিন অফিস করেন নেজামে ইসলাম পার্টির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ নেজামী। তবে তিনি নিয়মিত দলীয় কার্যালয়ে আসলেও সেখানে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি নেই।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে নেই। দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়মিত চলছে। যখন যেভাবে রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োজন সেভাবেই কার্যক্রম চলমান আছে।’

প্রবীণ রাজনীতিবিদ নেজামে ইসলাম পার্টির চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী বলেন, ‘এখন কর্মসূচি দিতে গেলে প্রশাসনের অনুমতি প্রয়োজন হয়। এটি রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বড় বাধা। বড় বড় বিরোধী দলগুলোও এ বাধার কারণে তাদের কর্মসূচি পালন করতে পারছে না। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে অন্যান্য দলের মতো ইসলামী দলগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠবে।’

রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে অনেক নেতাই শীতের মৌসুমে ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে নিজেদের আয়-রোজগারে ব্যস্ত থাকেন। কেউ কেউ মাহফিলে গিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার নেতাদের সঙ্গে ঘরোয়া  বৈঠক করে থাকেন।

ইসলামী ঐক্যজোটের রাজনৈতিক কার্যালয় রাজধানীর লালবাগে। সেখানে মাঝে মাঝে অফিস করেন দলের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ। দলের অন্য নেতারা দলীয় কার্যালয়ে আসেন না বললেই চলে।

ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, ‘ধর্মভিত্তিক দলগুলো তাদের আপনগতিতে অগ্রসর হচ্ছে। হয়তো রাজপথে তেমন কর্মসূচি নেই। তবে সব সময় রাজপথে থাকতে হবে এমনও নয়। প্রয়োজনে অতীতে রাজপথে ছিল,আগামীতেও থাকবে। বিষয়টা নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্ম কৌশলের ওপরে। ইসলামপন্থী  দলগুলোর কাছে ইসলাম প্রাধান্য পায়, এটাই স্বাভাবিক। এজন্য ধর্মীয় কোনও ইস্যু হলে ইসলামি দলগুলো বেশি সরব থাকে। জাতীয় ইস্যুগুলোও আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।এসব বিষয়েও আমরা ভূমিকা রাখার চেষ্টা করি।’

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে রয়েছে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন। ১৪ দলের কর্মসূচির বাইরে দলটির তেমন কোনও কর্মসূচি দেখা যায় না। এমএ আউয়াল এ দলের সাবেক মহাসচিব। তিনি দল ছেড়ে যাওয়ার পর থেকেই আলোচনা নেই তরিকত ফেডারেশন।

ইসলামী আন্দোলন

তবে ধর্মীয় ইস্যু ছাড়াও আইনশৃঙ্খলার অবনতি,দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মসূচি দিতে দেখা যায় চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনকে। বিবৃতির বাইরেও দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদেরকে মাঠের কর্মসূচি ও নির্বাচনে অংশ নিতে দেখা গেছে। এছাড়া,পল্টনে দলটির কার্যালয়ে নিয়মিত আসেন কেন্দ্রীয়সহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতারা।

দলীয় জনসভায় বক্তব্য রাখছেন চরমোনাই পীর

ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউনুস আহমাদ বলেন, ‘ইসলাম সংকীর্ণ নয়, একটি সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা। ধর্মের বাইরেও যেকোনও বিষয়ে যেকোনও সমস্যা হোক না কেন,তার সমাধান ইসলামে আছে। যেকোনও ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার, মানবিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে প্রতিবাদ করা উচিত। আমাদের দল এজন্য যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করে দেশের মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ করতে। মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা ভূমিকা রাখার চেষ্টা করি। বাধা তো আসবেই, সে জন্য থেমে থাকা যাবে না।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •