এম.জিয়াবুল হক, চকরিয়া:
মাতামুহুরী নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে প্রতিনিয়ত সংকোচিত হয়ে যাচ্ছে কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার ১নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল বারীপাড়া ও কাজিরপাড়াসহ আশপাশের অন্তত সাতটি গ্রাম। আটবছর আগে ২০১১ সালের স্বরণকালের ভয়াবহ বন্যার তা-বে নদীতে ভাঙ্গনের কবলে পড়ে আবদুল বারীপাড়া পয়েন্ট। সেই থেকে গত আটবছরে ওই গ্রামের অন্তত ৩৫ থেকে ৪০টি বসতঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পাশাপাশি উল্লেখিত সময়ে পাশের গ্রাম কাজিরপাড়া, উত্তর কাজিরপাড়া, তরছঘাট অংশের মন্ডলপাড়া, চরপাড়া, ছাবেতপাড়া, নুরবাপের পাড়া গ্রামের অন্তত শতাধিক পরিবার বাপ-দাদার ভিটেবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।

বিশেষ করে মাতামুহুরী নদীর মোহনা পয়েন্টে আবদুল বারীপাড়া গ্রামটি প্রতিবছর বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টিপাত পরবর্তী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তান্ডবে গেল আটবছরে ভাঙ্গনের কবলে পড়ে মানচিত্র থেকে মুছে যেতে বসেছে। সেই থেকে ওই এলাকার অধিক ঝুকিপুর্ণ পয়েন্টে টেকসই তীরসংরক্ষন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীর ভাঙ্গন তান্ডব থেকে রক্ষা করতে চকরিয়া পৌরসভার মেয়র কাউন্সিলর এবং স্থানীয় সচেতন মহল বারবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের দপ্তরে নানাভাবে তদবির করেছেন।

অবশ্য কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জনপ্রতিনিধি ও সচেতন জনগনের আবেদনের প্রেক্ষিতে গেল তিনবছরে ওই পয়েন্টে দুইদফায় বালুভর্তি বস্তা পেলে ও নদীতে স্পার বসিয়ে ভাঙ্গন ঠেকাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। কিন্তু প্রতিবার শুস্ক মৌসুমে এসব স্পার স্থির থাকলেও বর্ষাকালের শুরুতে নদীতে উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রবল ¯্রােতে তা আর রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থার কারণে নদীর ভাঙ্গনে আবদুল বারীপাড়া গ্রামের বসতঘর, আবাদি জমি ও একটি মসজিদ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

পাশাপাশি প্রতিবছর ভাঙ্গনের পরিধি বেড়ে চলার কারণে গত দুইবছর আগে মাতামুহুরী নদীর তীর লাগোয়া আট গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম কাজিরপাড়া-আবদুলবারী পাড়া-চরপাড়া সড়কটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সেই থেকে বন্ধ হয়ে গেছে আভ্যন্তরিণ সড়কের সবধরণের যানবাহন চলাচল। ফলে গত দুইবছর ধরে পৌরসভার ১নম্বর ওয়ার্ডের সাত গ্রামের অন্তত ১৫ হাজার মানুষকে চলাচলের ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এতে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন স্কুল-কলেজ মাদরাসা পড়–য়া হাজারো শিক্ষার্থী।

জনগনের দুর্ভোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন চকরিয়া পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক আলমগীর চৌধুরী। তিনি বলেন, মাতামুহুরী নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে প্রতিনিয়ত সংকোচিত হয়ে যাচ্ছে চকরিয়া পৌরসভার ১নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল বারীপাড়া ও কাজিরপাড়াসহ আশপাশের অন্তত সাতটি গ্রাম। বছরের পর বছর নদী ভাঙনে পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডেি নদীর তীর এলাকায় গৃহহীন হচ্ছে হাজারো পরিবার। বিশেষ করে চকরিয়া পৌরসভার অন্তত পাঁচটি পয়েন্টে জনবসতি আবাদি জমি বর্তমানে মাতামুহুরী নদীতে বিলীন হতে চলছে। এতে উদ্বেগ-আতঙ্ক বেড়েছে নদীর তীরবর্তী জনপদের মানুষের মাঝে।

মেয়র আলমগীর চৌধুরী বলেন, জনগনের দুর্ভোগ লাগবে এবং সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিতে চকরিয়া পৌরসভার ঝুকিপুর্ণ এসব পয়েন্টে অস্থায়ী প্রকল্পের বদলের স্থায়ী টেকসই তীরসংরক্ষন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবহিত করেছি। কয়েকটি স্থানে পানি উন্নয়ন টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও আবদুলবারী পাড়া ও কাজিরপাড়া পয়েন্টে বারবার অস্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ফলে দুইদফায় বালুভর্তি বস্তা পেলে ও নদীতে স্পার বসিয়েও আবদুলবারী পয়েন্টের ভাঙ্গন ঠেকাতে পারছেনা পানি উন্নয়ন বোর্ড।

এ অবস্থার কারণে ইতোমধ্যে নদীর ভাঙ্গনে আবদুল বারীপাড়া গ্রামের বসতঘর, আবাদি জমি ও একটি মসজিদ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদীতে একাকার হয়ে গেছে আট গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম কাজিরপাড়া-আবদুলবারী পাড়া-চরপাড়া সড়কটি। এতে বন্ধ হয়ে গেছে আভ্যন্তরিণ সড়কের সবধরণের যানবাহন চলাচল। ফলে গত দুইবছর ধরে চকরিয়া পৌরসভার ১নম্বর ওয়ার্ডের আট গ্রামের অন্তত ১৫ হাজার মানুষকে চলাচলের ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

চকরিয়া পৌরসভার মেয়র আরও বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড সহসা টেকসই তীরসংরক্ষন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বিলম্ব করায় জনগনের দুর্ভোগের বিষয়টি আমলে নিয়ে ইতোমধ্যে পৌরসভার তহবিলের উদ্যোগে মাতামুহুরী নদীর আবদুলবারী পয়েন্টে একটি কাঠের সেতু নির্মাণ করে দিয়েছি। যাতে করে স্থানীয় জনসাধারণ একটুখানি হলেও চলাচলের ক্ষেত্রে দুর্ভোগমুক্ত থাকতে পারে। তবে কাঠের সেতুটি স্থায়ী সমাধান নন, এখানে টেকসই তীরসংরক্ষন তথা সিসি ব্লক দ্বারা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। জনগনের জীবনের গতিধারা আগের অবস্থায় ফেরাতে টেকসই সড়ক তৈরী করতে হবে।

চকরিয়া পৌরসভার অর্থায়নে মাতামুহুরী নদীর আবদুলবারী পাড়া অংশে সদ্য নির্মিত কাঠের সেতুটি বুধবার বিকালে জনগনের চলাচলের জন্য উন্মুথ করে দেওয়া হয়েছে। ফিতা কেটে সেতুটির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পৌরসভার মেয়র আলমগীর চৌধুরী, সচিব মাস-উদ মোর্শেদ এবং স্থানীয় কাউন্সিল ও এলাকার সর্বস্তরের জনসাধারণ।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা চকরিয়া পৌরসভা যুবলীগের সহ-সভাপতি এম.নুরুস শফি, সহ-সম্পাদক মোজাম্মেল হক, আনোয়ার হোসেন বলেন, এই একটি কাঠের সেতুতে বদলে দিয়েছেন সাত গ্রামের ১৫ হাজার মানুষের জীবনের গতিধারা। নদী ভাঙ্গনে গ্রামের বসতির সঙ্গে সড়কটি বিলীন হয়ে গেলে চলাচলের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনসাধারণ গত দুইবছর ধরে চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। মেয়র আলমগীর চৌধুরীর বদন্যতায় কাঠের সেতুটি নির্মাণে একটুখানি হলেও জনসাধারণ দুর্ভোগমুক্ত হয়েছেন।

এদিকে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মাতামুহুরী নদীর ভাঙন প্রতিরোধে একাধিক টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট উধর্বতন দপ্তরে ইতিপূর্বে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। কিন্ত চাহিদা অনুযায়ী অর্থবরাদ্দের অভাবে চকরিয়া উপজেলা ও পৌরসভার বিভিন্ন পয়েন্টে নদী ভাঙনরোধে টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) চকরিয়া উপজেলার চিরিঙ্গা শাখা কর্মকর্তা (এসও) এসএম তারেক বিন সগীর বলেন, মাতামুহুরী নদীর ভাঙন প্রতিরোধে পাউবো ইতোমধ্যে অনেকগুলো প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করে অর্থবরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট উধর্বতন দপ্তরে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে পৌরসভার আবদুলবারী পাড়া অংশের ঝুকিপুর্ণ পয়েন্টকে অগ্রাধিকার দেওয়া হযেছে। আশাকারি চাহিদা মোতাবেক অর্থবরাদ্দ নিশ্চিত হলে আমরা টেকসই তীরসংরক্ষন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবো।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •