শাহেদুল ইসলাম মনির

শঙ্খ নদী ও মাতামুহুরী নদীর শাখাপ্রশাখা দ্বারা উজান থেকে বয়ে আনা পলিমাটিতে কুতুবদিয়া দ্বীপের সৃষ্টি।

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, সমুদ্র- গর্ভে অনেকদূর বিস্তৃত শিলাস্তর বিদ্যামান। শিলাস্তরে স্রোতবাহিত বালুকারাশি দ্বারা সৃষ্টি এ দ্বীপের কোন কোন স্থানে সুগভীর খননের ফলে এখনো প্রকান্ড শিলাখন্ড ও বৃক্ষমূলের অশিষ্টাংশের সন্ধান মিলে।

কুতুবদিয়া দ্বীপের পশ্চিমে অনেক আগে গরুড়দ্বীপ নামে একটি দ্বীপ ছিল। প্রায় ১৪/১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে কুতুবদিয়ার সমান্তরাল এ দ্বীপের অবস্থান ছিল।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ক্রমাগত বিপর্যয়ে দ্বীপটি এক সময় বিলীন হয়ে আজ ইতিহাসের পাতায় স্থান লাভ করেছে। এটা আনুমানিক ৯০০ খৃষ্টাব্দের কথা।

মূল কুতুবদিয়ার আয়তন ছিল ৯৭ বর্গ মাইল ( ২৫০ বর্গকিলোমিটার)।

শঙ্খ নদীর স্রোতের তোড়ে, ক্রমাগত জলোচ্ছ্বাস এবং ঝড়ের আঘাতে দ্বীপের আয়তন কমতে থাকে।  বর্তমানে কুতুবদিয়া আয়তন ২০ বর্গমাইল বলে কথিত আছে।

১৯৯১ সনের ২৯ এপ্রিল ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসে খুদিয়ারটেকের বিরাট ভাঙন এবং বড়ঘোপ, কৈয়ারবিল ও ইউনিয়নের পশ্চিমাংশে বেশকিছু এলাকা সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে কুতুবদিয়ার আয়তন অনেক কমে গেছে।  জলোচ্ছূাসের পর দ্বীপরক্ষার্থে যখন পানি উন্নয়ন বোর্ড নতুন করে বেড়িবাঁধ নির্মাণ শুরু করে তখন অনেক জায়গা ছেড়ে দিয়ে মূল ভুমিতে বাধঁ নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।

সবচেয়ে বেশি ছাড় দেয়া হয়েছে খুদিয়ারটেকে।

বিশেষ করে খুদিয়ারটেকের ভাঙন কবলিত জনসাধারণ কক্সবাজার জেলা শহরের উপকন্ঠে আশ্রয় নেয়। ফলে বর্তমান কক্সবাজার শহরের উপকন্ঠের এলাকাতে অবস্থান নেয়া কুতুবদিয়াবাসীদের বস্তিটিকে কুতুবদিয়া পাড়া নামে অভিহিত করা হচ্ছে। অনেক লোকজন চকরিয়া সহ জেলার মূল ভূখন্ডে স্থায়ী আবাস নির্মাণ করেছে।

ভৌগোলিক অবস্থানঃ-

চট্টগ্রাম জেলাসদর থেকে ৭২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে কুতুবদিয়ার অবস্থান।

মানচিত্রে মোচা আকৃতি কুতুবদিয়াকে দেখা যায়। ২১.৪৩ উওর অক্ষাংশ হতে ২১.৫৬ উওর অক্ষাংশের মধ্যে এবং ৯১.৫০ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ হতে ৯১.৫৪ পূর্ব দ্রাঘিমার মধো কুতুবদিয়া অবস্থান।

কুতুবদিয়া দক্ষিণ, পশ্চিম ও উওরে বঙ্গোপসাগর এবং পূর্বে কুতুবদিয়া চ্যানেল। কুতুবদিয়া চ্যানেলের ওপারে মূল ভূখন্ডে বাঁশখালীর হাটখালী, ছনুয়া এবং চকরিয়া উপজেলার মাগনামা, উজানটিয়া আর মহেশখালীর মাতারবাড়ী অবস্থিত।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতঃ-

কুতুবদিয়ার অস্তিত্ব অনেক আগে থেকেই ছিল এবং কিছু কিছু লোকজন চাষাবাদ ও মাছ ধরার মাধ্যমে জীবিকা লাভের উদ্দেশ্য দ্বীপে অবস্থান করলেও তথ্যের অভাবে তখনকার প্রকৃত পরিসংখ্যান অবগত হওয়া সম্ভব হয়নি।

ডি.বেরস নামের একজন পর্তুগীজ ঐতিহাসিক ১৫৫০ সনের দিকে এ এলাকার একটি মানচিত্র প্রস্তুত করেন। তুরস্কের সুলতান সোলায়মান লোহিত সাগর হয়ে ভারত মহাসাগর নৌভ্রমণ করেন। তার নৌভ্রমণকালে জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন সিদি আলী চেহলভী।

 ভ্রমণকালে ক্যাপ্টেন সিদি আলী চেহলভী মিরাৎ-উল-মমলিক অর্থাৎ দেশসমূহের দর্পন নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।

গ্রন্থটির লেখা সমাপ্ত হয় ভারতের গুজরাট রাজ্যের আহমদাবাদে। ডি.বেরসের প্রণীত মানচিত্র কিংবা সিদি আলী চেহলভী রচিত মিরাৎ-উল-মমলিক গ্রন্থের বিবরণে চকরিয়া দ্বীপের কথা আছে কিন্তু কুতুবদিয়া দ্বীপের কথা স্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়নি। তখনকার দিনে কক্সবাজার এলাকা বলতে বুঝাত চকরিয়াকেই।

মূল ভূখন্ড হতে কুতুবদিয়া চকরিয়ার আড়ালে থাকলেও নৌপথে কুতুবদিয়া কিংবা গরুড় দ্বীপ বণিক ও জাহাজের নাবিকদের নিকট বেশ পরিচিত ছিল।

মাছ ধরার উদ্দেশ্যে জেলেদেরই প্রথম আগমন ঘটে কুতুবদিয়া দ্বীপে।১৬৫৯ সনের ৫ জানুয়ারি খাজওয়ার যুদ্ধে শাহ সুজা পরাজিত হন। ১৬৬০ সনের ৫ এপ্রিল তাঁড়ার যুদ্ধেও শাহ সুজা পরাজিত হন। তারপর ১৬৬০ সনের মে শাহ সুজা ঢাকা ত্যাগ করে ৩রা জুন চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপারে দিয়াং অঞ্চলে পৌঁছেন। সে বছর (১৬৬০) ২৬ আগস্ট আরাকানের রাজধানী ম্রোহং এসে পৌঁছেন। উদ্দেশ্য ছিল আরাকানের রাজা সহায়তায় নৌপথে ইরান গমন এবং ইরান সম্রাটের সামরিক সহায়তা নিয়ে হুমায়ুনের মত দিল্লির ক্ষমতা উদ্ধার করা।

প্রাচীনকাল থেকে গোটা চট্টগ্রাম অঞ্চলটিতে আরাকানের প্রাধান্য ছিল।  ১৫৮০ খৃষ্টাব্দ হতে ১৬৬৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৮৬ বৎসর সময়কাল বাংলাদেশের মূল অংশ থেকে চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন ছিল। মূল ভূখন্ড ছাড়াও নৌপথে উপকূলীয় অঞ্চলে মগ ও ফিরিঙ্গিরা স্থানীয় জনসাধারণের উপর নির্যাতন ও দস্যুতা করত। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে ১৬৬৬ সনে সবেদার শায়েস্তা খান অত্যাচারী আরাকানীদের দমনের জন্য চট্টগ্রাম অভিযান পরিচালনা করেন।

সুবেদারের যোদ্ধাপুত্র বুজর্গ উমেদ খান চট্টগ্রামের আরাকানী দুর্গ ও রামুর আরাকানী দুর্গ জয় করেন। তখন কুতুবদিয়া দ্বীপে আরাকানী মগ ও ফিরিঙ্গীদের উপস্থিত ছিল। অবস্থা বেগতিক দেখে আরাকানী মগ ও ফিরিঙ্গীরা কুতুবদিয়া ছেড়ে আরাকানে পলায়ন করে। আরাকানী মগ ও ফিরিঙ্গীরা চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরপর মুঘলদের উৎসাহে ও অনুকূল পরিবেশে এ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে মুসলমান আগমন ঘটে। এ সময়ে ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে অনেক পীর-বুজর্গ-অলিআল্লাহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে আসতে শুরু করেন। অবশ্য তার আগেই কুতুবউদ্দিন নামে জনৈক অলিআল্লাহ কুতুবদিয়া দ্বীপে আসেন। ১৩৩৮ সালে ফখর উদ্দীন মুবারক শাহ কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয়ের পর ইসলাম প্রচারের জন্য অনেক অলিআল্লাহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় আগমন করেন। কুতুবউদ্দিন এর সাথে এবং তার আগমনের পর আরো অনেক বুজর্গ পীর ও অলিআল্লাহ আগমন ঘটে এখানে। তাদের  মধ্যে আলী ফকির, আলী আকবর, ওমর শাহ (একহাইত্যা ফকির), রুস্তম শাহ,মোরাদ শাহ,ঈদা ফকির ও মাগন আলী অন্যতম।

কুতুবদিয়া দ্বীপটি এই কুতুব আউলিয়ার নামেই নামকরণ করা হয়েছে। কুতুবউদ্দিন বা কুতুব আউলিয়া ( অলি অর্থ সাধু পুরুষ আর অলি শব্দের বহুবচন হচ্ছে আউলিয়া) কুতুবদিয়া দ্বীপের মুরালিয়া, বড়ঘোপ, মগডেইল,আলী আকবরডেইল ও ধুরুং এলাকায় অবস্থান করে ইবাদত বন্দগি করেন। এ কারনে উল্লেখিত প্রত্যেকটি স্থান বা আস্তানাকে ভক্তসাধারন মাজারজ্ঞানে শ্রদ্ধা করে থাকে এবং কুতুব আউলিয়ার মৃত্যুর পর আলীআকবরডেইল মাজারটি  কুতুব আউলিয়ার স্মৃতি বহন করে আছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •