চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায় বন্য হাতির আক্রমণে সম্প্রতি তিনজন মানুষ নিহত হয়েছেন। গত ২৪ নভেম্বর, রোববার এ ঘটনা ঘটেছে। হাতিগুলো পাহাড় থেকে লোকালয়ে নেমে ফিরে যাওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটায়।

এর আগেও বোয়ালখালীতে বন্য হাতির আক্রমণে নিহত হবার ঘটনা ঘটেছিল। এমন কিছু দুঃখজনক ঘটনা প্রায়শ ঘটে। তবে কিছু দিন পর পর। বন্যহাতি হঠাৎ হঠাৎ কিছু মানুষের তাজা প্রাণ ছিনিয়ে নেয়। বিরতি নিয়ে এসব ঘটনা ঘটে বলে বনবিভাগ এক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে উদাসী বলে অভিযোগ রয়েছে।

তথ্যমতে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২২ জুলাই আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের মধ্যম গুয়াপঞ্চক গ্রামের ৮ বাড়িতে বন্য হাতি তান্ডব চালিয়ে ভাঙচুর করেছে। রাতে ঐ গ্রামের আবদুল খালেক, আবদুল হক, মোহাম্মদ আলমগীর, জালাল আহমেদ, জাগির আহমেদ, আবদুল কাদের, মোহাম্মদ ইদ্রিস ও হাসন আলীর ঘরের দেয়াল ভেঙে দিয়েছিল।

চলতি বছরের ২৬ জুন আনোয়ারায় উপজেলার বটতলী ইউনিয়নের গুচ্ছগ্রামে রাতে বন্য হাতির আক্রমণে মোমেনা খাতুন (৬৫) নামে এক বৃদ্ধা মৃত্যু হন। সূত্রে আরও জানা যায়, আনোয়ারার বৈরাগ, বটতলী এলাকা এবং কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ও কেইপিজেড এলাকায় বন্য হাতিকে প্রায় সময় ঘুরতে দেখা যায়। বিগত ১৯ জুলাই কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নে বন্য হাতির আক্রমণে ৫ বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত, ও মো. জাফর (৪৫) নামে এক ব্যক্তি আহত হন।

এছাড়াও গত এক বছরে আনোয়ারায় হাতির আক্রমণে ৩ জন নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন সময়ের হামলায় আহত হয়েছেন অন্তত আরো ১০ জন। শুধুমাত্র আনোয়ারা-কর্ণফুলীতে বিগত ১০ বছরে হাতির আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে ৯ জন।

সাধারণত হাতি একটি শান্ত নিরীহ প্রাণী। হাতিকে মানুষ পোষও মানাতে পারে। সার্কাসে হাতি নিয়ে নানা খেলা দেখানো হয়। পোষ মানানো হাতি দিয়ে মানুষ কাজ ও করায়। এই বন্ধুবৎসল স্বভাবের কারণে বিভিন্ন দেশে হাতি নিয়ে একাধিক সিনেমা পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে আনোয়ারা কর্ণফুলী ও চুনতিতে সময়ে সময়ে হাতির নানা ঘটনা প্রবাহ শোনলেও বোয়ালখালিতে একই দিনে তিনজনের মৃত্যু ও হাতির এমন হিং¯্রতা ও মানুষ হত্যার বিষয়টিতে অনেকে বিষ্মিত।

বিশেষজ্ঞরা বোয়ালখালির ঘটনার দুটি বিশেষ দিকের প্রতি আলোকপাত করেছেন। প্রথমতঃ যে হাতির পালের আক্রমণে মানুষ মারা গেছে, সেই হাতিগুলো পোষা হাতি নয়, বন্য হাতি। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই এগুলোর মধ্যে অনেক বেশি বন্যতা, হিং¯্রতা।

দ্বিতীয়তঃ হাতিগুলো তাদের নিজস্ব আবাসস্থলে বসবাসের সংকট, আবহাওয়ার বিরুপ প্রভাব কিংবা খাবার সংকটের কারণে লোকালয়ে এসেছিল। এ সময়ে ফিরে যাওয়ার পথে তারা বাধা পেয়ে হিং¯্র হয়ে উঠে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বখতিয়ার নূর সিদ্দিকী বলেছেন, খাবার সংকটের কারণে হাতি লোকালয়ে নেমে আসে। এ প্রবণতা বাড়ছে। তবে নেমে আসার সময় তারা সাধারণত মানুষের উপর আক্রমণ করে না। তারা আক্রমণে যায় যখন খাবার খেতে গিয়ে কিংবা ফিরে যাবার সময় বাধাপ্রাপ্ত হয় অথবা তাদেরকে কেউ যদি ভয় দেখায়।

তিনি আরো বলেন, পাহাড় থেকে নেমে আসা হাতিদের ফিরে যাবার পথ খোলা রাখলে সাধারণত হাতি মানুষের ওপর আক্রমণ চালায় না। “মূলত ধান পাকার সময় হলে পাহাড় থেকে দল বেধে হাতি লোকালয়ে নেমে আসে, এবং যে পথে হাতি নেমে আসে, সে পথেই ফিরে যায়। যে কারণে হাতির ফেরার পথ যদি বন্ধ না রাখা হয় তাহলে সাধারণত হাতি হামলা চালায় না।”

“এবং হাতি সবসময় একটি নির্দিষ্ট পথেই আসে। কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায় স্থানীয় বাসিন্দারা হয়তো ঐ পথটি অবরুদ্ধ করে রাখে, বা ভয় পেয়ে তারা ধাওয়া দেয় বা হামলা চালায়। যে কারণে হাতি তখন হিং¯্র আচরণ করে।”

তিনি জানিয়েছেন, চট্টগ্রামে মূলত দুইটি পথ ধরে হাতি লোকালয়ে নেমে আসে। একটি হচ্ছে রাঙ্গুনিয়া-চন্দনাইশ-লোহাগাড়া-সাতকানিয়া-চুনটি রুট, আরেকটি হচ্ছে চকরিয়া-পেকুয়া-বাঁশখালী-আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর কিছু অংশের রুট ধরে।

বন বিভাগের কর্মকর্তা মো. সিদ্দিকী জানিয়েছেন, হাতির ফিরে যাওয়ার অন্তত একটি পথও যদি মুক্ত রাখা যেত তাহলে এ ধরণের দুর্ঘটনা হয়তো এড়ানো সম্ভব হতো।

সংশ্লিষ্ট ঘটনার স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন জানায়, ‘হঠাৎ বন্য হাতির এ রকম কিছু ঘটনা ঘটলে আমাদের কিছইু করার থাকেনা। কেনোনা বিষয়টি দেখাভাল করে বন বিভাগ। হয়তো ক্ষতিগ্রস্তদের কিছু আর্থিক সহায়তা করতে পারি। কিন্তু দরকার মানুষের জীবন রক্ষার ভিন্ন উপায়।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •