রামু প্রতিনিধি:
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উর্বর ভূমি রামুর ইতিহাসের সেই ভয়াল কালরাত্রি তথা রামুর সহিংসতার ৭ বছর পূরণ হতে যাচ্ছে আজ।
ফেসবুকে পবিত্র কোরআন অবমাননার একটি ছবিকে কেন্দ্র করে কিছু উগ্রবাদী ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠী সেদিন ২৯ অগাস্ট ২০১২ ইংরেজি রামুর বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে অগ্নিসংযোগ চালায়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের পাঁয়তারাই লিপ্ত হয়েছিল রামুর কক্সবাজারের কতিপয় বিপদগামী তরুণ ও যুবক, যাদের হাতিয়ার ছিল উগ্র ধর্মান্ধতা। সাত বছর পূর্ণ হতে চললেও আজও পর্যন্ত ধরা ছোঁয়ার বাইরে সেদিনের হামলার মাস্টার মাইন্ডরা।গ্রফতার তো দূরের কথা বিচারের কাঠগড়ায়ও দাড়ঁ করানো যায়নি কাউকে।

সেই ঘটনার পর বর্তমান সরকার তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে যায়।বন্ধুর মত হাত বাড়িয়ে দিয়ে সেই কাল রাতের ক্ষত সারাতে কাজ করে। মনোমুগ্ধকর ও অপরুপ সৌন্দর্যমন্ডিত নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর আলোকে সেনাবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে বিহারগুলো নবরূপে নির্মাণ করা হয়। সেদিন হামলার শিকার বৌদ্ধ সম্প্রদায় ও বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য সরকার ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, যার ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কিছুটা হলেও নিরাপদ অনুভব করেছিল। সময়ের অাবর্তনের সাথে সাথে রামুতে পূর্বের ন্যায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরে আসতে থাকে।বর্তমানে সবাই আগের মত সহবস্থান নিশ্চিত করলেও তাদের মাঝে সেই অজানা আতঙ্ক আজও পরিলক্ষিত হয়।
রামুর জমিনের সেই ন্যাক্কারজনক ঘটনার এখনো কোন সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত হয়নি।সেদিনের চিহ্নিত অনেক দূষ্কৃতিকারি মামলা থেকে সুকৌশলে রেহায় পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে,পুলিশের দায়েরকৃত মামলায় শত শত নিরীহ লোক হয়রানি স্বীকার হয়েছিল এবং অনেকে এখনো হচ্ছে। । বৌদ্ধ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের হাজার হাজার লোকের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে এই বর্বরোচিত জঘন্য হামলার সুষ্ঠু বিচার সম্পাদন না হওয়ায়।অজানা আতঙ্কে এখনো অনেক মানুষ ঘরছাড়া, অথচ অপরাধীরা নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে কালাতিপাত করছে।সবারই একটাই দাবী, সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমে আসল অপরাধীদেরকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণ সাপেক্ষে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা,যাতে কেউ ভবিষ্যতে এই রকম কাজ করতে দুঃসাহস প্রদর্শন না করে।

২০১২ সালের ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও টেকনাফের বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধপল্লীতে চালানো নারকীয় তান্ডবের বিপরীতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সেই সময়ে দায়েরকৃত ১৮ টি মামলার একটিরও বিচার কাজ এখনো শেষ হয়নি। হামলাকারীর একজনও এখনো শাস্তির সম্মুখীন হয়নি।পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়েরকৃত বিভিন্ন মামলায় ৯৯৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিলেও সবাই এখন জামিনে মুক্ত।আবার অনেকে সুকৌশলে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে নির্বিঘ্নে কালাতিপাত করছে।
সরকার ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার ও ঘরবাড়ি পুনঃনির্মাণ করে দিয়েছে। বৌদ্ধ নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, তাদের মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অনেকাংশেই ফিরে এসেছে,কিন্তু তারা সেরাতের মুহুর্তেই ঘটে যাওয়া তান্ডবলীলাকে কিছুতেই ভুলতে পারছেনা।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বৌদ্ধ মন্দির ও বসতিতে হামলার ঘটনায় সর্বমোট ১৯টি মামলা দায়ের করা হয় বলে জানান সম্প্রতি নিয়োগপ্রাপ্ত কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম। তিনি বলেন, বাদীর সম্মতিতে ১টি মামলা প্রত্যাহার করা হলেও ১৮টি মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের সাধারণ সম্পাদক রাজু বড়ুয়া জানান, রামু সহিংসতার সাত বছর পার করছি আমরা।এই ঘটনার সাত বছর পর রামুর পরিস্থিতি অনেকটা ভালো। তবে এ ধরণের ন্যাক্কারজনক ঘটনা যাতে আর কোথাও কখনো যেন না ঘটে, সেজন্য সকলকে সর্তক থাকার আহবান জানান। এই ঘটনার পর বৌদ্ধদের পাশে থেকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশসহ সরকার ও রামুবাসীর প্রতি ধন্যবাদ জানান তিনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঘটে যাওয়া পবিত্র কোরআন অবমাননার গুজব রটিয়ে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রামুর ১২ বৌদ্ধ বিহার ও ৩০টি বসতঘরে সেদিন কিছু বিপদগামী যুবক ও তরুণ হামলা চালিয়ে আগুন জ্বালিয়ে পুড়ে ফেলে। পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া ও টেকনাফের ৭টি বৌদ্ধ বিহার এবং ১১টি বসতঘর পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় এসব মন্দিরে থাকা হজারো বছরের বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থাপনা,পুরাকীর্তি ও ধর্মীয়গ্রন্থ।

ঘটনার পর দায়ের করা হয় ১৯টি মামলা। এর মধ্যে কেবল রামুতেই আটটি মামলায় ৪৫৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তবে রামু থানাধীন জনৈক সুধাংশু বড়ুয়ার দায়েরকৃত মামলাটি দুপক্ষের আপোষ মীমাংসার মাধ্যমে প্রত্যাহার করে নেন বাদী নিজেই।

কক্সবাজার বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, রামু সহিংসতার সেই তান্ডবলীলা রামুর আবহমানকাল থেকে চলে আসা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে যে কুঠারাঘাত করেছিল তা আজ অনেকাংশেই কমে এসেছে। তবে আগের অবস্থানে চলে আসা সময়সাপেক্ষ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরো বলেন, রামু সহিংসতার সাত বছরে ফিরে এসেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। রামুর বৌদ্ধরা পেয়েছে দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহার। কিন্তু রামুর ঘটনাপর দায়েরকৃত মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা সংশয়।

রাখাইন ও বৌদ্ধপল্লী এবং মন্দিরে হামলার ঘটনায় দায়েরাৃত ১৯ মামলার এজাহারে নাম-ঠিকানা উল্লেখিপূর্বক আসামী ছিল ৩৭৫ জন। রামু থানার আট মামলায় এজাহারে উল্লেখিত মোট আসামী সাত হাজার আটশ পঁচাত্তর জন।তবে উক্ত মামলাগুলোতে নাম, ঠিকানা উল্লেখ ১১১ জনের থাকলেও পুলিশ কেবল মাত্র গ্রেফতার করতে পেরেছিল ৭৪ জনকে। আর ১৩২ জনকে আটক করেছিল সন্দেহের বশবর্তী হয়ে।অনুরূপভাবে, উখিয়া থানার সাত মামলায় পাঁচ হাজার ছয়শ ছাব্বিশ আসামী থাকলেও গ্রেফতার ছিল ১১৬ জন এবংটেকনাফ থানার দুটি মামলায় ৬৫৩ আসামীর মধ্যে গ্রেফতার ছিল ৬৩ জন।

কক্সবাজার সদর মডেল থানায় দুই মামলায় এক হাজার ৩০ আসামি থাকলেও গ্রেফতার ছিল ৯৮ জন। গত সাত বছরে ধাপে ধাপে সবাই আজ জামিনে মুক্ত। আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার পর আদালতের নির্দেশক্রমে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেক্রমে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি জড়িতদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে সুপারিশ করেছিল কিন্তু ঘটনার পরিকল্পনাকারী গডফাদারদের কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকে আটক করে হয়রানির স্বীকার হয়ে অনেকে আজ সর্বশান্ত।তবে আসল অপরাীরা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
রামুর ইতিহাসে এই রকম ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যাতে আর কেউ নষ্ট করতে না পারে সেজন্য সবাইকে সজাগ থাকার পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক কাতারে আসতে হবে।তবেই যাবতীয় অন্যায় ও অবিচার বন্ধ করা যাবে।বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী লোকজন নানা ধর্মীয় আচার অুষ্ঠানের মাধ্যমে এ দিনটিকে স্মরণ করবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •