তাজুল ইসলাম পলাশ, চট্টগ্রাম:

নগরীর চাক্তাই খাল। জলাবদ্ধতা, অপরিস্কার, অপরিচ্ছন্নসহ বিভিন্ন বিষয় বার বার কথা উঠে এই খালটি নিয়ে। দেশে এখন ডেঙ্গু রোগের পরিস্থিতি ভয়াবহ। প্রতিদিন গড়ে চব্বিশ ঘন্টায় দেড় হাজারের মতো রোগী ভর্তি হচ্ছে। অবশ্য এই প্রভাব এখন আগের চাইতে কমেছে। নগরীর মাঝ দিয়ে বয়ে চলা চাক্তাই খাল এখন মশা উৎপাদনের কারখানা। বর্ষা মওসুমে যেখানে পরিচ্ছন্ন টলমলে পানি থাকার কথা থাকলেও সেখানে তা নেই। ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পানির রং হয়ে গেছে কালো আর ঘন। দুর্গন্ধও বটে। এতে ভাসছে পলিথিন, ময়লা-আবর্জনা। খালের কোনো কোনো অংশে জমে আছে মাটির স্তুপ। সেখানে পানির প্রবাহ কম। যেখানে উৎপাদন হচ্ছে মশা।

বহদ্দারহাট মোড় থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার এখন নগরবাসীর বোঝা দাঁড়িয়েছে। এক সময় শহরবাসীর কাছে এই খালটি প্রাণ হিসেবে বিবেচিত হতো। বছর বিশেক আগে এই খালে সারা বছরই পানি থাকতো। কিন্তু দখলদারদের দখলবাজি আর সংস্কারের অভাবে খালটি ক্রমেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

২০০৩ থেকে ২০০৪ সালের দিকে প্রয়াত সাবেক মেয়র আলহাজ্ব এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র থাকাকালীন সময়ে সাড়ে ৯ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত গভীরতা রেখে চাক্তাই খালের চার কিলোমিটার পাকা করে দেয়া হয়। এতে সমাধানের চেয়ে সমস্যাই বেশি হয়। কারণ তলা পাকা করার দুই তিন বছরের মধ্যে বালু, মাটি ও ময়লা আবর্জনা জমে খালটি আবার ভরাট হয়ে যায়। তারপর থেকে আর খনন করা হয়নি।

গত ২২ জুলাই চাক্তাই খালের বহদ্দারহাট সংলগ্ন অংশ প্রথম উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। প্রায় ৬০টি স্থাপনা উচ্ছেদ করে তিন কিলোমিটার জায়গা উদ্ধার করা হয়। নগরীর ১৩ খালে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী স্থাপনা উচ্ছেদে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় অভিযান শুরু করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃৃপক্ষ (সিডিএ)। তারপর ভারি বর্ষণে নগরীতে কয়েক দফায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে উচ্ছেদ কার্যক্রমে বিরতি পড়ে। এরপর থেকে খালের কিছু কিছু অংশে ময়লার স্তুপ তৈরী হয়। জমে থাকে ময়লার ভাগাড়। আর এইসব স্থানগুলোতে এডিশ মশা ডিম পাড়ে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকার ব্রিজ প্রান্তে ওয়াকওয়ে জুড়ে ঝুপড়ি ঘর তুলে সবজি বেচাকেনা হচ্ছে। গড়ে উঠেছে ছোট খাটো বাজার। সন্ধ্যার পর পড়ে থাকা অবশিষ্ট অংশগুলো ফিলা হয় খালে। ওয়াকওয়ের পাশেই বিশাল চুলায় চলছে রান্নাবান্নার কাজ। ওয়াকওয়ের ব্রেঞ্চগুলো এতটাই ময়লা যে সেখানে বসার অবস্থা নেই। এ ছাড়া খালের অবস্থা একেবারেই নাজুক। খনন করার পর স্বচ্ছ পানি থাকার কথা থাকলেও এখন সেখানে পানি নেই। আছে ময়লা আর ময়লা। প্রচন্ড দুর্গন্ধ বের হচ্ছে খালের ময়লা থেকে। ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হওয়ায় খাল থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। আর মশা, মাছি এবং পোকা মাকড়ের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিণত হয়েছে নগরীর চাক্তাই খাল।

পরিবেশ আন্দোলনের নেতা মোহাম্মদ বখতিয়ার জানান, এ বিষয়ে কর্পোরেশনকে আরো ভালো করে নজড় দেওয়া দরকার। দৈনিক মশার ঔষধ ছিটানো প্রয়োজন। তাছাড়া মানুষের মাঝেও সচেতনতা আসতে হবে।

চকবাজার বাঁদুরতলা এলাকার বাসিন্দা জালাল উদ্দিন মিজান বলেন, পানি কমে যাওয়ায় যে ময়লার স্তুপ তৈরী হয়েছে সেখানে মশা ডিম পাড়ে। চাক্তাই খাল এখন মশা প্রজননের অন্যতম স্থান।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শফিকুল মান্নান বলেন, নিয়মিত ঔষধ ছিটানো হচ্ছে। অন্য একটি প্রশ্নে তিনি বলেন, অপরিস্কার পানিতে মশা ডিম পারেনা। পরিস্কার পানিতে ডিম পারে। খালে পানি না থাকায় মাঝখানে ময়লার স্তুপ তৈরী হয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সিডিএ নতুন করে খাল কাটতেছে। তারাই ভালো জানবে।

সিডিএ সূত্রে জানা যায়, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সবার আগে আগ্রাবাদ-হালিশহর, বাকলিয়া-চান্দগাঁও ও মুরাদপুর-বহদ্দারহাট এলাকার প্রতি নজর দেয়া হচ্ছে। প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের অধীনে ৩৬টি খাল খনন ছাড়াও ৪৮টি গার্ডার ব্রিজ, ৬টি কালভার্ট, খালগুলোতে ৪২ সিল্ট ট্র্যাপ (বালি জমার স্থান), ৫ খালের মুখে টাইডাল রেগুলেটর, খালের উভয় পাশে থাকবে ১৫ ফুট চওড়া রোড এবং আর এস শিট অনুযায়ী খালের উভয় পাশের জায়গা উচ্ছেদের কথা থাকলেও প্রাথমিকভাবে আসন্ন বর্ষা মৌসুমের জন্য ১৬ খাল নিয়েই এগুচ্ছে সংস্থাটি। এদিকে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে সিডিএ’র মেগা প্রকল্পে ওভারলেপিং হওয়ার আশঙ্কায় নগরীর খাল খনন কিংবা অবৈধ দখল উচ্ছেদে কাজ করবে না তারা।

এদিকে শিঘ্রই খাল খননের কাজ শুরু হবে শুরু হবে বলে জানান জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক ( মেঘা প্রকল্প) লে: কর্ণেল শাহ আলী। তিনি বলেন, যেখানে পানির মুভমেন্ট আছে তার পাশে শুকনা জায়গায় এডিস মশা ডিম পাড়ে। জমে পানিতে ডিম পাড়ে ম্যালেরিয়া সংক্রমক মশা।

  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •