সিবিএন ডেস্ক:

পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা আসামের খসড়া নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়া ৪১ লাখ মানুষের বড় একটি অংশ চূড়ান্ত তালিকা (এনআরসি) থেকেও বাদ পড়বেন। তাদের বেশির ভাগই বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী। ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের ঘোষিত নীতি অনুযায়ী বাদ পড়া এসব মানুষদের ভারত থেকে বিতাড়ন করা হবে। এসব মানুষকে অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে বিজেপি নেতারা বলছেন তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তবে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা এসব মানুষ বাংলাদেশে পাঠানো সহজ হবে বলে মনে করেন না বিশ্লেষকরা। ফলে তাদের ভারতের অভ্যন্তরেই আটক রাখতে হবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম টাইম অনলাইন জানিয়েছে, এনআরসি প্রকাশ সামনে রেখে আসামে দশটি ডিটেনশন সেন্টার (আটক কেন্দ্র) নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।.

ছয় বছরের প্রচেষ্টার পর উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের এনআরসি প্রকাশ করতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার। তবে এই তালিকাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। সর্বশেষ প্রকাশিত খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়ে প্রায় ৪১ লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে যায়। এদের বেশিরভাগই দরিদ্র, অশিক্ষিত এবং সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের সদস্য।

পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা শনিবার চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হলে বহু পরিবার বিচ্ছিন্ন আর অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। এমনকি অনেকেই বাংলাদেশের দিকে ছুটবে। তাদের মধ্যে হয়তো অনেকেই কখনোই বাংলাদেশে পা রাখেনি। মানবাধিকার গ্রুপগুলোর আশঙ্কা এই তালিকা রোহিঙ্গা সংকটের মতো আরেকটি সমস্যার তৈরি করতে পারে। মিয়ানমারের নাগরিকত্ব বঞ্চিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ২০১৭ সালে নিপীড়নের শিকার হলে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে বাধ্য হয় সাড়ে সাত লাখেরও বেশি মানুষ।

আবার অনেকের আশঙ্কা এই তালিকা একটি বিরক্তিকর প্রবণতা তৈরি করবে। এরইমধ্যে আসামকে পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে ভারতের অন্য অংশ থেকে ‘অনুপ্রবেশকারী’দের বের করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মে মাসে বিজেপি পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বলেছেন, ‘পুরো দেশেই এনআরসি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতিটি অনুপ্রবেশকারীকে তাড়িয়ে দেব’।

ভারত সরকার কেন এনআরসি চায়?

ভারতে আগেও এই তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পেছনে আংশিকভাবে ভূমিকা রেখেছে আসামের স্থানীয় ইতিহাস। সেখানে দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাভাষী অভিবাসীদের স্রোতে বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে নৃতাত্ত্বিক অসমীয়া জনগোষ্ঠী। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলে প্রথমবার এই স্রোত শুরু হয়, দ্বিতীয়বার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগে আর এখনও বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যটিতে অনেকেই প্রবেশ করে থাকে।

২০১৩ সালে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এনআরসি হালনাগাদ করার রুল দেয়। ১৯৫১ সালে প্রথম এই তালিকা করা হলেও তা এতদিন ব্যবহার করা হয়নি।

তবে পরের বছর ক্ষমতায় আসা বিজেপি এই ইস্যু লুফে নেয়। কারণ এটি তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের জন্য সঙ্গে মিলে যায়। বিজেপি বলতে শুরু করে ভারতের হিন্দুরা মুসলমানদের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক সময় অবৈধ অভিবাসীদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তার বক্তব্যকে মুসলমানদের জন্য সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। অথচ দেশটির জনগোষ্ঠীর ১৪ শতাংশই মুসলমান।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক মিনাক্ষি গাঙ্গুলি বলেন, ‘বিজেপি নেতারা বলে থাকেন মুসলমানদের সন্তান বেশি আর তারা ভারতের জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে দিচ্ছে। এই ধরণের ভাষা খুবই উদ্বেগজনক’। তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে খানিকটা ট্রাম্পের মতো করেই কথা বলে বিজেপি।

আসামের সবাই কেন ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে পারছে না?

অ্যাকটিভিস্টরা বলছেন নাগরিকত্বের প্রমাণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অন্যায্যভাবে বাসিন্দাদের ওপর প্রমাণ দেওয়ার বোঝা চাপিয়েছে। এক্ষেত্রে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে রাজ্যে বসবাসের প্রমাণ দিতে হচ্ছে। (১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।) যেসব পরিবার সতর্ক হয়ে রেকর্ড রাখেনি, যারা নিপীড়নের শিকার হয়েছে অথবা যারা ভারতের জটিল আমলাতন্ত্রের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি তারা জটিলতায় পড়েছে।

তবে সব কাগজপত্র পাওয়ার পরও কোনও কোনও পরিবার বাধার মুখে পড়ছে। ২০১৮ সালে মার্কিন সংবাদমাধ্যম টাইম ম্যাগাজিনের খবরে এক মুসলিম পরিবারের কথা বলা হয়। ওই পরিবার ৮০ বছরের পুরনো নথি দেখানোর পরও এনআরসি’র খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়ে। শনিবার প্রকাশিত খসড়া তালিকায় তাদের নাম না আসলে তাদের জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া হবে ডিটেনশন সেন্টারে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কর্মকর্তা মিনাক্ষি গাঙ্গুলি বলেন, ‘আমরা সরকারকে এই প্রক্রিয়া যেন নির্বিচার ও বৈষম্যমূলক না হয় তা নিশ্চিত করার অনুরোধ করেছি’। কিন্তু কেবলমাত্র পুরো তালিকা প্রকাশের পরই এর প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট হবে। সর্বশেষ খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ৪১ লাখ মানুষ যদি এবারের তালিকা থেকে বাদ পড়ে তাহলে মানবিক সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা করছে মানবাধিকার গ্রুপটি। মিনাক্ষি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের মতো আবারও একটি সংকট তৈরি হতে পারে বলে খুবই উদ্বেগে আছি। এখানেও সবকিছুর নেপথ্যে একই ধরণের মুসলমান বিরোধী (মিয়ানমারের মতো) মনোভাব কাজ করছে’।

পরিবার বিচ্ছিন্ন হবে?

এরই মধ্যে অনেক পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ২০১১ সালে শহিদা বিবি নামে এক সদ্য মা হওয়া নারীকে বিদেশি ঘোষণা করে একটি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল। নবজাতক দুই জমজ সন্তানসহ পাঠিয়ে দেওয়া হয় ডিটেনশন সেন্টারে। সেখানে দুই সপ্তাহের মধ্যেই শ্বাসযন্ত্রের অসুস্থায় মারা যায় তার এক সন্তান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রল.ইনকে ওই নারী বলেন, ‘অদ্ভূত শব্দ করলো আর আমি যখন তাকে কোলে তুলে নিলাম সে তখনই মারা গেল’।

স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে শহিদা বিবি আরও দশ মাস কারাগারে কাটানোর পর আরেক আদালতের রায়ে মুক্তি মেলে তার। পরের রায়ে রায়ে তাকে ভারতীয় নাগরিক ঘোষণা করে বলা হয় তাকে প্রথমে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো ঠিক হয়নি।

ভারত কি সত্যি সত্যি লাখ লাখ মানুষকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে পারবে?

আসামের পরিস্থিতিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে বর্ণনা করে আসছে বাংলাদেশ। আর এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়া বেশিরভাগ মানুষই বাংলাদেশ বা অন্য কোনও দেশের নাগরিকত্ব ধারণ করে না। ফলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী এসব মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রহীন করে ফেলা ভারতের জন্য অবৈধ বিবেচিত হবে।

ফলে ভারত সম্ভবত এসব মানুষকে নিজেদের এলাকায় স্থাপিত ডিটেনশন সেন্টারে পাঠাবে। আসামে নতুন করে নির্মিত হচ্ছে দশটি এধরণের ডিটেনশন ক্যাম্প। আর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ সামনে রেখে রাজ্য জুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য।

মিনাক্ষি গাঙ্গুলি বলেন, ‘১৯৭০-এর দশক থেকেও যদি কোনও মুসলমান এখানে বসবাস করে থাকে তাহলেও তারা তিন প্রজন্ম। সুতরাং এসব মানুষ কোথায় যাবে তা কিভাবে নির্ধারিত হবে?’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •