গল্প নয় সত্যি

‘রোহিঙ্গা হুমায়রা’

«: নজরুল ইসলাম বকসী :»

(প্রতিবেদনে উল্লখিত সবগুলো নামের ক্ষেত্রে ছদ্মনাম ও ছদ্মছবি ব্যবহৃত হয়েছে)

মহিলাটি সুযোগ পেলেই চিলেকোঠায় দাঁড়িয়ে চোখ মুছে। কখনো কখনো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদে। কারো পায়ের শব্দ পেলেই দ্রুত নিজের কাজে নিবিষ্ট হয়ে যায়। কাউকে বুঝতে দেয় না তার মনের দুঃখ হৃদয়ের আকুতি। সবার অলক্ষ্যে সে নিঃশব্দ অশ্রুপাত করে।

হালিমা খাতুন। বয়স ৬০ অথবা ৬৫ হবে। পর্যটন শহর কক্সবাজারের হোটেল মোটেল জোনের আধুনিক মানের সপ্তডিঙ্গা আবাসিক হোটেল এণ্ড রেস্টুরেন্টে মসলা বটার কাজ করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সে পেঁয়াজ, মরিচ, হলুদ, জ্বিরা, আদা, রসুন ইত্যাদি পিষে দেয়। হোটেলের রান্না ঘরের পাশে মশলা বটার একটি চিলেকোঠা রয়েছে। ওখানে বসে মহিলাটি মসলা বটার ফাঁকে ফাঁকে সবার অগোচরে কান্না করে। বিষয়টি আস্তে আস্তে রেস্টুরেন্টের বয়রা টের পেয়ে যায় এবং একপর্যায়ে তা হোটেল মালিকের কানে চলে যায়।
হোটেল মালিক আয়ুব তালুকদার অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি, তিনি মহিলাটিকে মায়ের মত সম্মান করেন। মাত্র মাস খানেক আগে তালুকদারের মা মারা গেছেন। তাই এই মহিলাটিকে তিনি খুব স্নেহ করেন। মহিলাটি সব সময় কান্না করে শুনে তিনি অবাক হলেন এবং কাছে ডেকে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে মহিলাটি জানায়— মূলতঃ তার বাড়ি বার্মা। সে কলাতলীর পাশেই একটি বস্তিতে থাকে। তার সাথে তার দুইটি নাবালক নাতি থাকে। নাতি দু’টির মা অর্থাৎ মহিলার একমাত্র মেয়ে হুমায়রা কক্সবাজার জেলা কারাগারে বন্দী জীবন যাপন করছে। তার ভাষায়— মিথ্যা ইয়াবা পাচার মামলায় তার মেয়েকে জেলে ঢুকিয়ে গডফাদাররা গা ঢাকা দিয়েছে।

বিষয়টি শুনে হোটেল মালিকের মনে দয়ার উদ্রেক হলো। তিনি বৃদ্ধা মহিলা এবং ছোট শিশুদের কথা চিন্তা করে মহিলার মেয়ে হুমায়রাকে কিভাবে মুক্ত করা যায় তা ভাবতে লাগলেন।
আইয়ুব তালুকদার এব্যাপারে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ করলেন। দুদিন পর আইনজীবী দেবাশীষ বড়ুয়া জানালেন, অল্প খরচে সহজ পদ্ধতিতে হুমায়রাকে মুক্ত করা যাবে কিন্তু সরকার তাকে পুশব্যাক করে মিয়ানমার পাঠিয়ে দেবে। আর যদি তাকে এদেশে রেখে দিতে হয়, তাহলে দশ হাজার টাকা খরচ হবে এবং এদেশের নাগরিকত্ব দেখিয়ে আইডি কার্ড বানিয়ে মামলা ফেইস করলে তাকে মুক্ত করা যাবে। হোটেল মলিক আইয়ুব বলেন, ঠিক আছে দশ হাজার টাকা খরচ হলেও তাকে মুক্ত করা দরকার। যেমন কথা তেমন কাজ— অল্পদিনের মধ্যেই আইডি কার্ড তৈরী হলো, ইউপি চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেট যোগাড় করা হলো এবং বাংলাদেশের পূর্ণ নাগরিকত্ব নিয়েই হুমায়রা কারা মুক্ত হয়ে তার মা ও সন্তানদের কাছে ফিরে এলো।

হুমায়রা দেখতে মোটামুটি সুন্দরী ও সুটামদেহী এক যুবতী। হঠাৎ কেউ দেখলে ভাবতেই পারবেনা যে, সে দুই সন্তানের জননী। অনেকটা অবিবাহিতা তরুণীর মতই তাকে দেখা যায়। যাই হোক, হোটেল মালিক মনে করলেন মেয়েটিকে কোন একটি কাজে লাগানো দরকার। বৃদ্ধা মহিলার মসলা বাটার সামান্য বেতনে এদের পরিবার চলবে না। তাই তিনি হুমায়রাকে হোটেলের ক্লিনার হিসাবে নিয়োগ দিলেন।

আরেক সমস্যা দেখা দিলো। নিয়োগের কয়েকদিন পরেই হুমায়রা এসে মালিককে বললো সে এই চাকুরী করবেনা। কারণ হোটেলের অধিকাংশ বর্ডার তাকে রুমে ডাকে এবং নানা ধরনের প্রস্তাব দেয়। কারো কারো আব্দার রক্ষা করলেও এসব তার আর ভাল লাগে না। এদিকে হোটেলের বয়রা মালিককে জানায় যে অতিরিক্ত টাকা রোজগারের জন্য মেয়েটা পাগল হয়ে উঠেছে এবং নানারকম অনৈতিক কাজ করছে। হোটেল মালিক এসব ব্যাপার নিয়ে মেয়েটির সাথে আলাপ করলে মেয়েটি সাফ জানিয়ে দেয় “এসব নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই বরং এই চাকুরী ছেড়ে দিয়ে আমি আমার পূর্বের পেশায় চলে যাবো।” হোটেল মালিক অবাক হয়ে বললেন— পূর্বের পেশা মানে ? হুমায়রা অকপটে বললো ইয়াবা ও মাদক পাচার কাজের মূল ব্যবসায়ীদের কাছে সে অত্যন্ত বিশ্বস্ত নারী বলে পরিচিত। তারা তাকে খুব ডাকাডাকি করছে। হোটেল মালিক রাগান্বিত হয়ে বললেন— না তা হবেনা। এসব কাজে তুমি আর যেতে পারবেনা। আমি তোমাকে ভাল মেয়ে মনে করে পকেটের টাকা খরচ করে কারামুক্ত করেছি। হুমায়রা বললো তাহলে আমাকে আমার স্বামীর কাছে চলে যেতে দিন। আইয়ুব সাহেব অবাক হয়ে বললেন— তোমার স্বামী ! সে কোথায় ? হুমায়রা বললো, সে আশেপাশেই আছে মাঝে মাঝে আসে। তার ৭/৮টা বউ আছে। রুটিন মেন্টেইন করে চলে। যেদিন আমার রুটিনে পড়ে সেদিন আমার কাছে আসে। আইয়ুব সাহেবের সবকিছু বিস্ময়কর মনে হচ্ছিল। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন (কৌতুহলী প্রশ্ন) তোমার স্বামী কি করে ? মেয়েটি অবলীলায় বলে— সে টাকা বানায়। শুনেতো আইয়ুব সাহেবের আৎকে ওঠার মত অবস্থা। অবাক ও আতঙ্কিত কণ্ঠে তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন— কিভাবে বানায় ? মেয়েটি বলে— ছোটখাটো একটি মেশিন আছে। যত টাকার নোট ঢুকিয়ে চাপ দেবে তত টাকার আরেকটি নোট বেরিয়ে আসবে। কি জানি কিভাবে হুবহু নতুন টাকা হয়ে যায়। সম্মোহিতের মত আইয়ুব সাহেব জিজ্ঞেস করেন— এসব টাকা কি তোমার বাসায়ও বানানো হয় ? হুমায়রা জানায়, যেদিন তার বাসায় তার স্বামী আসে সেদিন সাথে করে আরো ২/৩ জন লোক নিয়ে আসে এবং সবাই মিলে টাকা বানায়। কিন্তু খরচের জন্য হুমায়রাকে কোন টাকা পয়সা দেয়না। বরং দুর্ব্যবহার করে। তাই তাকে মাদক ব্যবসার সাথে থাকতে হয়।
মারাত্মক উদ্বিগ্ন আইয়ুব সাহেব বলেন, এখানে তোমাদের আর থাকার দরকার নেই। কাল থেকে মা-মেয়ে কেউ এখানে আসবেনা। ঠিকই পরদিন থেকে কেউ আর আসেনি। বস্তিতে খবর নিয়ে জানা গেলো তারা বস্তি ছেড়ে কোথায় যেন চলে গেছে।

দিন যাচ্ছে— হুমায়রাদের কথা হোটেলের সবাই প্রায় ভুলে গেছে, কেউ মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করে নাই।

দুই মাস পরের ঘটনা— পড়ন্ত বিকেলে রেস্টুরেন্টের কাউন্টারে বসে আছেন হোটেল মালিক আইয়ুব তালুকদার। হঠাৎ চোখে পড়লো রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থেমেছে অত্যন্ত বিলাসবহুল একটি পাজেরো জীপ। জীপ থেকে নেমে আসলেন ৫ জন লোক। সবাইকে আধুনিক পোশাক পরিহিত বড়লোক মনে হচ্ছিল। এদের একজন মহিলা ও চারজন পুরুষ। মহিলার চোখে বড় ফ্রেমের কালো চশমা, পরনে দামী শাড়ী। মহিলাটিকে আইয়ুব সাহেবের কেমন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছিলো। মহিলাটি বেসিনে হাত মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে বসলেন এবং সবাই মিলে দামি মেনুর খাবার খেলেন। যাওয়ার সময় মহিলা দুই টেবিল বয়কে ২০০ টাকা বকশিস দিলেন। কাউন্টারের পাশ দিয়ে যখন চলে যাচ্ছিলেন আইয়ুব সাহেব তখন ভাল ভাবে দেখে চিনে ফেললেন এবং অবাক হয়ে অস্ফুট উচ্চারণে বললেন— আরে, এ তো আমার সেই রোহিঙ্গা হুমায়রা !!

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সর্বশেষ সংবাদ

সাতকানিয়া উপজেলায় মোতালেব বেসরকারিভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত

সিপিপি শ্রেষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবক পুরষ্কার পেলেন মহেশখালী ভাইস চেয়ারম্যান মিনুয়ারা

পেকুয়ায় চালককে জবাই করে টমটম ছিনতাই

বিবর্তন’র প্রবারণা পূর্ণিমা সংখ্যা ২০১৯ এর মোড়ক উন্মোচন

চট্টগ্রামের কোতোয়ালিতে ৩০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ১

‘কেয়ার’ এর আয়োজনে পালিত হল আন্তর্জাতিক দূর্যোগ প্রশমন দিবস-২০১৯

ঘুমধুম ইউনিয়নে জাহাঙ্গীর বেসরকারিভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত

ফেনীতে ৬৩ লাখ টাকার ভারতীয় ট্যাবলেট জব্দ

ডুলাহাজারায় অবৈধ সার বিক্রয়ের মহোৎসব

অসাম্প্রদায়িক চেতনায় অদম্য গতিতে কক্সবাজার এগিয়ে যাচ্ছে : ডিসি কামাল হোসেন

কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের অভিযানে গ্রেফতার- ৬

আবরার স্মরণে কক্সবাজার সরকারি কলেজে শোক র‍্যালী ও মানববন্ধন

চকরিয়ায় আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় যানজট, ছিনতাই ও মাদকমুক্ত করার সিদ্ধান্ত

নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমে ভোট কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা: নিহত ২ (আপডেট)

ফোর মার্ডার : পুলক বড়ুয়াকে আইও নিয়োগ

পেকুয়ায় সাজাপ্রাপ্ত আসামী গ্রেপ্তার

সোনাইছড়িতে এ্যানিং মার্মা বেসরকারিভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত

নাইক্ষ্যংছড়ি সদরে আবছার বেসরকারিভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত

রামু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উর্বর ভূমি : কল্প জাহাজ ভাসা উৎসবে এমপি কমল

প্রেমিকের সাথে বিয়ে না দেয়ায় আলীকদমে তরুণীর আত্মহত্যা