ইমাম খাইর, ষাটগম্বুজ মসজিদ (বাগেরহাট) থেকেঃ

বাস্তবতঃ ছাদহীন, গম্বুজ দিয়েই ছাদের মতো করে নির্মিত। অর্ধডিম্বাকার ও আয়তাকার গম্বুজ গুলিই হচ্ছে এর ছাদ। এজন্যই মসজিদটি ছাদ গম্বুজ মসজিদ হিসেবে একসময়ে পরিচিতি লাভ করে। কালের বিবর্তনে বিকৃত কথ্যরুপে পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ’ হিসেবে খ্যাত। বিশ্বময় পরিচিত এই মসজিদটি দেখতে প্রতিদিন প্রচুর দর্শক সমাগম ঘটে। মন জুড়িয়ে যায় স্থাপত্য দেখে।

বাগেরহাটের নামের সাথে ‘ষাটগম্বুজ’ মসজিদটি যেন আষ্টেপৃষ্ঠে মিলে মিশে একাকার হয়ে রয়েছে। এই মসজিদটি এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। প্রকৃতপক্ষে এই মসজিদে গম্বুজ আছে ৮১টি। নাম যাই হোক পাঁচ শতাব্দীর অধিক কাল ধরে এই মসজিদটি বাগেরহাটসহ দেশ বিদেশের অনেকের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।

খানজাহানের আমলে নির্মিত ইসলামী স্থাপত্য-রীতির মসজিদগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ইউনেস্কো ১৯৮৫ সালে বাগেরহাটকে ঐতিহাসিক মসজিদের শহর হিসেবে ঘোষণা করে এবং ৩২১তম বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে।

বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান ও উইকিপিডিয়া থেকে জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসন আমলে ১৮৪২ সালে খুলনা মহাকুমার অন্তর্গত একটি থানা এবং ১৮৬৩ সালে যশোর জেলা অন্তর্গত একটি মহাকুমা ছিল বাগেরহাট। দেশ স্বাধীন হওয়ার ১৩ বছর পর ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে বাগেরহাটের যাত্রা শুরু হয়।

বাগেরহাটের ১৭টি স্থাপনার মধ্যে তালিকাভুক্ত ১০টিই মসজিদ। সেখানে বিশ্ব-ঐতিহ্য ষাট গম্বুজ মসজিদ অন্যতম।

ষাটগম্বুজ মসজিদঃ
বাংলাদেশে প্রাচীন আমলে নির্মিত সর্ববৃহৎ মসজিদ হচ্ছে ষাটগম্বুজ মসজিদ। বাগেরহাট শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে সুন্দরঘোনা গ্রামে অবস্থিত এ মসজিদ। খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কের ষাটগম্বুজ বাসস্ট্যান্ডের সঙ্গেই এ মসজিদের প্রধান ফটক।
মসজিদটির পশ্চিমে রয়েছে বিশালাকৃতির ঘোড়া দিঘি এবং পশ্চিমে কোদালধোয়া দিঘি। উত্তরে খানজাহানের বসত ভিটা ও দক্ষিনে খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়ক এবং সড়কের পাশেই রয়েছে তার আমলের সিংড়াই মসজিদ। এ মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে রয়েছে খানজাহান আলীর কবর ও খানজাহান আলী দিঘি।

ষাটগম্বুজ মসজিদ নামে পরিচিত হলেও মসজিদটিতে মোট ৮১টি গম্বুজ রয়েছে। চার কোণের বুরুজের (মিনার) ওপর ৪টি এবং পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বি ৭টি সারিতে ১১টি করে ৭৭টি গম্বুজ রয়েছে। এর মধ্যে ৭টি গম্বুজ চার কোণবিশিষ্ট। গম্বুজগুলোর ভার বহনের জন্য মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত ৬০টি পাথরের খিলান-স্তম্ভ আছে। কেউ কেউ মনে করেন, এই ষাটটি খাম্বা থেকেই ষাটগম্বুজ নামকরণ হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্বকোণের মিনারের মধ্য দিয়ে ছাদে ওঠার জন্য একটি সিঁড়ি রয়েছে, যাকে রওশনকোঠা বলা হয়ে থাকে। উত্তর-পূর্ব কোণের মিনারেও ছাদে ওঠার সিঁড়ি ছিল, যাকে আন্ধার কোঠা বলা হত। অবশ্য এটি এখন বন্ধ রয়েছে।

৮ ফুট পুরু দেয়ালের এই মসজিদটির মোট আয়তন ১৭ হাজার ২‘শ ৮০ বর্গফুট। উত্তর-দক্ষিণে ১৬০ এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১০৮ ফুট। মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা ২১ ফুট।
মসজিদের ভেতরের পশ্চিম দেয়ালে ১০টি মিহরাব আছে। মাঝের মিহরাবটি আকারে বড় এবং তুলনামূলক অধিক কারুকার্যমণ্ডিত। মিহরাবটির দক্ষিণে ৫টি ও উত্তরে ৪টি মিহরাব আছে। প্রধান মেহরাবের পাশে একটি দরজাসহ মোট ২৬টি দরজা রয়েছে।মূল মসজিদের সামনে দু্ইটি বিশালাকৃতির রেইনট্রি গাছ রয়েছে। মসজিদের চারদিকে রয়েছে উঁচু দেয়াল (পাঁচালি)।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন মসজিদে প্রবেশ করতে দেশি পর্যটকদের জন্য ২০ টাকা, বিদেশিদের জন্য ২০০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশসমূহের নগরিকদের জন্য ১০০ টাকা এবং মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য জনপ্রতি ৫ টাকা (প্রবেশ ফি/টিকিট) দিতে হয়।

তবে, আমাদের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন সোস্যালওয়ার্কার থাকায় টিকিট করতে হয়নি। সব ম্যানেজ করেছেন। ফ্রি-তে দেখে এলাম বাগেরহাটের যাদুঘর ও ষাটগম্বুজ মসজিদ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •