বাংলা ট্রিবিউন:
বাংলায় তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন সেবা ও সলিউশন্স ব্যবহার করা গেলেও ব্যবহারকারীকে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। ফন্ট ভেঙে যায়, যন্ত্রটি এ দেশের মানুষের উচ্চারণ ঠিক মতো বোঝে না, পিডিএফ (পোর্টেবল ডকুমেন্ট ফরম্যাট) ফাইল থেকে ওয়ার্ডে কোনও কিছু কনভার্ট করতে গেলে অনেক সময় হয় না, হলেও ফন্ট ভেঙে যায়, ব্যাকরণে ভুল হওয়াসহ নানা ধরনের সমস্যা হয়। এমনকি মুখে বলে লিখতে গেলেও সমস্যা হয়। এসব সমস্যা দূর করতে সরকারের আইসিটি বিভাগ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। হাতে নিয়েছে ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সম্মৃদ্ধকরণ প্রকল্প’। আর এই প্রকল্প নিয়ে মাঠে নামার পরেই পড়তে হয়েছে চ্যালেঞ্জের মুখে। এখনও প্রকল্পর সব কাজ শুরু হয়নি বলে জানা গেছে।
প্রায় ৩ বছর হতে চললো এই প্রকল্প শুরু হয়েছে কিন্তু সে হিসেবে কাজ হয়েছে সামান্যই। আইসিটি বিভাগ তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সম্মৃদ্ধকরণের জন্য যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তাতে রয়েছে ১৬টি উপাদান। এই উপাদানগুলো তথ্যপ্রযুক্তিতে রূপান্তর করা গেলে দেশের মানুষ ‘দেশে তৈরি’ (মেড ইন বাংলাদেশ) সেবা ও সলিউশন্স ব্যবহার করে বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে পারবে। তবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কাজ শেষ করতে প্রকল্পর নির্ধারিত মেয়াদ পার হয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সম্মৃদ্ধকরণ প্রকল্প’র পরিচালক ড. মো. জিয়াউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ প্রকল্পের কাজে চ্যালেঞ্জ আছে। আমাদের দেশে এ ধরনের কাজ করার মতো বিশেষজ্ঞ কম। নেই বললেই চলে। যেহেতু এ ধরনের কাজ আগে হয়নি। ফলে কাজে নেমে পদে পদে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে সবাই আন্তরিকভাবেই কাজ করছেন।’ কাজের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অগ্রগতি সামান্যই। এখনও সবগুলোর (১৬টি উপাদান) কাজ শুরু করা যায়নি। দেখা গেল, টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) করা হয়নি। তখন সেসব করে মূল কাজে আসতে সময় লেগে যাচ্ছে। আমরা ২০২১ সালের জুন মাসের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে আশাবাদী। তবে সময় কিছুটা বেশিও লাগতে পারে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আইসিটি বিভাগের অধীন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) একটি উদ্যোগ হলো এই গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সম্মৃদ্ধকরণ প্রকল্প। এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৫৯ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের জন্য প্রশাসনিক আদেশ হয়েছে ২০১৭ সালে। প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয় ওই বছরেরই এপ্রিল মাসে। ২০১৮ সালের আগস্টে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।
সূত্র জানায়, গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সম্মৃদ্ধকরণ প্রকল্প’র যে ১৬টি উপাদান রয়েছে সেগুলো হলো- বাংলা কর্পাস, বাংলা ওসিআর (অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন) উন্নয়ন এবং তাতে হাতের লেখা যুক্তকরণ, বাংলা স্পিচ টু টেক্সট ও টেক্সট টু স্পিচ সফটওয়্যার তৈরি, জাতীয় বাংলা কি-বোর্ডের উন্নয়ন, বাংলা স্টাইল গাইড উন্নয়ন, বাংলা ফন্ট নিরবছিন্নভাবে ব্যবহার ইঞ্জিনের উন্নয়ন, বাংলা সিএলডিআর রিসোর্সের উন্নয়ন ও ইউনিকোডে জমাদান, বাংলা উচ্চারণ ও ব্যাকরণ পরীক্ষকের উন্নয়ন, বাংলা মেশিন ট্রান্সলেটর উন্নয়ন, স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যারের উন্নয়ন, শারীরিকভাবে অক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য সফটওয়্যারের (স্ক্রিন রিডার) উন্নয়ন, বাংলায় আবেগ বিশ্লেষণের সফটওয়্যার উন্নয়ন, বহুভাষিক কনটেন্ট প্রসেসিংয়ের উন্নয়ন, দেশের বহুল জনপ্রিয় সাইট আন্তর্জাতিক ভাষায় অনুবাদ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিজস্ব ভাষায় কি-বোর্ড উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ফোনেটিক সংস্থার ফন্ট ও সফটওয়্যারের সমন্বয়।
জানা গেছে, স্ক্রিন রিডার নামের একটি উপাদানের কাজ শেষ হয়েছে। সেটি প্রকল্পে জমাও পড়েছে। বর্তমানে সেটির বাগ ফিক্সিংয়ের কাজ চলছে।
এই প্রকল্প থেকে তিনটি উপাদান তৈরির কাজ পেয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রিভ সিস্টেমস। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আজমত ইকবাল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, প্রকল্প থেকে স্ক্রিন রিডার, বাংলা স্পেল চেকার ও বাংলা ওসিআর তৈরির কাজ পেয়েছে রিভ সিস্টেমস। এরমধ্যে কাজ শেষ হয়েছে স্ক্রিন রিডার তৈরির। কাজ শেষ করে এটা জমাও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এটির বাগ ফিক্সিংয়ের কাজ চলছে। স্পেল চেকার তৈরির জন্য সময় দেড় বছর। এরই মধ্যে ১০ মাস হয়েছে। অবশিষ্ট সময়ে এটির কাজ শেষ হবে বলে জানান আজমত ইকবাল। আর বাংলা ওসিআর তৈরির কাজ সম্প্রতি কাজ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এটার জন্য সময় বরাদ্দ দেড় বছর। এখন ডকুমেন্টেশনের কাজ শুরু হয়েছে।
আজমত ইকবাল বলেন, ‘স্ক্রিন রিডার তৈরি হচ্ছে শারীরিকভাবে অক্ষম, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য। এর মাধ্যমে মোবাইলফোন, কম্পিউটার না দেখেও ব্যবহার করা যাবে। কম্পিউটারের স্ক্রিন স্পর্শ করলে শব্দ করে শোনানো হবে কম্পিউটার বা মোবাইলের পর্দায় তখন কী আছে সেসব।’
সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশে এ ধরনের কাজ আগে কখনও হয়নি। ফলে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের লোকজনের ঘাটতি শুরু থেকেই রয়ে গেছে। এটাই এ প্রকল্পর বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে কাজ হচ্ছে বেশ ধীরগতিতে। অনেক কাজ এখনও শুরু করা যায়নি বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক। জানা গেছে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) এই প্রকল্পের জন্য কারিগরি পরামর্শক (টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরামর্শকরাই প্রকল্পর টিওআর (টার্মস অব রেফারেন্স) লেখার কাজ করেন। তবে টিওআর লেখার নাম করে মূল্যায়ন কমিটিও নিয়ন্ত্রনের অভিযোগ ওঠে কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক জানান, দেশে এই কাজের জন্য এক্সপার্টিজ না থাকায় অনেক ধরনের কথা হচ্ছে। আমরাও শুনেছি। কিন্তু আমাদের কাজ আমরা করে যাচ্ছি। কাজ ভালো হলে কথা এক সময় এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে।
গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সম্মৃদ্ধকরণ প্রকল্পর কাজ পেয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইজেনারেশন ও টিম ইঞ্জিন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •