বালতি বালকের জীবনবৃত্তান্ত!

– মাহদী হাসান রিয়াদ

ছেলেটার নাম রায়হান। বয়স তেরো কিংবা বারো হবে। হাসোজ্জল চেহারা। আচার-আচরণও বেশ অমায়িক। পরনে হাফপ্যান্ট আর কমলা কালারের গেঞ্জি। হাতে মাঝারি সাইজের লাল-রঙের একটি বালতি। উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে কী যেনো বলছিলো। তবে, আদৌও সে কি বলছিলো তা স্পষ্ট ভাবে শোনা যাচ্ছিলো না। একদিকে উত্তাল সাগরের গর্জন, অন্য দিকে মানুষের বলনের শব্দ। কক্সবাজার সৈকত মানেই তো লোকারণ্য। নতুন করে বলার কিইবা আছে,সবারই তো জানা। সবমিলিয়ে ওই বালতি বালকের উচ্চ ডাকের ভাবার্থ আমার কানের দরজায় এসে কড়া নাড়লেও দরজাটা খোলে ঠিক বরণ করে নিতে পারছিলাম না! যাক,আমিও আর তম্বি করে শোনতে চাইলাম না। কেনোনা, এরূপ হাজারো বালতি বালকের চিত্র তো হরহামেশাই দেখা যায় সৈকতে।

আস্তে-ধীরে সাগরপাড়ের দিকে চলে আসতে লাগলাম। ততক্ষণে ওই বালতি বালকও খুব কাছাকাছি চলে আসলো, প্রায় ছুঁইছুঁই। আবারো চিক্কুর দিয়ে ওঠলো। এবার তার চিৎকারের ভাবার্থ অবশ্যই বোঝতে কষ্ট হয়নি। খুব কাছেই সে। অকপটে বোঝে গেলাম। ‘এই ঠান্ডা পানি আছে, ঠান্ডা পানি,নিবেন?’ অবাক করা বিষয় হচ্ছে বালতি বালক আমার সামনে আসতে নাআসতেই তার ওই উচ্চস্বরটা ক্যামনে জানি মিইয়ে গেলো। এবার আমাকেই টার্গেট করে বললো— ‘ভায়া,ঠান্ডা পানি আছে,নিবেন?’
মনেমনে ভাবতে লাগলাম—’আমি বাপু কিপ্টে মানুষ, মিনিট-পাঁচেক পর রুমে গেলেই স্বচ্ছ পানি তো পাচ্ছিই। আর মিনারেল ওয়াটার খাওনের খায়েশ আমার নেই। তা-ও আবার দ্বিগুন দামে!’

তবে,ছেলেটার কপোলে অভাক করা এক মায়া ভাসছিলো। তার অমায়িক আচরণে রীতিমতো মুগ্ধ হচ্ছিই তো হচ্ছি। বিক্রির পদ্ধতি দেখেও বিস্মিত হলাম। তার মধুমাখা ‘ভায়া’ ডাকটা যেনো ক্রমশ আঘাত করতেছিলো আমার হৃদয়ের খুব গহীনে এসে। অতঃপর ‘হুম,নেবো’ বলতেই হলো। একপ্রকার বাধ্য হয়েছি।

আঙ্গুলে ইশারায় কাছে আসতে বললাম। বললাম আরো কাছে আসো। আপত্তি না থাকলে পাশে এসে বসো। সে-ও খুব সহজেই অমনি পাশে বসে গেলো। আচমকা তার জীবনের সূত্র খোঁজার ইচ্ছে হলো! বললাম— ‘ছোট ভাই, তোমার কাছ থেকে কিছু জানার ছিলো! বলবা?’
জ্বি ভায়া, অবশ্যই। কেনো নয়…
নাম-ঠিকানা জিঙ্গাসা করলাম। এরপর বললাম— এ পেশায় ক’দিন ধরে আছো? এই তো ভায়া, গতবছর ক্লাস ফোরের বার্ষিক পরীক্ষার পর থেকেই। এবার নড়েচড়ে বসলাম! ক্লাস ফোর অবধি পড়েও ফাইভের সমাপনী পরীক্ষা দাওনি ক্যান? বেচারা মাথাটা নিচু করে ভাবতে লাগলো। মনে হচ্ছে আমার এ প্রশ্নে সে খুব হতাশ। যেনো বিষাদময় এক প্রশ্ন করে বসেছি তাকে।
রায়হান, এদিকে তাকাও। সমস্যা হচ্ছে তোমার?
না ভায়া, সমস্যা হচ্ছে না। তবে,কষ্ট হচ্ছে বেশ!
আচ্ছা, কেনোই বা কষ্ট হচ্ছে বলো…? রায়হান আমতাআমতা করতে লাগলো। সে যেনো চাচ্ছে কষ্ট গুলো নিজের ভেতর সীমাবদ্ধ করে রাখতে। এ পৃথিবী না জানুক/ না দেখুক তার লুকায়িত চাপা কষ্ট! রায়হান মনেমনে বোধহয় এ কথাটায় চিন্তা করতেছিলো।
তবে, মায়াভরা সূরে বললাম—রায়হান: বলো,আমি শুনতে চাই তোমার জীবনবৃত্তান্ত। রায়হান হয়তো খুব আপন ভেবে নিলো আমাকে। যেনো বিশ্বস্ত কেউ। এবার রায়হান রাজি হলো; জ্বী ভায়া,শুনেন তাহলে,বলছি।

রায়হানের বক্তব্যঃ
আমার বাবা ছিলেন জেলে। জীবিকার তাগিদে বেশিরভাগ সময়ই কাটাতেন সাগরে।
আমার বয়স তখন নয় বছর। ছোটবোন রাবেয়ার বয়স পাঁচ। তখনকার ঘটনা গুলো একটুআধটু মনে আছে আমার। সপ্তাহে একবার বাড়ি আসতেন বাবা। মাঝেমধ্যে পনেরো দিন পরেও আসতেন।
বলতে গেলে দিব্যি চলছিলো পরিবার।
এরপর প্রায় কুড়ি-দিন হয়ে গেলো, তবুও দেখা নেই বাবার। যাবার সময় বলে গিয়েছিলো সাত-আঠ দিন বাদেই চলে আসবে৷ কিন্তু বাবা আসার নামনিশানা নেই। এদিকে কোনো হদিশও পাচ্ছিলাম না বাবার৷ পুরো পরিবারে থমথমে এক পরিস্থিতি বিরাজ করতেছিলো। আতংকে সবাই। কী করবে? কী হবে? কোথায় যাবে? কাকে বলবে?
আম্মা উঠানে হামাগুড়ি দিতে দিতে বিলাপ ধরে কান্না করতেছিলো। ক্রন্দনের সুরে আকাশ-বাতাস
ভারী হয়ে যাচ্ছিলো রীতিমতো। আমি অবশ্যই বুঝে ওঠতে পারছিলাম না। কীইবা হচ্ছে আদৌও!
এভাবে দিনের পর সপ্তাহ, সপ্তাহর পর মাস,মাসের পর বছর অতিবাহিত হতে লাগলো। দেখা নেই বাবার। তারপর আমরা আন্দাজ করে নিলাম— হয়তো বাবা আর বেঁচে নেই! কিছু না বলেই বোধহয় চলে গেলেন তিনি আপন পারে। আল্লাহ মাফ করুক আমার আব্বাকে।

রায়হান: তারপর কী হলো?

এরপর ছোট বোনটাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন আম্মায়। বাবা থাকাকালীন অবস্থায় কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছিলো, যা দিয়ে বছর-দেড়বছর স্বাভাবিক ভাবেই চলছিলো সংসার। ডিজিটাল বাংলাদেশে অল্প টাকা দিয়ে ক’দিনই বা চলবে!
তারপর সংসারে নেমে এলো অশান্তির মহা প্লাবন। নেমে এলো অভাব-অনটন। এই প্লাবন আমাদের সব সুখেদের তছনছ করে দিলো। কেড়ে নিলো দুমুঠো আহার, আর রাতের ঘুম। আমার নতুন জামাটাকেও ছাড় দিলো না, ওটাও নিয়ে নিলো। তখন থেকে আর নতুন জামা গায়ে দেওয়া হয়নি। মূলত অর্থের অভাবে গায়ে দিতে পারি নিই।

ভায়া:— ওই প্লাবন কিন্তু দু’একটা জিনিস অবশ্য আমাদেরকে উপহার হিসেবে দিয়ে গিয়েছে।
কিছু না বলেই উপহার দিয়েছে ‘নীরব কান্না, বস্তা ভর্তি হতাশার ঝুলি, আর মাথাভর্তি হরেকরকম দুশ্চিন্তা’।
না, কিছুতেই সংসার চলছিলো না! এর মধ্যে অনেক টাকা ঋণ হয়ে যায়! চিন্তা আরো বেড়ে গেলো। প্রতিদিন পাওনাদারদের কুরুচিপূর্ণ কথা শুনতে শুনতে নিজের উপরই রাগ ওঠতো! না পারতাম কিছু বলতে/ না পারতাম তাদের কুরুচিপূর্ণ কথার পাল্টা জবাব দিতে! প্রতিবন্ধীর মতো বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিচ্ছুটি করার ছিলো না আমাদের। দু’হাত প্রসারিত করে শুধুই মালিককে বলতাম—’মালিক, এই করুণ অবস্থা থেকে মুক্তি চাই আমরা,মুক্তি দেন, দয়ে করেন আমাদেরকে’।

একদিন পড়ন্ত বিকেলে আমি/মা/ আমার ছোটবোন রাবেয়া বারান্দায় বসে কি নিয়ে যেনো মিটিং করতেছিলাম, ঠিক ওই মুহূর্তে পাশের বাড়ির নয়না খালা এসে উপস্থিত হলো। আম্মাকে বললো— বুবু, তোমার জন্য কাজ পেয়েছি, করবা?
আম্মা হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলেন। জানতে চাইলেন কী কাজ? খালা বললেন এক বাড়িতে রান্না করতে হবে, সকাল টাইমে রান্না করে দিয়ে চলে আসতে পারবা।
মাসে তিন হাজার দিবে। রান্নারহাত ভালো হলে সামনে আরো বাড়িয়ে দেবে।
তারপর আম্মা বললেন—বুবু, এ মুহুর্তে তিন হাজার টাকা আমার জন্য তিনলক্ষ টাকার মতো। কখন থেকে যাবো বলেন?
আচ্ছা, সকালে আমার সাথে যায়েন।
পরদিন থেকে আম্মা নিয়মিত কাজে চলে যেতে লাগলেন। কিন্তু, এই তিন হাজার টাকা দিয়ে সংসারের ঘানি টানা বেশ কষ্টসাধ্য! ওদিকে আবার পাওনাদারদের টাকাও দিতে হচ্ছে।
আম্মা আমাকে বললেন— সকালে ঝাউবাগানে গিয়ে ঝাউপাতা কুড়ালে কেমন হয়? শুনেছি ভালোই ইনকাম। তাহলে আম্মা আমিও যাবো আপনার সাথে। আম্মা তখন বললেন— না,তোর যেতে হবে না। সকালে মকতব আছে তোর,তুই বরং মকতবে যাস।

আম্মার ইনকামের টাকায় মোটামুটি সংসার চলছিলো। কিন্তু, গতবছর থেকে আম্মা অসুস্থ। কোনো কাজকাম করতে পারে না। পুরোপুরি অচল বললেই চলে। ছোটবোনটা যা পারে, তা-ই করে।
আম্মার ঔষধ খরচ, বাড়ির বাজার,আর ছোট বোনের খাতা-কলম কেনার টাকা জোগাড় করার জন্য আমার লেখা-পড়ার ইতি টানিয়ে দিলাম।
বই-খাতা নিয়ে বোধহয় আর যাওয়া হবে না স্কুলে।

রায়হান:- এগুলো বিক্রি করে দিনে কতো পাও?
এই তো ভয়া, তিনশো, কিংবা চারশো। তবে, সিজনে আরো বেশি পায়। আর রাতে বোতল কুড়াই। ওখানেও একশো-দেড়শো মতো পায়।
আলহামদুলিল্লাহ, আমার ইনকামে ভালোই চলছে।
আমার আম্মার জন্য একটু দো’আ কয়রেন ভায়া, যেনো ভালো হয়ে যায়। আম্মা ছাড়া কেউই নেই আমাদের। ওনিই সব।

মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে রায়হানের জীবনকাহিনী শুনছিলাম; নিজের অজান্তেই টপটপ করে চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল! আহা, মানুষের জীবন এতোটাই জটিল-কঠিন হতে পারে? কীভাবে সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। পরিস্থিতি অসম্ভবকেও সম্ভব করে দেয়। পরিস্থিতি মানুষকে শিখিয়ে দেয় অনেক কিছু। শিখিয়ে দেয় কীভাবে পরিস্থিতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়/ বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
ভালো থাকুক, সুখ ফিরিয়ে আসুক রায়হানদের মতো অসংখ্য রায়হানের জীবনে।

সর্বশেষ সংবাদ

কক্সবাজার পৌরসভা ২নং ওয়ার্ডে বিট পুলিশিং কার্যক্রমের শুভ সূচনা

এস কে সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

রোহিঙ্গা গণহত্যার ১ম দিনের শুনানি শেষ, যা জানানো হলো আদালতকে

চট্টগ্রাম-৮ আসনে উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান

টিসিবি’র পেঁয়াজে রাঙামাটির বাজারে স্বস্তি, ক্রেতাদের ভিড়

কক্সবাজার জেলা ফুটবল লীগ উদ্বোধন

সিএমপি’র ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হবে ১১ ডিসেম্বর

খরুলিয়ায় প্রবাসীর স্ত্রীকে শ্লীলতাহানি ও মারধর করে দোকান দখল

লোহাগাড়ায় বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পালিত

জনগণের ভ্যাটেই দেশ উন্নয়নে এগিয়ে যাবে -মেয়র নাছির

ঈদগাঁওতে দুই ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে প্রধান শিক্ষক আটক

পেকুয়ায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উদযাপন

শাপলাপুরে হবে ত্রিমূখী লড়াই

রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে মিয়ানমারে গণহত্যার প্রমাণ পেয়েছি-গাম্বিয়া

কক্সবাজারে উৎপাদিত পণ্যে ’মেড ইন কক্সবাজার’ নামে ব্রান্ডিং করার পরামর্শ ব্যবসায়ীদের

হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার শুনানি শুরু

মহেশখালীতে বিপুল পরিমাণ মালামালসহ অস্ত্র কারীগর গ্রেফতার

কক্সবাজারে ৬ লাখ ৩৫ হাজার জনকে দেয়া হচ্ছে কলেরা টিকা

মানবাধিকার বিড়ম্বনায় কেরামত আলী

পেকুয়ায় ভাই ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রীকে পিটিয়ে জখম, বাড়ি ভাংচুর