ডেস্ক নিউজ:

তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে পেঁয়াজের বাজারে চলছে অস্থিরতা। এই অস্থিরতা থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিতে সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে সেগুলো ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে বিক্রি করাও শুরু করে। অথচ এর প্রভাব পড়েনি বাজারে। বাংলাদেশ ব্যাংক, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী—এই সময়ের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। ভোক্তাদের প্রশ্ন—চাহিদার চেয়ে বেশি আমদানির পরও পেঁয়াজের মূল্য কমছে না কেন?

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের চাহিদা মেটাতে সরকার মিয়ানমার, মিসর, চীন ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেয়। ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের সরবরাহ কমলেও তাৎক্ষণিকভাবে তা পূর্ণ করা হয়েছে মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ। এলসি ও বর্ডার ট্রেডের মাধ্যমে দেশের বাজারে ঢুকেছে এসব পেঁয়াজ। পাশাপাশি দেশি পেঁয়াজও ছিল।

প্রসঙ্গত, ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত সরকার নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর স্বার্থে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়। বিষয়টিকে পুঁজি করে বাংলাদেশের বাজারে প্রতি মুহূর্তে বাড়তে থাকে পেঁয়াজের মূল্য। ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজের মূল্য ঠেকেছে ২৭০ টাকায়।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২৩ লাখ ৩৪ হাজার মেট্রিক টন। ১০ অক্টোবর পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত হুট করে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেওয়ায় বিভিন্ন দেশ থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত আরও আমদানি হয়েছে ৮২ হাজার মেট্রিক টন। এ সময় পর্যন্ত সব মিলিয়ে দেশে মোট পেঁয়াজের সরবরাহ হয়েছে ৩২ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন। অথচ বছরে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা মাত্র ২৪ লাখ মেট্রিক টন। ফলে উদ্বৃত্ত থাকার কথা কমপক্ষে ৮ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ। এই পণ্যটির ৩০ শতাংশ হারে সাত লাখ টন পেঁয়াজ পচেও যায়, তবু বাজারে থাকার কথা ৭৬ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ।

এরপরও গত ৫ ডিসেম্বর ৪ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন পেঁয়াজ দেশে এসেছে। এরমধ্যে টেকনাফ হয়ে এসেছে ১ হাজার ২২৯ মেট্রিক টন এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর হয়ে এসেছে ২ হাজার ৯৩২ মেট্রিক টন পেঁয়াজ। বৃহস্পতিবার দেশে আসা আমদানি করা পেঁয়াজের মধ্যে মিয়ানমার থেকে ১ হাজার ২২৭ মেট্রিক টন, চীন থেকে ৩৮৪ মেট্রিক টন, মিশর থেকে ৮৪ মেট্রিক টন এবং তুরস্ক থেকে ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন এসেছে।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, শনিবার এক দিনেই সিটি গ্রুপের ১০০ কনটেইনার পেঁয়াজ বন্দরে এসেছে। এ চালানে দুই হাজার ৫৫৬ টন পেঁয়াজ রয়েছে। এটি এ সময়কালের সবচেয়ে বড় চালান। সূত্র আরও জানিয়েছে বন্দরের জেটিতে অন্য জাহাজ থেকেও খালাস হচ্ছে পেঁয়াজ। এখন বন্দর সীমায় রয়েছে পেঁয়াজভর্তি চারটি জাহাজ। এসব জাহাজে বিভিন্ন আমদানিকারকের আরও এক হাজার ৪০০ টন পেঁয়াজ রয়েছে বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতিদাতা ঢাকার উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের পরিচালক ড. আজাহার আলী বলেন, ‘অনুমতিপত্র নেওয়া অন্তত আরও ১০ হাজার টন পেঁয়াজ আগামী এক সপ্তাহে আসতে পারে।’

এ প্রসঙ্গে সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা জানিয়েছেন, সিটি গ্রুপ বিমানপথে ৩০ টন পেঁয়াজ আমদানি করেছে। শনিবার সমুদ্রপথে আরও আড়াই হাজার টন পেঁয়াজ বন্দরে পৌঁছার কথা রয়েছে। সিটি গ্রুপ বিমান ও সাগর পথে আমদানি করা এই পেঁয়াজ টিসিবির কাছে প্রতিকেজি ৩৬ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিক্রি করছে। টিসিবি সেই পেঁয়াজ সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছে।

এদিকে এস আলম গ্রুপ জানিয়েছে, বিমানপথে ৩৭২ টন পেঁয়াজ আমদানি করে তা টিসিবিকে দিয়েছে এস আলম গ্রুপ। তারা মিসর থেকে আরও ২ হাজার টন এবং তুরস্ক থেকে জাহাজে ১০ হাজার টন পেঁয়াজ আনবে।

বিসমিল্লাহ গ্রুপ ইতোমধ্যেই ১ হাজার ১০০ টন পেঁয়াজ আমদানি করেছে। তিনটি জাহাজে এসব পেঁয়াজ দেশে এসেছে। এগুলো বন্দরে খালাস হয়ে বাজারে পৌঁছে গেছে। মেঘনা গ্রুপের পেঁয়াজ এসেছে ২ হাজার ১০০ টন। এর আগে মেঘনা গ্রুপ ২০ টন পেঁয়াজ বিমানপথে এনে টিসিবির কাছে বিক্রি করেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের পেঁয়াজের চাহিদা ও জোগানের কোনও সঠিক হিসাব নেই। ব্যবসায়ীদের ধারণা, প্রতিবছর চাহিদার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পেঁয়াজ দেশে উৎপাদন করা হয়। বাকিটা আমদানি হয়। আমদানির প্রায় সবটুকুই ভারতনির্ভর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) হিসাবে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৯২ হাজার টন।

এত বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানির পরও বাজারে এই নিত্যপণ্যটির মূল্য কমেনি। শনিবারও (৭ ডিসেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজারে দেশি পুরনো পেঁয়াজ প্রতিকেজির মূল্য ২৫০ টাকা, মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের কেজি ২০০ টাকা। মিসর ও চীন থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের কেজি ১২০ থেকে ১৬০ টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানিয়েছেন দেশি পেঁয়াজ পুরোপুরি দেশের বাজারে উঠলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। পেঁয়াজের বাজার এখন নির্ভর করছে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের ওপর।’ ওই পর্যন্ত সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •