তদন্তের আওতায় পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তারাও

তাজুল ইসলাম পলাশ, চট্টগ্রাম ব্যুরো:

জাতীয় পরিচয় পত্র পাইয়ে দেওয়া ও রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অর্ন্তভুক্তি করাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিলেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সর্বশেষ গত ২৩ সেপ্টেম্বর উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের শরণার্থী তসলিমা আকতার বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়ে পাসপোর্ট করতে এসে ধরা পড়েন নগরীর পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসর্পোট অফিসের কর্মকর্তাদের কাছে। পাসর্পোর্ট আবেদন ফরমের সাথে তিনি ‘জন্ম সনদ’ এবং ‘জাতীয়তা সনদ’ সংযুক্ত করেন। এছাড়া জাতীয়তা সনদ দিয়েছেন বাঁশখালীর ৭নং সরল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব রশিদ আহমেদ চৌধুরী। যেখানে স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে, বাঁশখালীর কাহারঘোনা।

এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বর নগরীর মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসেও তিনজন রোহিঙ্গা ধরা পড়েন। এমন অভিযোগ পাওয়ার পর চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানা নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদিনসহ তিনজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন জেলা নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তারা। বাকি দুজন হলেন- জয়নালের বন্ধু বিজয় দাশ ও তার বোন সীমা দাশ ওরফে সুমাইয়া। রাতেই ডবলমুরিং থানা নির্বাচন কর্মকর্তা পল্লবী চাকমা বাদি হয়ে কোতোয়ালী থানায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় জয়নালকে তিনদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গত শনিবার জয়নাল আবেদিন আদালতে জবানবন্দি দেন। জয়নালের জবানবন্দিতে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর জেলা নির্বাচন অফিসের আরও তিনজন ডাটা এন্ট্রি অপারেটরকে গ্রেফতার করা হয়। এরা হলেন- মো.শাহীন (২৯), মো.জাহিদ হাসান (৩৩) এবং পাভেল বড়–য়া (২৮)।

মনসুরাবাদস্থ চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস এবং পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, এই দুই পাসপোর্ট অফিসে গত দুই বছরে (গত ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) পাসপোর্ট করতে এসে ধরা পড়েছেন ১৩০ জন রোহিঙ্গা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে ধরা পড়েছেন ৫৮ জন এবং পাঁচলাইশ আঞ্চলিক অফিসে ধরা পড়েছেন ৭২ জন। এসব রোহিঙ্গারা যেসব জন্ম সনদ ও নাগরিকত্ব সনদ দিয়েছেন সেগুলো ইস্যু করেছেন ৭৯ জন জনপ্রতিনিধি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর রয়েছেন ২৫ জন। বাকি সনদগুলো যারা ইস্যু করেন তাদের মধ্যে সাতকানিয়ার ১০ জন ইউপি চেয়ারম্যান ও একজন পৌর মেয়র রয়েছেন। এছাড়া বোয়ালখালী, রাউজান ও আনোয়ারার দুইজন করে চেয়ারম্যান, পটিয়ার সাতজন জনপ্রতিনিধি (চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলর), ফটিকছড়ির পৌর মেয়রসহ ছয়জন জনপ্রতিনিধি, বাঁশখালীর পাঁচজন চেয়ারম্যান, চন্দনাইশের ছয়জন চেয়ারম্যান, লোহাগাড়ার পাঁচজন চেয়ারম্যান রয়েছেন। এছাড়া সদ্বীপ, সীতাকুন্ড, হাটহাজারী, মিরসরাইয়ের একজন করে জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। এছাড়া কক্সবাজারের চারজন এবং বান্দরবানের দুইজন জনপ্রতিনিধি রয়েছেন।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলরদের ইস্যু করা জন্ম সনদ ও জাতীয়তা জনদ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা বলেন, তারা ইচ্ছেকৃত দিয়েছেন কী না খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি বলেন, “সরকারের পক্ষে নির্দেশনা আছে জন্ম সনদ ও জাতীয়তা সনদ দেয়ার ক্ষেত্রে যেন সর্তকতা অবলম্বন করা হয়। আমরা বিষয়টি কাউন্সিলরদের জানিয়ে দিয়েছি।

এদিকে গ্রেফতার হওয়া দুজন নির্বাচন অফিসের কর্মচারী একে অপরের সিন্ডিকেটে থাকা সদস্যদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করে দিচ্ছেন তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে। এর ফলে চট্টগ্রাম জেলা ও উপজেলা এবং ঢাকায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে কর্মরত অন্তত ৩০ জনকে নজরদারির আওতায় এনেছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। এই নজরদারির মধ্যে ইসির কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তাও আছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে গত সোমবার সকালে দুদক প্রধান কার্যালয় থেকে পুরো ঘটনাটি তদন্তের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটিও গঠন করেছেন। কমিটিতে চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ (সজেকা-২) এর উপ-পরিচালক মাহবুবুল আলমসহ দুই সদস্যকে টাস্কফোর্সে রাখা হবে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ এর উপ-পরিচালক মাহবুবুল আলম বলেন, গত ১৯ সেপ্টেম্বর দাখিল করা প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি তদন্ত হবে। তদন্তে আওতায় আসছে বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি, নির্বাচন কমিশনের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তারাও।

তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক রাজেস বড়–য়া বলেন, আমরা মূলত নির্বাচন অফিসের কারা কারা এর সঙ্গে জড়িত- সেসব বিষয়ে জানান চেষ্টা করছি। তবে গ্রেফতার হওয়া জয়নাল আবেদিন এবং মোস্তফা ফারুককে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক তথ্য আমরা পেয়েছি। তদন্তের স্বার্থে তথ্যগুলো আমরা প্রকাশ করতে পারব পারছিনা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, দুদক এনফোর্সমেন্ট টিমের প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধির নাম উঠে এসেছে। যাদের বেশিরভাগই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রোহিঙ্গা ভোটার জালিয়াতির ঘটনায় দুইজন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। তাছাড়া ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী পুরো ঘটনায় জড়িত। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট পাওয়ার পেছনে পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তারা জড়িত বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

চট্টগ্রাম দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানোয়ার হোসেন লাভলু বলেন, নির্বাচন অফিসের যেকোন কর্মকর্তা সরকারি অফিস আদালত ব্যবহার করে করলে সিডিউলভুক্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। বর্তমান রোহিঙ্গা ভোটার জালিয়াতির মামলাটিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইনের অংশটি পুলিশ তদন্ত করতে পারবে। এক্ষেত্রে দুদক আলাদাভাবে তদন্ত করে দুর্নীতি দমন আইনে আলাদা মামলা করতে পারবে।

এদিকে রোহিঙ্গা ডাকাত নুরু বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর তার একটি স্মার্ট কার্ড নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। একই সময়ে লাকী আকতার নামের এক রোহিঙ্গা নারীর ভোটার হওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে নির্বাচন কমিশন বিষয়টি তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের তদন্ত টিম প্রাথমিক পর্যায়ে পুরো বিষয়টি ধোঁয়াশায় রাখে। পুরো জালিয়াতির ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের কারা জড়িত তা চিহ্নিত করতেই বেশ কয়েকদিন সময় নষ্ট করে। দুদক গত ১৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসে অভিযান চালায়।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জরুরি এবং নিয়মিত এই দুই প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের এনআইডি সরবরাহ করা হত। জরুরি ভিত্তিতে সাতদিনের মধ্যে কেউ এনআইডি পেতে চাইলে সেটা পিডিএফ ফাইল করে মেইলে পাঠিয়ে দেওয়া হত। এটা নিতে কমপক্ষে লাখের ওপর টাকা লাগত। আর নিয়মিত এনআইডি কুরিয়ারে পাঠানো হত। সেটার দাম কমপক্ষে ৫০ হাজার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •