বিশেষ প্রতিবেদক : দু হাজার বার সালে অপশক্তির ছোঁয়ায় রামুর সম্প্রীতিতে যে ক্ষত লেগেছিল তা রামুর অদম্য অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে প্রভাবিত করতে পারেনি । হাজার বছরের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ রামুর সম্প্রীতি সারা বাংলাদেশেই শিক্ষনীয় ও অনুকরণীয়। ঐক্য ও শক্তির স্থান হচ্ছে রামু। রামুতে রয়েছে সৌহার্দ্যের অনন্য নজির।
রামু সহিংসতার সাত বছর উপলক্ষে “রামুই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ” শীর্ষক আলোচনায় আলোচকবৃন্দ রামুর অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে এভাবেই আলোকপাত করেন। রামু সমিতি কতৃক আয়োজিত জাতীয় প্রেসক্লাবে আজ (২৮ অক্টোবর) এক আলোচনাতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপচার্য প্রফেসর ডক্টর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

রামু সমিতির সিনিয়র সহ সভাপতি সাবেক সচিব মাফরুহা সুলতানার সভাপতিত্বে এই আলোচনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন বাংগালি জাতিসত্বার কবি নুরুল হুদা, রামু সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বাবু ফণীভূষণ শর্মা, গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক মহা ব্যবস্থাপক জান্নাতুল কাউনাইন, বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনীতিবিদ প্রশান্ত ভূষণ বড়ুয়া, বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দ প্রিয়, রামু সমিতির সহ সভাপতি সুজন শর্মা, রামু সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইমুল আলম চৌধুরী প্রমুখ।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ২৯শে অক্টোবর রামুর বৌদ্ধপল্লিতে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে যার ফলশ্রুতিতে রামুতে ক্ষণিকের অমানিশা নেমে এসেছিল।

প্রফেসর ডক্টর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলন, আত্নশুদ্ধি, আত্ন-সমালোচনা, আত্ননিয়ন্ত্রণ ও আত্নসংযমের মাধ্যমে আত্নবিশ্বাস জাগ্রত করে পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন অসাম্প্রদায়িক, পারস্পরিক সম্প্রীতি। রামুর শান্তিপ্রিয় মানুষের এই পারস্পরিক বন্ধনকে অক্ষুণ্ণ রেখে আগামিকে মোকাবিলা করতে হবে। রামু সমিতি জাতীয়ভাবে এই আলোচনার আয়োজন করে প্রমাণ করেছে রামু অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকেই প্রতিনিধিত্ব করে।

একুশে পদকপ্রাপ্ত বাংগালি জাতিসত্বার কবি নুরুল হুদা তাঁর আলোচনায় বলেন, দুহাজার বার সালের ক্ষতকে আমাদের ভুলে যেতেই হবে। কক্সবাজারের সাংস্কৃতিক চেতনাকে রামু লালন করেছে আপন মাহাত্ন দিয়ে। রামুর অসাম্প্রদায়িক চেতনাই বাস্তবতা, এখানে হিংসা-বিদ্বেষের কোন স্থান নেয়। তিনি রামুকে নিয়ে তাঁর স্বরচিত কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করে শুনান।

আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ প্রশান্ত ভূষণ বড়ুয়া তার বক্তব্যে তরুণ প্রজন্মকে রামুর সাংস্কৃতিক পরিবেশ ধরে রাখতে ও মানবিক সমাজ উপহার দিতে উদ্ভুত্ব হতে আহবান জানান। তিনি রামু সহিংসতার ক্ষত মুছে দিতে বর্তমান সরকারের প্রণিধানযোগ্য অবদানকে স্মরণ করেন।

বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দ প্রিয় রামুতে তাঁর শৈশব- কৈশোরের স্মৃতিচারণ করে রামুর অসাম্প্রদায়িক শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে স্মরণ করেন। রামু সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ফণীভূষণ শর্মা রামুর সাংস্কৃতিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধরে রাখার উপর গুরুত্বারুপ করেন। গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক মহা ব্যবস্থাপক জান্নাতুল কাউনাইন তাঁর বক্তব্যে রামু সহিংসতাকে ক্ষণিকের ক্ষত আক্ষায়িত করে এই ক্ষত থেকে শিক্ষা নিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

রামু সমিতির সহ-সভাপতি সুজন শর্মা তার বক্তব্যে বলেন, “আমরা রামু বলতে সেই রামুকেই চিনি যেখানে ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য না, যেখানে সংখ্যালঘু, সাম্প্রদায়িক আবহের কোন গুরুত্বই নেয়। তিনি আহবান জানান, হাজার বছরের রামুর অসাম্প্রদায়িক ইতিহাসই যেন হয় আগামী দিনের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার অনুপ্রেরণা”।

স্বাগত বক্তব্যে রামু সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইমুল আলম চৌধুরী রামু সমিতির পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

সমাপনি বক্তব্যে রামু সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি মাফরুহা সুলতানা বলেন, সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা চেতনাকে রামু অক্ষরে অক্ষরে লালন করে। এখানে সব ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয়। রামুর এই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে কোনভাবেই বিনষ্ট হতে দেওয়া যাবেনা।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রামু সমিতির সাংগাঠনিক সম্পাদক মোহিব্বুল মোক্তাদীর তানিম।

এতে রামু সমিতির কার্যকরী সদস্যবৃন্দ ছাড়াও ঢাকাস্থ রামু, কক্সবাজারবাসীরা উপস্থিত থাকবেন। রামু সমিতির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন আজিজুল ইসলাম, বিজন শর্মা, উজ্জ্বল বড়ুয়া, সাজেদুল আলম মুরাদ, মোহাম্মদ ইলিয়াস, নিউটন শর্মা, খোরশেদ আলম প্রমুখ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •