শাহেদ মিজান, সিবিএন:

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে উখিয়ায় বিস্তীণং পাহাড় ও বন-জঙ্গল ধ্বংস করা হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে এই পর্যন্ত উখিয়া ৮ হাজার একরের বেশি বন-জঙ্গল ধ্বংস করা হয়েছে। একই সাথে কেটে বিলীন করে দেয়া হয়েছে এসব বন-জঙ্গলের পাহাড়গুলোও। বন-জঙ্গল ধ্বংস ও পাহাড় বিলীন করা ওই এলাকার জীববৈচিত্রও চরমভাবে ক্ষতির হয়েছে। সব মিলে ২০৪০কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তবে দৃশ্যগতভাবে ক্ষতির পরিমাণ আরো অনেক বেশি বলে দাবি পরিবেশবাদিদের।

অন্যদিকে মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনালের স্টেশন নির্মাণ করার জন্য ধ্বংস করা হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকার পাহাড় ও বন-জঙ্গল। উপজেলার কালারমারছড়া ইউনিয়নের এই বন-জঙ্গল ও পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে। একই সাথে মহেশখালীর মাতারবাড়িতে নির্মাণাধীন একটিসহ মোট ১৬টি কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এই নিয়ে আগামী ৩০ বছর পর মহেশখালীতে মানুষের বসবাস বিলুপ্ত হবে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের অন্যতম শীর্ষ বুদ্ধিজীবি ড.সমিলুল্লাহ খান। এছাড়াও পরিবেশবিদ, পরিবেশবাদী এবং দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলোর পর্যবেক্ষণ ও পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে একই তথ্য।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন মতে, রোহিঙ্গা বসতির কারণে ছয় হাজার একর বন ধ্বংস হয়েছে। তাদের জ্বালানি কাঠ হিসেবে ছাই হয়ে গিয়েছে আরও এক হাজার ৮৩৭ একর বন- টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৫৫৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ধ্বংস হয়েছে প্রায় আট হাজার একর বনভূমি বা দুই হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এক হাজার ৮২৯ কোটি টাকার জীববৈচিত্র্য এবং ৫৯১ কোটি টাকার বনজদ্রব্যের ক্ষয়ক্ষতিও এই ধ্বংসলীলার অন্তর্ভুক্ত। চলতি বছরের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত সময়কালে ক্ষয়ক্ষতিসংক্রান্ত এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

উখিয়া ও মহেশখালীর এই পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ডের কারণে বিগত ২০১৯ সালজুড়ে কক্সবাজারের মুল আলোচনায় বিষয় ছিলো পরিবেশ ইস্যু। কেননা উখিয়া ও মহেশখালীতে ব্যাপক পাহাড় কর্তন ও বন-জঙ্গল ধ্বংস করার কারণে ইতোমধ্যে তার ক্ষতিকর প্রভাব কক্সবাজারের পরিবেশে বিরাজ হয়েছে বলে পরিবেশবিদ ও পরিবেশবাদীরা বলছেন। তাদের পর্যবেক্ষণ মতে, উখিয়া ও মহেশখালীতে ব্যাপক পাহাড় কর্তন ও বন-জঙ্গল ধ্বংস করার কারণে পুরো কক্সবাজার জেলাজুড়ে পরিবেশে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর মধ্যে উঞ্চ হয়ে উঠেছে পরিবেশ। পরিবর্তন এসেছে ঋতুচক্রে। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন স্থানে।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, উখিয়া ও মহেশখালীতে ব্যাপক পাহাড় কর্তন ও বন-জঙ্গল ধ্বংস করায় অচিরেই কক্সবাজারের পরিবেশ ও প্রতিবেশ আরো ব্যাপক ধ্বংসের মুখোমুখি হবে।

শুধু উখিয়া ও মহেশখালী নয়; বিচ্ছিন্নভাবে কক্সবাজার শহরের জেলার বিভিন্ন স্থানে বিধ্বংসী কর্মকান্ড চলছে। এর মধ্যে পাহাড় কর্তন করে সর্বোচ্চ পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে। কিন্তু পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ড প্রতিরোধে প্রশাসনের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয় বলে দাবি পরিবেশবাদীদের। তবে মহেশখালীতে সরকারই পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ড ঘটাচ্ছে বলে দাবি তাদের। কেননা পৃথিবী জুড়ে যেখানে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে সে জায়গায় মহেশখালীতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ধ্বংস করে এক জায়গাতেই ১৬ টি কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে!

কক্সবাজারের পরিবেশ ধ্বংস নিয়ে গত এক বছরের বিভিন্ন সভা-সেমিনার হয়েছে। সব সভা-সেমিনারে চলমান বিরূপ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সকলেই। বিশেষ করে কক্সবাজারের পরিবেশবাদী ও সচেতন লোকজন আগামীর কক্সবাজার নিয়ে ব্যাপকভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

এ ব্যাপারে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘এনভায়রনমেন্ট পিপলস’র প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ বলেন, ‘নানাভাবে দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের পরিবেশ ধ্বংস হয়ে আসছে। ব্যাপক হারে পাহাড় কর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, বন-জঙ্গল ধ্বংসসহ নানাভাবে পরিবেশের এই ক্ষতি হয়ে আসছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে উখিয়ায় যে ৮ হাজার একর মতো পাহাড় ও বন-জঙ্গল ধ্বংস করা হয়েছে তার মাধ্যমে পুরো কক্সবাজারের পরিবেশের কপিনে শেষ পেরেক মেরে দেয়া হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে আনা কখনো সম্ভব হবে না। ’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা সভাপতি, প্রথিযশা সাংবাদিক ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য যে হারে পাহাড় কর্তন ও বনজঙ্গল ধ্বংস এবং মহেশখালীতে যে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে তার কারণে কক্সবাজারে পরিবেশ চরম হুমকির মুখে রয়েছে। ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আমেরিকান প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইর্য়ক টাইমস বলেছে, কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো নির্মিত হলে কক্সবাজার হবে পৃথিবীর সবচেয়ে গরম এলাকা। এতে বুঝা যাচ্ছে অচিরেই কক্সবাজার একটি দোযগখানায় পরিণত হবে।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •