ড. আবদুল্লাহ আল মামুন

কাতারের উপর চারটি প্রতিবেশী দেশের আরোপিত সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার আড়াই বছর পূর্ণ হল গত ৫ ডিসেম্বর। ২০১৭ সালের ৫ই জুন, সব কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিসর কাতারের উপর পূর্ণ অবরোধ আরোপ করে। কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাশের মদদ দেয়া সহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বার্থ বিরোধী প্রচারণা চালানোর অভিযোগ আনা হয়। ওই সব দেশে এ সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল আল-জাজিরার সম্প্রচারও বন্ধ করে দেয়া হয়।

অবরোধ আরোপের পর সৌদি সেনাবাহিনী কাতারে অনুপ্রবেশ করতে পারে বলেও গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তাতে বাধ সেধে বসেন আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব রিক্স টিলারসন। তিনি সৌদি আগ্রাসনে সায় দেননি। এছাড়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলিষ্ঠ পদক্ষেপে কাতারের পাশে এসে দাঁড়ালে, সৌদি জোট পিছূ হটতে বাধ্য হয়।

অবরোধের শুরুতে কাতারের মতো ছোট্ট একটি দেশ এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারবে কিনা, সে নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কিন্তু সেই ধারণা ভেঙ্গে দিয়ে অর্থনীতি, বানিজ্য, কূটনীতি সহ সকল ক্ষেত্রে কাতার দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সফল হয়েছে। শুধু তাই নয়, কাতার এখন অবরোধের আগের অবস্থানের চেয়ে আরো বেশী শক্তিশালী অবস্থানে এসেছে।

অবরোধ আরোপের আগে কাতারের খাদ্য সামগ্রীর সিংহভাগ আমদানী করা হত সৌদি আরব সহ প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে। ব্যবসা বানিজ্যের জন্য পন্য সামগ্রী ও কাঁচামালও আসতো আমিরাত ও অন্যান্য দেশ থেকে। এছাড়া ২০২২ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দেশের আবকাঠামোকে আধুনিকায়ন করার দিকেই কাতার সরকারের সব মনোযোগ নিবিষ্ট ছিল। কিন্তু এই অবরোধ কাতারকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ হিসাবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।

আমদানী ও জ্বালানী-নির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে এসে বহুমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য কাতার জরুরী ভিত্তিতে ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ফলে অর্ন্তজাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও যেমন নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে, তেমনি বানজ্যি ক্ষেত্রে খুলে গেছে নতুন সম্ভবনার দ্বার। আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের অন্যান্য বহু দেশের সাথে বানিজ্যিক সম্পর্কের সূচনা করছে কাতার। ফলশ্রুতিতে রপ্তানীও বেড়েছে। কাতারের বন্দরগুলোতে পণ্যের ওঠা-নামা বেড়েছে প্রায় ২০০ শতাংশ। সরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কাতারের রপ্তানী আয় ২০১৭ সালের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়ে ২০১৮ সালে ৩০৬ বিলিয়ন রিয়ালে পৌচেছে। এছাড়া বিগত কয়েক বছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারও আশাব্যঞ্জক। এই বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩.১ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাই এই অবরোধকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার আর সুযোগ নেই।

তবে কাতারের কৃষিখাতে গত কয়েক বছরে রীতিমত বিপ্লব সাধিত হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে কাতারে শাক-সব্জি, দুগ্ধজাত পণ্য ও খাদ্য উৎপাদনের তৈরীর হয়েছে অসংখ্য খামার। কাতারের শুস্ক আবহাওয়ায় সারা বছর কৃষিকাজ অব্যাহত রাখার জন্য গ্রীন হাউস প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। গ্রীন হাউসের সংখ্যা গত বছর হাজার ছাড়িয়ে গেছে। যার মাধ্যমে প্রায় ৭ লাখ ২৯ হাজার বর্গমিটার এলাকাকে আবাদের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। শুধুমাত্র শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গ্রীন হাউসে ২০১৮ সালে ৬ হাজার ৫০০ টন শাক-সব্জি উৎপাদিত হয়েছে। আর উন্মুক্ত খামারে উৎপাদিত হয়েছে ৩৬ হাজার টন। আর ২০১৮ সালে কৃষিখাতে প্রায় ২৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

কাতারের পৌরসভা ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় আগামী চার বছরের মধ্যে ৩৫০০টি গ্রীন হাউস নির্মানের পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া জাপানের সহযোগীতায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্মার্ট কৃষি প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সারা বছরব্যাপী শাক-সব্জি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এভাবে চললে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কাতার আভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদা পূরণে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে।

কাতারে তৈরী খাদ্যপণ্য সামগ্রী

দোহা শহরের প্রতিটি সুপার মার্কেটে এখন মেড ইন কাতার লেখা পণ্য ভর্তি শেলফ চোখে পড়ছে। আগে কখনো কোন পন্য কোন দেশে থেকে আসছে কিংবা কোন দেশের তৈরী তা খুঁটিয়ে দেখিনি। কিন্তু অবরোধের দুই বছর পর সুপার মার্কেটে বিস্ময়কর পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। দুধ, দৈ, বাটার থেকে শুরু সব ধরনের দুগ্ধজাতীয় পানীয়, জুস এখন কাতারে তৈরী হচ্ছে। এছাড়া প্যাকেটজাত মুরগী, শাক-সব্জী সহ রান্নার তেলও এখন মেড ইন কাতার মোড়কে বিক্রি হচ্ছে।

কাতার সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে আভ্যন্তরীণ খাদ্য সরবরাহে স্বয়ংসম্পূর্নতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এছাড়া জ্বালানী রপ্তানীর উপর নির্ভরতা কমানোর জন্য নির্মিত হচ্ছে হাই-টেক শিল্প-কারখানা। এজন্য দক্ষ জনশক্তি আমদানির উপর বেশী গুরুত্ব দিচ্ছে কাতার। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হওয়ার পর, কাতারের নির্মানখাতে জনশক্তির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। কাতারে কর্মরত বহু শ্রমিকদের দেশে ফিরে যেতে হবে। তাই বাংলাদেশে সরকারকে সহসা নতুন শ্রম বাজারের সন্ধান করতে হবে।

বাংলাদেশে উদ্ভাবিত কৃষি প্রযুক্তি, কৃষিবিদ এবং কৃষি বিশেষজ্ঞদের বিশ্বব্যাপী সুনাম রয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশেও বাংলাদেশে উদ্ভাবিত বিভিন্ন পদ্ধতি কৃষি খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। বৈদেশিক রেমিট্যান্স এবং জনশক্তি রপ্তানীর ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য তাই বাংলাদেশ সরকারকে এখন থেকেই কাতারের ক্রমবর্ধমান কৃষি এবং শিল্পখাতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করার জন্য উপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।

(নগর পরিকল্পনাবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •