শাহেদ মিজান, সিবিএন:

কক্সবাজার সদর খাদ্যগুদামের লুটপাটের কাহিনী বহুদিনের। প্রতিনিয়ত ব্যাপক লুটপাট ও অনিয়ম হয় এই খাদ্যগুদামে। সব লুটপাটে বরাবরই অগ্রভাগে থাকে খাদ্য পরিদর্শক রাজিয়া সুলতানা ও উপ-খাদ্য পরিদর্শক কামরুল ইসলামের নাম। কথিত আছে, রাজিয়া সুলতানা যোগদানের পর থেকে এই খাদ্যগুদামে নিয়মিত লোপাট হয়ে আসছে লাখ লাখ টাকার চাল। এছাড়াও আরো নানাভাবে এই খাদ্যগুদামকে লুটপাটের কারখানা বানিয়ে রেখেছে রাজিয়া-কামরুল সিন্ডিকেট। কিন্তু বরাবরই তারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে! পার পেয়ে আবারো মেতে উঠে লুটপাটে। এই নিয়ে সাধারণ মহলের প্রশ্ন- রাজিয়া ও কামরুলের শেকড় কোথায়?

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার সদর খাদ্যগুদামে প্রায় সময় চাল নিয়ে নানা অনিয়ম ও লুটপাট হয়। কিন্তু অধিকাংশই থেকে সংশ্লিষ্টদের নজরের বাইরে। তবে মাঝে-মধ্যে ‘দুর্ভাগ্যবশত:’ ধরা পড়ে লুটপাটযজ্ঞ। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে তা আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু রাজিয়া ও কামরুল ইসলামসহ অন্যান্য দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না।
জানা গেছে, সদর খাদ্যগুদামের সবচেয়ে পুরনো হিসেবে রয়েছেন খাদ্য পরিদর্শক রাজিয়া সুলতানা। তিনি দীর্ঘ ১০ বছরের বেশি সময় এই একই কর্মস্থলে ঘাপটি মেরে রয়েছেন। তার সাথে রয়েছে উপ-খাদ্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম। দু’জন মিলে অসাধু চাল আড়দারদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন চাল লুটপাটের সিন্ডিকেট। এর মধ্যে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হয়ে যারা আসেন তাদেরকেও ভিড়িয়ে নেন রাজিয়া-কামরুল। এভাবে তারা বছরের পর বছর ধরে লাখ লাখ টাকার চাল লোপাট করে যাচ্ছে। গোপনে ৫০ কেজির চালের বস্তাকে ৩০ কেজি করে ফেলার দায়ে সর্বশেষ গত গতকাল শুক্রবার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহ উদ্দীন ও পিয়নকে আটক করেছে র‌্যাব। এসময় কামরুলসহ অন্যরা পালিয়ে যায়।

অনুসন্ধানী সূত্র জানায়, সদর খাদ্য গুদামের দুর্নীতির মুল হোতা খাদ্য পরিদর্শক রাজিয়া সুলতানা। তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে থেকে অসাধু ব্যবসায়িদের সাথে সিন্ডিকেট তৈরী করেছেন। ওয়ান ইলেভেনের সময় সরকারি খাদ্য কালোবাজারির সাথে জড়িত খাদ্য পাচারকারি এবং সে সময়ের বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলার আসামী বহুল আলোচিত সদর উপজেলা গেইটের মুজিবের সাথে সিন্ডিকেট তৈরী করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে চাল পাচার ও অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছে রাজিয়া সুলতানা ও কামরুল ইসলাম। এই সিন্ডিকেটের আরেক বড় হোতা শ্রীমন্ত পাল সাগর। এই চাল আড়তদার সাগরের সাথেও রাজিয়া-কামরুলের শক্ত সংযোগ। আবার মুজিব ও সাগরের যোগসাজস করে নিয়ন্ত্রণ করেন এই অবৈধ চাল পাচার। মূলত মুজিব ও সাগরের মাধ্যমে চাল পাচার ও অনিয়ম রাজিয়া-কামরুল সিন্ডিকেট। যাদের সাথে আরো রয়েছে খাদ্যগুদামের কয়েকজন কর্মকর্তা। এভাবে অবৈধভাবে পাচার করা বিপুল কয়েকদিন আগে লিংকরোডের বিসিকে অবস্থিত সাগরের মালিকানাধীন সাগর কোল্ড স্টোরে মজুদ করেছিলো। সেখান অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিলো ভ্রাম্যমান আদালত।

অন্যদিকে গতকাল শুক্রবার ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা সালাহ উদ্দীন ও পিয়নকে আটক করেছে র‌্যাব। এর আগে এর আগে গত ২০ অক্টোবর অভিযান চালিয়ে চাল নিয়ে জালিয়াতিকালে হাতেনাতে দুই শ্রমিক আটক ও সিলগালা করা হয়েছিলো ৫ নং গুদামটি। এসব জালিয়াতির প্রধান হিসাবে চিহ্নিত উপ-খাদ্য-পরিদর্শক কামরুল ইসলাম ওই দিনের অভিযানেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ওই ঘটনায় গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা দিতে না দিতেই আবার জালিয়াতি ধরা পড়লো সদর খাদ্য গুদামে।

এদিকে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনের তথ্য ও উপস্থিতিতে অভিযান ও আটকের পরও অভিযুক্ত খাদ্য কর্মকর্তা সালাহ এবং রাজিয়া সুলতানা ও কামরুল ইসলামের পক্ষে সাফাই গাচ্ছে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দেবদাস চাকমা। এই নিয়ে তিনি এক প্রকার র‌্যাবের বিরুদ্ধে বিষোদাগারও করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, শুক্রবার সদর খাদ্যগুদামে চাল নিয়ে কোনো অনিয়ম হয়নি। ভেজা হওয়ায় বস্তা খুলে চালগুলো শুকানো হচ্ছিল। ‘হাতে অস্ত্র আছে বলে র‌্যাব মনগড়াভাবে অভিযান চালিয়েছে’- সাংবাদিকদের কাছে এমনও দাবি করেন দেবদাস চাকমা।

এই প্রসঙ্গে অভিযানে নেতৃত্বদানকারী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘গায়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাবের একটি দল গুদামে অভিযান চালানো হয়। এসময় চাল নিয়ে জালিয়াতির বিষয়টি হাতেনাতে ধরা পড়ে। তাই গুদাম কর্মকর্তাসহ দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। গুদামটিও সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।’

গুদামটিতে ৫০ কেজির চালের জায়গায় ৩০ কেজির বস্তা মিলেছে। তাই সিলগালা করা হয়েছে। পরবর্তীতে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

বারবার অভিযানের পরও খাদ্যগুদামে অনিয়ম-দুর্নীতি কেন থামছে না? তা ভাবিয়ে তুলেছে কক্সবাজারবাসীকে। এতে বড় কর্তার হাত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জড়িত কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে াইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলেছে স্থানীয়রা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •