জসীম উদ্দীনঃ
মাথার উপর বিরাট ঋণের বোঝা নিয়েও লবণ উৎপাদনের মাঠে নেমেছে কক্সবাজারের প্রান্তিক চাষীরা। প্রত্যাশিত কৃষিঋণ আমাগী মৌসুমে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা। চলতি মৌসুমে নিজস্ব ফান্ড থেকে লবণ চাষিদের ঋণ দেবে বিসিক।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করর্পোরেশন
(বিসিক) কক্সবাজার এর উপমহাব্যবস্থাপক ছৈয়দ আহমদ লবণ চাষিদের দুর্দশার কথা স্বীকার করেন।
বিসিক চেয়ারম্যান এসব বিষয় অবগত আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, কক্সবাজারের কৃষিঋণ কমিটির বৈঠকে লবণ চাষিদের কৃষিঋণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক কতৃক যে নীতিমালা দেয়া হয়েছে তাতে লবণকে কৃষিপণ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। বিষয়টি জানার পর আমি বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে যাই। বাংলাদেশ ব্যাংক কতৃক নির্দেশনা বা চিঠি পেলে কৃষিঋণের ব্যাবস্থা করা হবে বলে ব্যাংক গুলোর পক্ষথেকে আমাকে জানানো হয়।
ছৈয়দ আলম আরও বলেন, কৃষিঋণ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বিস্তারিত জানিয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করর্পোরেশন ( বিসিক) চেয়ারম্যান বরাবর আমি চিঠি পাঠিয়েছি।এরই প্রেক্ষিতে জানতে পারি (বিসিক) থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর দ্রুত লবণ চাষীদের কৃষিঋণ বাস্তবায়নের লক্ষে প্রত্যেক ব্যাংক এবং শাখাগুলোকে নির্দেশনা দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে।
চলতি মৌসুমে ব্যাংক কৃষিঋণ বাস্তবায়ন করা না গেলেও (বিসিক) এর নিজস্ব ফান্ড থেকে লবণ চাষিদের ন্যূনতম সুদে ঋণ দেয়া হবে বলে জানান বিসিকের এই কর্মকর্তা। তবে কবে নাগাদ কি পরিমাণ ঋণ দেয়া হবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলেন নি তিনি।
গত মৌসুমে কক্সবাজারে প্রায় ৬০ হাজার একর জমি থেকে লবণ উৎপাদন হয়েছে ১৮লাখ ২৪ হাজার মেট্রিকটন। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। দেশের ৫৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্ছ লবণ উৎপাদনের রেকর্ড। বেশি লবণ উৎপাদন হলেও স্বস্তি ফিরেনি চাষিদের ঘরে। ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং বিদেশ থেকে অপ্রয়োজনীয় লবণ আমদানির কারনে লক্ষ লক্ষ মেট্রিকটন লবণ এখনো অবিক্রিত পড়ে আছে।
তার মধ্যে শুরু হয়েছে লবণের নতুন মৌসুম।সংশয় থাকলেও অন্য উপায় না থাকায় বাধ্য হয়ে নতুন মৌসুমে লবণ চাষাবাদে মাঠে নামতে শুরু করেছেন চাষিরা। এরই মধ্যে কক্সবাজারের উপকূলে চিংড়ি ঘের গুঁটিয়ে বর্তমানে লবণ চাষীরা পুরোধমে লবণ মাঠ তৈরির কাজ শুরু করেছেন। চাষীরা দিনের পুরোটাই সময় ব্যয় করছেন লবণ মাঠ তৈরির কাজে।
বিশেষ করে কক্সবাজার সদরের খুরুস্কুল, ভারুয়াখালি, চৌফলদন্ডি, পোকখালী ও ইসলামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় লবণের মাঠ তৈরিতে ব্যাস্ত সময় পার করছেন চাষিরা।এ ছাড়াও জেলার কুতুবদিয়া, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও টেকনাফসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার চাষিরা নতুন মৌসুমে লবণ উৎপাদনের লক্ষে লবণের মাঠ তৈরির কাজ শুরু করেছেন অনেকেই।
ঋণের উপরে ঋণ নিয়ে লবণ উৎপাদনে মাঠে চাষিরা। বেশিভাগ চাষী গত মৌসুমের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদনে নামছে। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় বিদেশ থেকে লবণ আমদানির কারনে চাষীদের এমন দূর অবস্থা।
এবারও এসব চাষিদের ঋণ নিয়ে লবণের চাষাবাদ শুরু করতে হচ্ছে। অর্থাৎ ঋণের উপরে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে লবণ উৎপাদনে নামতে বাধ্য হচ্ছে বেশিরভাগ চাষি।
প্রান্তিক লবণ চাষিদের জন্য সরকারি বা বেসরকারি কৃষিঋণের বিশেষ কোন সুবিধা নাই। তাই এলাকার লবণ ব্যবসায়ী (দালালদের) কাছ থেকে মন প্রতি চওড়া কমিশনের ভিক্তিতে টাকা নিয়ে লবণের চাষ করে থাকেন চাষিরা।
এ টাকা দিয়ে জমির লাগিয়ত, মাঠ তৈরি, পলিথিসহ নানান সরঞ্জাম কেনাকাটা করা হয়।এমন কি ঋণের টাকায় নিজেদের সংসারের খরচ পর্যন্ত টানতে হয় চাষিদের।
বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে উৎপাদিত লবণ বিক্রি করে টাকা শোধ করা না হলে কমিশন বেড়ে হয় কয়েকগুণ। ফলে ন্যায্যমূল্যে সঠিক সময় লবণ বিক্রি করতে না পারলে লোকসান গুণতে হয় অসহায় চাষিদের। এ কারনে অনেক প্রান্তিক চাষি চলতি মৌসুমে লবণের চাষবাদ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।
সদরের ইসলামপুরের লবণ চাষি ফরিদুল আলম জানান, নতুন লবণের মৌসুম শুরু হলেও এখনো গত মৌসুমের ৭০০ মন মত লবণ রয়েগেছে তার। তাই শোধ করতে পারেননি ঋণ। এবারও ঋনের উপরে ঋণ নিয়ে নতুন মৌসুমের লবণ চাষাবাদ শুরু করেছেন তিনি।
অারেক লবণ চাষি মোস্তাফার অবস্থাও একই। তিনি জানান, লবণের দাম নিয়ে সংশয় থাকলেও লবণের চাষ করা ছাড়া তার কোন উপায় নেই। তাই বাধ্য হয়ে তিনি এবার লবণের চাষাবাদে নেমেছেন।এমন শত শত চাষিদের একই ধরনের মন্তব্য পাওয়া গেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে লবণ শিল্প। এর পর লবণ চাষীরা কোন কালে মূল্যায়িত হয় নাই। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে এ শিল্পের সঙ্গে বিভিন্নভাবে প্রায় চার লাখ মানুষ জড়িত।
প্রত্যাশিত কৃষিঋণ চলতি মৌসুমেও বাস্তবায়ন হচ্ছেনা।
লবণ শিল্পকে বাঁচাতে লবণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের জোর দাবি কৃষিঋণ ও আলাদা লবণ বোর্ড গঠনের। দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোর্রেশন (বিসিক) লবণ চাষিদের কৃষিঋণ সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে।
বিসিক সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী লবণ চাষিরাও কৃষিঋণের অন্তর্ভুক্ত।লবণ চাষিদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন অকার্যকর কৃষিঋণ বাস্তবায়নের লক্ষে কাজ করে যাচ্ছে (বিসিক)। ব্যাংক গুলো চিঠি বা লিখিত নির্দেশনা দিলে লবণ চাষিদের জন্য কৃষিঋণ বাস্তবায়নের কথা। তবে চলতি মৌসুমে অল্প সময়ের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •