কক্সবাজারের সাংবাদিকতার যতকথা : পর্ব-ঊনিশ

আজাদ মনসুর ॥

পাঠক, দীর্ঘকাল পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণের ফলে নব্বইয়ের দশকে অনেক গণমাধ্যমের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সেই উন্মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশই এ দেশে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার অবস্থান তৈরি করে দেয়। এ ছাড়া প্রযুক্তির যে ছোঁয়া আমাদের গণমাধ্যমে লেগেছে, সেটির সূত্রপাতও নব্বইয়ে। কম্পিউটারের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় এবং রিপোর্টিং থেকে শুরু করে মতামত বিশ্লেষণ, সাংবাদিকতার বিষয়বস্তুর পরিবর্তনও এ সময় লক্ষ করা যায়। এসব কারণে একে একে সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে দেখা গেছে।

একটি সমিক্ষায় দেখা গেছে, আশির দশকেও সংবাদপত্রের পরিসর খুব ছোট ছিল। আট, বড়জোর ১২ পাতার পত্রিকা প্রকাশিত হতো। এই দশকে কাগজের পরিসর বাড়ল, সেই সঙ্গে কনটেন্ট। অনেকটাই উন্মুক্ত পরিবেশে বুদ্ধিজীবী বা ফ্রিল্যান্স রাইটার, যাঁরা নিজেরা কোনো বিষয়বস্তু নিয়ে লিখতে পছন্দ করেন, ব্যাপকভাবে তাঁরা খবরের কাগজে লিখতে শুরু করলেন। নানা ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী, সুধীসমাজের অনেকেও সংবাদপত্রে লেখালেখিতে আগ্রহী হলেন। ফলে সাংবাদিকতা বহুমাত্রিকতা পেল। কক্সবাজারের সাংবাদিকতার যতকথা’র আজকের ঊনিশ পর্ব।

নব্বইয়ের দশকে গণমাধ্যমের পরিসর বাড়ার আরেকটি বড় কারণ শিল্পায়ন। এই সময়েই আমাদের দেশে শিল্পায়নের প্রসার ঘটে। এতে ধীরে ধীরে বিজ্ঞাপন বাজার বাড়তে লাগল। প্রাইভেট সেক্টরের বিজ্ঞাপন আগের চেয়ে বেশি আসায় এই শিল্পে মানি জেনারেট করতে লাগল। ফলে কাগজের মান বাড়ল। সময়ের দাবিতে প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে এখন পত্রিকাগুলো অনলাইন ভার্সন করছে। অনেক কাগজের আলাদা অনলাইন বিভাগ আছে। পত্রিকাগুলো তাদের খবর ফেসবুকে শেয়ার করে। মুহূর্তেই খবরটি কোটি পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়, তাদের মতামত আসে। সেসবে শিক্ষণীয় কিছুও থাকে।

আলোকচিত্রের প্রতি গুরুত্বদান এখনকার পত্রিকাগুলোর আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। চীনে প্রবাদ আছে, এক হাজার শব্দের চেয়েও একটি ছবি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। একসময় আলোকচিত্রীদের সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হতো না। রিপোর্টারের হ্যান্ডস হিসেবে তাঁরা কাজ করতেন। এখন তাঁরা সাংবাদপত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। আলোকচিত্রীদের ছবি বাছাই ও কাগজে ভালো ছবি প্রকাশের জন্য ফটো এডিটর পদ হয়েছে এখন। কোন পত্রিকায় কি কি পদ তাদের কাজ ও কোন গ্রেডে বেতন/ভাতাদি পায় এ নিয়ে আলোচনা করবো কয়েক পর্বে।

নানাভাবে সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রশিল্পের বিকাশ হওয়ায় এই পেশারও উন্নতি হয়েছে। এখন সাংবাদিকরা অফিস থেকে গাড়ি পান। আগে এটি কল্পনাও করা যেত না। যদি জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত কিছু সংবাদপত্র, টিভি, রেডিওসহ অনলাইন মাধ্যম এ ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকে। আগে দিনেরবেলায় রাজনীতি বা অন্য কোনো কাজ সেরে রাতে তাঁরা কাগজ অফিসে কাজ করতেন। এখন এটি পেশাদার হয়েছে। প্রধান দৈনিকগুলো ওয়েজ বোর্ড দিচ্ছে। তবে সব পত্রিকায় ওয়েজ বোর্ড দেয় না। ওয়েজ বোর্ড নিয়ে লিখে পর্বগুলো আরও প্রসিদ্ধ করবার ইচ্ছা আছে। ওয়েজ বোর্ড না মানার একমাত্র কারণ হিসেবে যদি বলি সাংবাদিকদের বিভক্তিই দায়ী। ঐক্যবদ্ধ না হওয়ায় সাংবাদিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। ফলে তাঁদের সমস্যাগুলোকে মালিকপক্ষ ও সরকার ভালোভাবে গ্রহণ করে না।

এই সময়ের সাংবাদিকতার আরেকটি প্রধান দুর্বলতা করপোরেট মার্কেটিং, বিজ্ঞাপনদাতা, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে সাংবাদিকতা বন্দি হয়ে যাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিজ্ঞাপনের স্বার্থে লেখা যায় না। মার্কেটিংয়ে এই আধিপত্য নব্বইয়ের পর শুরু হয়েছে। সাংবাদিকদের মালিকপক্ষের চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তার পরও টেলিভিশন, রেডিও বা অনলাইনের সঙ্গে তুলনা করলে এখনো সংবাদপত্রেই কিছুটা সাংবাদিকতা হয়। কোনো পত্রিকায় হয়তো ২০ শতাংশ, কোনোটিতে ৪০ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন বাজার যেভাবে টিভিকে গ্রাস করেছে, তাতে সংবাদপত্রই আমাদের ভরসাস্থল। টিভি খুললেই বিজ্ঞাপন। এই বিজ্ঞাপন নির্ভর টিভিগুলো যে হারে কর্পোরেট ব্যবসায় মেতে উঠেছে জানিনা তারা কোন চর্চায় হ্াঁটছে। বিজ্ঞাপন দিক কিন্তু ৩০ মিনিটের খবরে যদি ১৫ মিনিট বিজ্ঞাপন থাকে তাহলে যারা টিভি দেখছেন তারা তো মুখ ফিরাবেন। বিজ্ঞাপন নীতি থাকলেও এটি তেমন চর্চা করে কিনা আমার জানা নেই। কোন প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞাপনের জন্য গেলে বিজ্ঞাপন দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ওই প্রতিষ্ঠান নিয়ে লেগেই থাকে সাংবাদিক নামধারি ওইসব হলুদ সাংবাদিকরা। সংবাদ নয় কিন্তু সংবাদ নামে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে ওইসব ভিত্তিহীন সংবাদটি।

পাঠক, মানুষ আর আগের মত নেই। সাধারণ মানুষদের মধ্যে চরম পরিবর্তন এসেছে। কারণ বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির কারণে মানুষ এখন আর টিভি, রেডিও কিংবা প্রিন্ট মিডিয়া নির্ভর নয়। এখন তারাও সাংবাদিকতা করে। তাহলে তারা কিভাবে সাংবাদিকতা করে এটাও এখন দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বতস্ফূর্ত ও স্বপ্রণোদিত হয়ে গণমানুষের খবর ও তথ্য সংগ্রহ, পরিবেশন, বিশ্লেষণ এবং প্রচারে অংশগ্রহণ করাই হচ্ছে জন সাংবাদিকতা বা সিটিজেন জার্নালিজম।

এ জাতীয় সাংবাদিকতায় প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি, পরিচয় এবং প্রশিক্ষণ ছাড়াই আধুনিক প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে সাধারণ জনগণ নিজেরা বা অন্যের সহায়তায় তথ্যের আদান প্রদান করে থাকে। জন-সাংবাদিকতার ধারণায় মূল ধারার গণমাধ্যমে যারা পাঠক, দর্শক ও শ্রোতা হিসেবে বিবেচিত হন তারাই মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরস্পরের তথ্য-উপাত্ত আদান প্রদান করে থাকেন।

বিজ্ঞাপন নির্ভর বাণিজ্যিক মডেলে পরিচালিত মূল ধারার গণমাধ্যমের একাংশের আধেয় তৈরি ও প্রচারের নানা মাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব মুক্ত জন-সাংবাদিকতা আজ সাধারণ মানুষের কাছে প্রকৃত মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত। ক্ষেত্রবিশেষে মালিক পক্ষের স্বার্থ, বগুজাতিক কোস্পানিসহ বিভিন্ন বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান এবং সংবাদমূল্য ও এজেন্ডা সেটিং এর মতো প্রচলিত ধারার গেটকিপারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা পালনের সুযোগ অপেক্ষাকৃত কম থাকায়, জন-সাংবাদিকতার মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে গণমানুষের স্বার্থে কাজ করার অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। চলবে…

লেখকঃ আজাদ মনসুর (এম.এ, এলএল.বি) শেষবর্ষ

আইটি স্পেশালিষ্ট, প্রণেতা-কক্সবাজার সাংবাদিক কোষ, সভাপতি-কক্সবাজার সাংবাদিক সংসদ (সিএসএস)

 

সর্বশেষ সংবাদ

উখিয়া মাদক কারবারির বাড়ির মাল ক্রোক

আদালতে এনজিও কর্মী খুনের দায় স্বীকার করেছে ঘাতক আলাউদ্দিন

টাইগারদের জয়ের বন্দরে পৌছে দিল সাকিব

নাইক্ষ্যংছড়ি পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাময়ী এলাকা -অতিরিক্ত সচিব মোঃ আতিকুল হক

দুই মামলায় জি কে শামীম ১০ দিনের রিমান্ডে

চট্টগ্রামে তিন ক্লাবে র‌্যাবের অভিযান, দুটিতে মিলেছে জুয়ার সরঞ্জাম

দুর্নীতিগ্রস্ত আওয়ামী লীগ নেতারা দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে

মরহুম রশীদ আহমদের ৩১ তম মৃত্যু বার্ষিকী রবিবার

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা ‘আই লাভ ইউ’: যুবলীগ চেয়ারম্যান

প্রশিক্ষণ পেশার উৎকর্ষতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে : এসপি মাসুদ

রামুর অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ফারুকের জানাযা সম্পন্ন 

চট্টগ্রামে ৪ হাজার ইয়াবাসহ আটক ১

এনজিওকর্মী মাজহার খুনের ঘটনায় মামলা, স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর

‘পৃথিবীতে ইসলাম ছাড়া কোনো ধর্ম থাকা উচিত নয়’

পদুয়ার মাদক কারবারী কাইছার গ্রেফতার

মগনামার চেয়ারম্যান ওয়াসিমকে বিএনপি থেকে বহিস্কার

হুফফাজুল কুরআন সংস্থার জাতীয় কাউন্সিল সম্পন্ন

হাটহাজারীতে অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার

বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনাকারী এখনো তৎপর – ধর্ম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী

চকরিয়ায় মা’কে মেরে দাত ফেলে দিল ছেলে!