মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং ইউনিয়নের পূর্ব রত্নাপালং বড়ুয়া পাড়ায় প্রবীণ বড়ুয়া ও নিহত সখী বালা বড়ুয়ার পুত্র রোকন বড়ুয়া। সাদাসিধে চলতো। কোন ঝুট ঝামেলায় সহজে জড়াতে চাইতোনা। ঝগড়া বিবাদ সবসময় এড়িয়ে চলতো। নিম্মবিত্ত পরিবার। এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দাই বৌদ্ধ ধর্মালম্বী বড়ুয়া। পরিবারে রোকন বড়ুয়ারা ৪ ভাই। বড়ভাই রবিসন বড়ুয়ার উখিয়ার কোর্টবাজার স্টেশনে ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ রয়েছে। দ্বিতীয় ভাই দীপু বড়ুয়া উখিয়ার কোর্টবাজেরে কাপড়ের ব্যবসা করতো। দীপু বড়ুয়া গত প্রায় দেড় বছর ধরে চট্টগ্রাম শহরে থাকেন। তৃতীয় ভাই শিপু বড়ুয়ার একটি ফার্নিসারের দোকান রয়েছে। সর্বকনিষ্ঠ ভাই রোকন বড়ুয়া প্রায় ১০ বছর আগে ২০০৯ সালের শেষদিকে জীবিকা নির্বাহের জন্য কুয়েত যান। প্রায় ৫ মাস আগে রোকন বড়ুয়া কুয়েত থেকে দেশে এসে কিছুদিন থেকে গত ৩০ আগস্ট আবার কুয়েত চলে যায়। রবিসন বড়ুয়া ও শিপু বড়ুয়া ছোটভাই রোকন বড়ুয়ার বাড়ির পাশে আলাদা বাড়িতে থাকে। দীর্ঘদিন কুয়েতে জীবিকা নির্বাহ করে পাঠানো অর্থে রোকন বড়ুয়ার পরিবার ক্রমান্বয়ে খুবই স্বচ্ছল হয়ে উঠে। সম্ভবতঃ এই স্বচ্ছলতাই তার পরিবারের জন্য একটা ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ায়।

গত বুধবার ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে কুয়েত প্রবাসী রোকন বড়ুয়ার মা সুখী বালা বড়ুয়া (৬৫), সহধর্মিণী মিলা বড়ুয়া (২৫), পুত্র রবিন বড়ুয়া (৫) এবং ভাইজী সনী বড়ুয়া (৫) কে জবাই করে কে বা কারা পৈশাচিকভাবে হত্যা করে। এই জগন্য হত্যাকান্ডের খবর পেয়ে রোকন বড়ুয়া সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত থেকে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে কক্সবাজার পৌঁছে। তখন তার ৪ আপনজনের নিথর মৃতদেহ ছিলো কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে। বিমানবন্দর থেকে সেখানে সরাসরি এসে রোকন বড়ুয়া আপনজনদের প্রাণহীন নির্মম অবস্থা দেখে নির্বাক হয়ে যায়। সেখানে মুর্চা যাচ্ছিল বার বার। সেখান থেকে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা মৃতদেহ ৪ টি উখিয়ার পূর্ব রত্নাপালং শশাঙ্ক বৌদ্ধ বিহারে নেয়া হয়। সেখানে সকল সম্প্রদায়ের হাজার হাজার শোকাহত মানুষের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে। শোকের এক অভাবনীয় দৃশ্য। চোখে না দেখলে তা বিশ্বাস করা যাবেনা। কেউ মেনে নিতে পারছেন নিষ্পাপ দু’টি শিশু ও দুই সহজ সরল মহিলার জবাই করে বর্নণাতীত হত্যাকান্ড। সেখানে উখিয়া ও রামুর শতাধিক জ্যেষ্ঠ বৌদ্ধ ভিক্ষুর উপস্থিতিতে বৌদ্ধ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান অনুযায়ী দু’ঘন্টা ধরে মহাঅনিত্য সভা করা হয়। শুক্রবার ২৭ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৫ টার দিকে মধ্যরত্নাপালং খোন্দকার পাড়া বৌদ্ধ শ্মশানে হাজার হাজার মানুষের চোখের জলে বৌদ্ধ ধর্মীয় আচার অনুযায়ী সমাহিত করা হয় খুন হওয়া এই ৪ জনকে। চিরবিদায় জানানো হয় অবুঝ ও নিষ্পাপ ২ শিশু এবং ২ নিরপরাধ মহিলাকে।

সেখান থেকে রোকন বড়ুয়ার বড়ুয়া তার অভিশপ্ত বাড়িতে আসলে রোকন বড়ুয়া এসে ধারণামূলকভাবে বলেন, “আমার সাথে আমার স্ত্রী মিলা বড়ুয়ার বুধবার ২৫ সেপ্টেম্বর শেষ বিকেলে মোবাইলে কথা হয়েছে। সে কোর্টবাজারে শপিং এ ব্যস্ত আছে বলায় আমি বেশীক্ষন কথা বলিনি। মোবাইলে কোন ধরনের শংকার কথা আমার স্ত্রী আমাকে তখন বলেনি। ঘটনার রাতে হয়ত পরিচিত কোন লোক আগে থেকে বিকেলে সুকৌশলে বাড়িতে ঢুকে কোথাও লুকিয়ে ছিলো। পরে আমার মা সুখী বালা বড়ুয়া টর্চ নিয়ে বিভিন্ন রুমে গেলে, হয়ত লুকিয়ে থাকা লোকটিকে আমার মা চিনে ফেলে। তখন আমার মা’কে হয়ত লুকিয়ে থাকা ঐ লোক হত্যা করার চেষ্টা করার সময় আমার মা’র শোর চিৎকারে আমার সহধর্মিণী মিলা বড়ুয়া চলে আসে। তখন তাকেও চিনে ফেললে পর পর সবাইকে ঐ ঘাতক হত্যা করতে পারে। আমার মা’র লাশ যে রুমে পাওয়া গেছে সে রুমে আমার মা কখনো থাকেনি।” এমনটি ধারনা করেছেন-স্বজনহারা রোকন বড়ুয়া।

এরপর একইদিন সন্ধ্যায় পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরেশন এন্ড ক্রাইম) আবুল ফয়েজ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পরে রোকন বড়ুয়ার সাথে কথা বলেন। এসময় তাকে জড়িয়ে ধরে কান্না জড়িত হৃদয়বিদারক কণ্ঠে রোকন বড়ুয়া বলেন “আমি তো কারো ক্ষতি করিনি, যতটুকু পারি উপকার করতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার বেলায় এমন পৈশাচিক ঘটনা, কেন ঘটল আমি জানিনা। সবকিছু হারানোর বিনিময়ে আমার আদরের সন্তানটা যদি বেঁচে থাকতো!” এই কথা বলতে বলতে আবার অঝোর কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন রোকন বড়ুয়া। এডিশনাল ডিআইজি (অপরেশন এন্ড ক্রাইম) আবুল ফয়েজ নিজে রোকন বড়ুয়াকে শান্তনা দেওয়ার হাজার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। কারণ এমন নির্মম হত্যাকান্ডে স্বজনহারাকে শান্তনা দেওয়ার সব ভাষা যেন এ পরিবেশে হারিয়ে যায়। তখন এডিশনাল ডিআইজি আবুল ফয়েজ, কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন, উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নিহাদ আদনান তাইয়ান, উখিয়ার ওসি মোহাম্মদ আবুল মনসুর সহ সেখানে থাকা সকলেই দারুণ আবেগ প্রবণ হয়ে যান। এক পর্যায়ে এডিশনাল ডিআইজি আবুল ফয়েজ বলেন, এ ধরনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ আমার সুদীর্ঘ চাকুরী জীবনের ৩০ বছরেও দেখিনি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •