ইমাম খাইর, সিবিএন:
টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের জেলেপাড়ার বাসিন্দা কুম্বদাস। বয়স প্রায় ৬৭ বছর। অনেক বছর ধরে ওই এলাকায় স্বপরিবারে তার বসবাস। সেই পূর্ব পুরুষ থেকেই তারা জলদাস হিসেবে পরিচিত। সাগরে মাছ ধরেই জীবন চলা কুম্বদাসদের। কিন্তু হাঁটাচলার কোন রাস্তা ছিল না। যে রাস্তাটি ছিল তা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনার শিকার হতো তাদের। সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারে সাধ্যও ছিল না।
একই এলাকায় ৩২ বছর ধরে বসবাস ৭৩ বছর বয়সী সোনা লাল দাসের। জীবনের ঘানি টানতে টানতে প্রায় মৃত্যুর দরজায়। ভাঙাচোরা-কাঁচা সড়কে কতোইনা দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে! কেউ অসুস্থ হলে কাধে ভর করে হাসপাতালে নেওয়া ছাড়া বিকল্প উপায় ছিল না। ডেলিভারী রোগি নিয়ে কি যে ভোগান্তি পোহাতে হতো! তা বলার ভাষাই নেই সোনালালদের। একটি সড়কের যাতনায় জীবনের সময়টুকু প্রায় শেষান্তে কুম্বদাস, সোনা লাল দাসসহ অনেকের।
একই দুঃখ ও যাতনার কথা বর্ণনা দিয়েছেন গান্ধি দাস, পুষ্প রানি দাস, সুবা দাস, সাগর বালা, রামপদ দাস, সুকান্ত দাস। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা পাড়ায় তাদের বসতি। এখানে রয়েছে ৫ শতাধিক জেলে পরিবার। শুধু একটি সড়কের অভাবে দীর্ঘদিন অশিক্ষা-অজ্ঞতায় নিমজ্জিত ৩ পাড়ার বাসিন্দারা। জীবনে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে নি বললে চলে। এমবিবিএস ডাক্তার তো দূরের কথা, সঠিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ধরণটা কি? চোখে দেখেনি কোন দিন। বছরখানে হচ্ছে- সেই জেলেপল্লীতে নির্মিত হয়েছে পাকা সড়কটি। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ইউএনএইচসিআরের  প্রায় ৩১ লাখ টাকা অর্থায়ন ও দেশীয় উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাধ্যমে নির্মিত একটি সড়কই পাল্টে দিয়েছে সেই জেলেপল্লীর পুরনো দৃশ্য। এখন চোখে পড়বে না সেই জীর্ণতা। জীবনমানের পরিবর্তন হতে শুরু করেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। বদলাচ্ছে তাদের ভাষা। স্কুলমুখি হচ্ছে জেলেদের সন্তানেরা। বছর আগেও যে জেলে পল্লীর রাস্তা দিয়ে খালি পায়ে হাটতে কষ্ট হতো, সেখানে এখন চলাচল করছে গাড়ি। জোয়ারের পানিতে যেসব বসতবাড়ি প্রতিনিয়ত হাবুডুবো খেতো, সেসব বাড়িগুলোর উঠোন এখন চকচকে। ঘরের আঙ্গিনাতে বসানো হয়েছে ফুলের টব, খালি জায়গায় চোখে পড়বে খেতখামার। সেই বাপদাদার পুরনো পেশার পাশাপাশি তারা এখন আধুনিক পেশার প্রতিও ঝুঁকছে। ঘরে সেলাই মেশিন বসিয়ে স্বাবলম্বি হয়েছে গান্ধি দাসদের মতো অনেক জলদাস পরিবারের মেয়ে। ক্ষুদ্র ঋণের টাকায় গরু, ছাগল কিনে লালন পালন করেছে পুষ্প রানিরা। জেলের মেয়ে হলেও এখন তারা আরো সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখছে।
তাতে শেষ নয়- সড়কের সুবাদে এখন জেলেপল্লীতে ঢুকছে বিভিন্ন এনজিও। উন্নয়নমূলক কাজ করছে। জেলেদের সন্তানেরা রাস্তার ধারে এখন আর প্রস্রাব-পায়খানা করে না। পায়ে জুতো-স্যান্ডেল পরতে শিখেছে। খাবারের আগে ও পারে সাবান দিয়ে হাত ধোয়াতে অভ্যস্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে একটি সড়কেই পাল্টে দিয়েছে একটি জেলেপল্লীর পুরো জীবনচিত্র। এ জন্য সেখানকার বাসিন্দারা দাতা সংস্থা-ইউএনএইচসিআরসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
ইউএনএইচসিআর এর লাইভলিহোড অফিসার সুব্রত কুমার চক্রবর্তীও জেলে পল্লীর মতো পিছিয়ে থাকা একটি জনপদের উন্নয়নে সামান্যতম হলেও সহযোগিতা করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেছে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়েছে। হোস্ট কমিউনিটির উন্নয়নে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা অব্যাহত থাকবে বলে জানান সুব্রত কুমার চক্রবর্তী।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •