মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং ইউনিয়নের পূর্ব রত্নাপালং বড়ুয়া পাড়ায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত্রে সংগঠিত চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডার হত্যাকান্ডের তদন্তে গত দীর্ঘ ৫০ দিনেও তিল পরিমান অগ্রগতি নেই। তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর তদন্ত কার্যক্রমে হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহত হওয়া ৪ জনের অভিবাবক রোকেন বড়ুয়া। হত্যাকান্ডের ৫০ দিন পরও কোন আসামী সনাক্ত করতে নাপারায় রত্নাপালং এর সকল সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে খুনের প্রকৃত আসামীকে আইনের আওতায় আনতে উখিয়ার কোর্ট বাজার স্টেশনে শুক্রবার ১৫ নভেম্বর বিকেল সাড়ে ৪ টা হতে মানববন্দন করছে।

এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের পর কক্সবাজার জেলা পুলিশ মামলাটি ১৫ দিন অর্থাৎ গত অক্টোবরের ৯ তারিখ পর্যন্ত তদন্ত করে সুনির্দিষ্ট কোন হত্যাকারী সনাক্ত করতে নাপেরে শিপু বড়ুয়া ও উজ্জ্বল বড়ুয়া নামক সন্দেহজনক দু’জন আসামী আসামি গ্রেপ্তার করে। পরদিন কক্সবাজার জেলা পুলিশ মামলাটি পিবিআই কক্সবাজার অফিসকে হস্তান্তর করে। জেলা পুলিশের সন্দেহজনক ভাবে গ্রেপ্তার করা আসামী শিপু বড়ুয়া ও উজ্জ্বল বড়ুয়া কে ৭ দিনের রিমান্ডের জন্য আদালতে প্রার্থনা করলেও আদালত মাত্র একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সেই রিমান্ড করার পরও ঐ দু’জন আসামী থেকে হত্যাকান্ডের কোন মোটিভ বের করতে পারেননি তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই এর পুলক বড়ুয়া সিবিএন-কে জানিয়েছেন। পিবিআই এর কক্সবাজার অফিস প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন দাপ্তরিক কাজে ঢাকা অবস্থান করায় এ বিষয়ে পিবিআই এর কক্সবাজার অফিসের ইন্সপেক্টর মেজবাহ উদ্দিন সিবিএন-কে বলেন, গণমাধ্যমকে বলার মতো মামলাটির মূলত কোন অগ্রগতি হয়নি। তবে মামলাটির প্রকৃত খুনীদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য পিবিআই সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই মামলার তদন্ত কাজে শৈথিল্য প্রদর্শনের কোন সুযোগ নেই। তদন্ত কাজে আশানুরূপ অগ্রগতি হলেই গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিক ভাবে জানানো হবে বলে পরিদর্শক মেজবাহ উদ্দিন সিবিএন-কে জানিয়েছেন। এই ফোর মার্ডার মামলার অগ্রগতি বিষয়ে কক্সবাজার পিবিআই এর ইনস্পেকটর মেজবাহ উদ্দিন সিবিএন-কে আরো জানান, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মতো মামলাটির প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে। পেশাদারিত্বের সাথে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, দ্রুততম সময়ে মামলাটির বিষয়ে একটা ইতিবাচক ফলাফল দিতে পারবো।

এদিকে, উক্ত চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডার মামলার পিবিআই এর নিয়োগকৃত তদন্তকারী কর্মকর্তার (আইও) বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যান ট্রাস্টের ট্রাস্টি এডভোকেট দীপংকর বড়ুয়া পিন্টু। তিনি বলেন, তদন্ত কাজে আইও পুলক বড়ুয়া কে সহায়তা করার জন্য চেষ্টা করেও পুলক বড়ুয়া আমাদের আগ্রহকে গুরুত্ব না দেয়ায় একদিকে, তাকে আমরা কোন সহায়তা করতে পারছিনা, অন্যদিকে- তার নিজের কাজের অগ্রগতিও আমরা কেউ জানতে পারছিনা। ফলে মামলাটি অগ্রগতি নিয়ে পুলক বড়ুয়ার কার্যক্রমে তারা খুবই হতাশ বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের নির্বাহী সভাপতি এডভোকেট দীপংকর বড়ুয়া পিন্টু। এভাবে মামলার বিষয়ে সবাইকে অন্ধকারে রাখা তাঁর কাম্য নয় বলে জানান এ বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা এডভোকেট দীপংকর বড়ুয়া পিন্টু। একইভাবে মামলার আইও পুলক বড়ুয়া গণমাধ্যমকেও তার ব্যর্থতার কারণে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যান বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এই চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডার মামলা সম্পর্কে কুয়েত প্রবাসী, বর্তমানে রত্নাপালং এ অবস্থানরত রোকেন বড়ুয়া কক্সবাজার জেলা পুলিশের কাছে মামলাটি থাকাবস্থায় তাদের জোর তৎপরতা দেখে খুনের রহস্য উদঘাটনে আশার সঞ্চার হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি সিবিএন-কে বলেন, পিবিআই এর কাছে মামলাটি হস্তান্তরের ৩৫ দিন পরও তাদের ঝিমিয়ে পড়া তদন্ত কার্যক্রম দেখে একেবারে হাতাশ হয়ে গেছি। পিবিআই এই মামলা ক্লু বের পারবেন কিনা, এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে রোকেন বড়ুয়া বলেন, এ মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত তিনি কুয়েত যাবেননা বলে সিবিএন-কে জানান। নতুন করে বিয়ে করতে যাচ্ছেন কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে রোকেন বড়ুয়া সিবিএন-কে বলেন, আপাতত বিয়ে করার কোন চিন্তা করছি না। মামলার প্রকৃত খুনীরা সনাক্ত হলে হয়ত বিয়ে এবং কুয়েত যাওয়ার চিন্তা করবো।
এদিকে, রত্না পালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খাইরুল আলম চৌধুরী সিবিএন-কে বলেন, পিবিআই মামলারটি বিষয়ে কোন অগ্রগতি আছে কিনা, সেটা তারা কাউকে আপতত বলছেননা। তবে নিরবে তারা তদন্তকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানি।

পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) এর ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) পুলক বড়ুয়া হচ্ছেন এ চাঞ্চল্যকর মামলার ৩ নম্বর তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও)। মামলাটি কক্সবাজার জেলা পুলিশের তত্বাবধানে থাকাবস্থায় প্রথমে উখিয়া থানার এসআই ফারুক হোসেনকে, পরে একই থানার ওসি (তদন্ত) মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম মজুমদারকে আইও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
প্রসংগত, উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং ইউনিয়নের পূর্ব রত্নাপালং বড়ুয়া পাড়ায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে ৪ জনকে জবাই করে হত্যার ঘটনায় ২ জনকে কক্সবাজার জেলা পুলিশ গত ৯ অক্টোবর গ্রেফতার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো-শিপু বড়ুয়ার স্ত্রী রিপু বড়ুয়া (২৮) ও অপরজন হলো রোমেল বড়ুয়ার পুত্র উজ্জ্বল বড়ুয়া (২৪)। গ্রেপ্তারকৃত ২ জনই রোকেন বড়ুয়ার নিকটাত্মীয়। তারমধ্যে, রিপু বড়ুয়া হচ্ছে-প্রবাসী স্বজনহারা রোকেন বড়ুয়ার সেজ ভাই শিপু বড়ুয়ার স্ত্রী এবং ফোর মার্ডারে নিহত সনী বড়ুয়ার (৬) মা। অপর আসামি হলো রোকেন বড়ুয়ার ভাগ্নি জামাই উজ্জ্বল বড়ুয়া। উজ্জ্বল বড়ুয়ার বাড়ি রামু উপজেলার রাজারকুল ইউনিয়নের রামকোট এলাকায় অবস্থিত। উজ্জ্বল বড়ুয়াকে গত মঙ্গলবার ৮ অক্টোবর দিবাগত রাত সাড়ে ১০ টার দিকে তার শ্বশুরবাড়ি উখিয়া উপজেলার কুতুপালং থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে রিপু বড়ুয়াকে তার স্বামীর বাড়ি পূর্ব রত্নাপালং এর বড়ুয়া পাড়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং ইউনিয়নের পূর্ব রত্নাপালং বড়ুয়া পাড়ায় প্রবাসী রোকেন বড়ুয়ার বাড়ীতে গত ২৫ সেপ্টেম্বর বুধবার দিবাগত রাত্রে রোকন বড়ুয়ার মা সুখী বালা বড়ুয়া (৬৫), সহধর্মিণী মিলা বড়ুয়া (২৫), একমাত্র পুত্র রবিন বড়ুয়া (৫) ও ভাইজি সনি বড়ুয়া (৬)কে কে বা কারা জবাই করে হত্যা করে। এরমধ্যে, নিহত রবিন বড়ুয়া রুমখা সয়েরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক প্রাথমিক শ্রেণির ছাত্র ছিলো।

এবিষয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর উখিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর ৪৭/২০১৯, যার জিআর মামলা নম্বর : ৪৭৮/২০১৯ (উখিয়া) ধারা : ফৌজদারি দন্ড বিধি : ৩০২ ও ৩৪। মামলায় নিহত মিলা বড়ুয়ার পিতা ও রোকেন বড়ুয়ার শ্বশুর শশাংক বড়ুয়া বাদী হয়েছেন। মামলার এজাহারে সুনির্দিষ্ট কাউকে আসামী করা হয়নি, আসামী অজ্ঞাত হিসাবে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •