আহমদ গিয়াস
গত নভেম্বর থেকে দুই দফা চেষ্টার পরও বাংলাদেশে অবস্থানকারী ১২ লাখ রোহিঙ্গার কাউকে নিজদেশে প্রত্যাবাসন করা যায়নি। এরই মাঝে মিয়ানমারে অবস্থানকারী ৬ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম গণহত্যা ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে গতকাল সোমবার জাতিসংঘের তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে। এ সতর্কতার ফলে শীঘ্রই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর কথা দূরে থাক, নতুন করে রোহিঙ্গা ঢলের আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে (আরাকান) কয়েকটি সেনাচৌকিতে হামলার অভিযোগে রোহিঙ্গাদের উপর নৃশংস দমনপীড়ন শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। এসময় প্রাণ বাঁচাতে ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে পাড়ি জমাতে থাকে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। বর্তমানে এই সংখ্যা বেড়ে দাড়িয়েছে ১১ লাখ ১৯ হাজারে। জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের উপর সেদেশের সেনাবাহিনীর এ নিপীড়নের ঘটনাকে ‘জাতিগত নির্মূলের জন্য গণহত্যার পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ হিসাবে আখ্যায়িত করে। এই ঘটনার অনুসন্ধানে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা একটি তদন্ত কমিশনও গঠন করে। জাতিসংঘের এই তদন্ত কমিশন সোমবার নতুন করে সতর্ক করে যে, মিয়ানমারে অবস্থানকারী ৬ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বর্তমানে চরম ‘গণহত্যা ঝুঁকি’র মুখে রয়েছে। আজ মঙ্গলবার জেনেভার সদর উপস্থাপনের জন্য তৈরি করা জাতিসংঘের এ তদন্ত সংস্থার চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা চালানোর মত পরিবেশ তৈরির কাজ অব্যাহত থাকায় রোহিঙ্গারা গণহত্যার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
জাতিসংঘের তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে সতর্কতার পর শীঘ্রই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়টি কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি নতুন করে রোহিঙ্গা ঢলের আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হলেও সেদেশের সেনাবাহিনী এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে। ফলে রোহিঙ্গাদের মাঝে নিজদেশে ফেরার প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হচ্ছে। এর পরিবর্তে তারা বাংলাদেশের পাসপোর্ট তৈরি করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া কক্সবাজার উপকূল থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাড়ি দেয়ারও চেষ্টা করছে রোহিঙ্গারা।
মিয়ানমারে সর্বশেষ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসিত হয়েছিল ১৪ বছরের বেশি সময় আগে ২০০৫ সালের ২৮ জুলাই। সেসময় ১৫ হাজার রোহিঙ্গা ছাড়া বাকী প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়। উপরন্তু গত ২ বছরে নতুন করে বাংলাদেশে আসে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। কিন্তু এখনও এদের কাউকেই ফেরত পাঠানো যায়নি। মিয়ানমারের সাথে দ্বি-পাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বার বার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ভেস্তে যাচ্ছে। গত ২২ আগস্ট ও গতবছরের ১৫ নভেম্বর দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোন রোহিঙ্গাকে রাজি করানো সম্ভব না হওয়ায় তা ব্যর্থ হয়। এরই মাঝে গত ২৫ আগস্ট উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে লাখো মানুষের সমাবেশের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা নিজদেশে ফিরে যাওয়ার শর্ত হিসাবে ৫ দফা দাবি দাওয়া দেয়। মিয়ানমার থেকে নতুন করে আসা রোহিঙ্গা ঢলের দুই বছর পূর্তি পালন উপলক্ষে সমাবেশটির আয়োজন করা হয়েছিল।
রোহিঙ্গাদের ৫টি দাবির মধ্যে রয়েছে; মিয়ানমারে যাওয়ার আগে তাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দেয়া, তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, উচ্ছেদকৃত বাড়িভিটে ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ফিরিয়ে দেয়া, জাতিসংঘের তত্ত¡াবধানে রাখাইনে রাখা ইত্যাদি। এমনই পরিস্থিতিতে শীঘ্রই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আশার আলো দেখছেন না কক্সবাজারবাসী।
এবিষয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ও উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, জাতিসংঘের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শীঘ্রই শুরু হবে এমন আশা করা যায় না। শুধু তাই নয়, নতুন করে রোহিঙ্গা ঢল তৈরির একটি ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিতও বটে।
কক্সবাজার চেম্বার সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন- ভূ-রাজনীতির অপচক্রে পড়ে রোহিঙ্গা সমস্যা দিনদিন প্রকট হয়ে ওঠছে। বিচক্ষনতার সাথে পরিস্থিতির মোকাবেলা করা না গেলে সমস্যার আশু সমাধান আশা করা যাবে না।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •