শ্রীধর দত্ত

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বহু প্রাচীনকাল থেকে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল নদীপথ। একসময় আমাদের দেশে গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু ছিল। কথায় আছে আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। কথাটা রূপকথা নয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখায় লিখেছিলেন ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা। এ দেশে এক সময় নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড়, পুকুর-ডোবা থেকে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে শহরে অনেক নদী নালা হারিয়ে গেছে। বর্তমানে বড় বড় নদী গুলোর দুই পাড় ভূমিদস্যুদের দখলে তাঁর নাব্যতা হারিয়েছে এবং ছোট নদী ও খালে পরিণত হয়েছে। গ্রামগঞ্জের নদীগুলোও একই পরিস্থিতির শিকার হয়ে সরু নদীতে পরিণত হয়েছে। আমার মনে পড়ে তখন আমি ছোট ছিলাম সত্তর দশকের শেষের দিকে আমরা নদী পথে চলাচল করতাম এবং খালে-বিলে, নদী-নালায়, দিঘীতে, পুকুর- ডোবাই প্রচুর পরিমাণ মিঠা পানির মাছ পাওয়া যেতো। আমাদের সময় পুকুরে জাল দিতো কিন্তু সেচ মেশিন দিয়ে সম্পূর্ণ পানি নিষ্কাশন করা হতো না। এখন আর সেই জৌলুস নেই। এখন নদী পথে চলাচল নেই বললেই চলে।

তথ্য সূত্র মতে দেশে ২৬০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ আছে এর মধ্যে ৬৪টি প্রজাতি এখন প্রায় বিলুপ্ত, ২৮ প্রজাতির মাছ চরম বিপন্ন এবং ১৪ প্রজাতির মাছ সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। বর্তমানে বড় মাছের মধ্যে রুই, কাতলা, পাঙ্গাশ, বোয়াল, মৃগেল, আইড়, চিতল, শোল, গজার, বাঘাইর মাছগুলো দেশী জাতের চাষ হচ্ছে। বিদেশ থেকে আসা জাতগুলোর মধ্যে আছে সিলভারকার্প, গোল্ডকাপর্, মিররকার্প, গ্লাসকার্প, বিগহেড, নাইলোটিকা, থাই কৈ, ভিয়েতনামী কৈ, তেলাপুয়ে, ব্লাককার্প, কমনকার্প জাতের মাছগুলো বদ্ধ জলাশয়ে অল্পসময়ে অধিক উৎপাদনের জন্য কৃত্রিম ও রাসায়নিক খাদ্য দিয়ে চাষ করছে। তবে মিঠা পানির মাছ সরপুঁটি, কৈ, গুজি, বাইন, পুঁটি, গোলসা, বউ, চেলা, বেলে, পাবদা, শিং, মাগুর, বেদামাছ, ট্যাংরা, খোকশা, কালাবাটা, ঢেলা, মওয়া, লটা, শোল, বাইন, চান্দা, তিলপুঁটি, ফলই, কালবাউশ, গুইজা, কৈয়া পাতি, একঠোটা ঘাউরা ইত্যাদি মাছের অনেক জাত এখন আর নেই। তবে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে পুকুর-ডোবায় এখন সেচ মেশিন দিয়ে তলা পর্যন্ত পরিষ্কার করে মাছের পোনা পর্যন্ত নষ্ট করে ফেলতেছি। বর্ষা মৌসুমে যেটুকু মাছ বেঁচে থাকে তাও আবার ভাসা জাল (কারেন্ট জাল) দিয়ে ধরে ফেলছে। এই সময় মিঠা পানির মাছের প্রজননের মৌসুম ও তখন নদ নদীতে ছোট ছোট পোনা মাছ বেশি থাকে ফলে জেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে সাধারন জনগনও ছোট ছিদ্র ওয়ালা কারেন্ট জাল দিয়ে এই ছোট পোনা মাছ ধরে ফেলে। অথচ এই বর্ষা মৌসুমেই তাদের ডিম পাড়া ও বংশবিস্তারের সময়। ছোট পোনা মাছ গুলো বড় হওয়ার সুযোগ পেলে দেশের মিঠা পানির মাছের চাহিদা অনেকাংশে লাগব হতো ও মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতো। বর্ষা মৌসুমে আপনি গ্রামে গেলে দেখতে পাবেন কারেন্ট জালের ছড়াছড়ি। সব ঘরে কম বেশি কারেন্ট জাল রয়েছে। অথচ আমাদের অসচেতনতা ও লালসার কারণে আমরা দিন দিন মিঠা পানির মাছগুলো হারাচ্ছি। আগে মাছ ছিল সুস্বাদু বর্তমানে কৃত্রিম খাদ্যের কারণে মাছের স্বাদ হারিয়ে গেছে। বর্তমান যেটুকু মিঠা পানির মাছ রয়েছে তা রক্ষার জন্য ভাসা জাল বিক্রি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের নদ-নদী, হাওড়-বাওড়, খাল, বিল, পুকুর ও মুক্ত জলাশয়ে বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য ও আষাঢ় এই তিন মাস মিঠা পানির মাছ ধরা বিরত থাকা উচিৎ। এ ব্যাপারে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সাধারণ জনগণকে উপলব্ধি করতে হবে আজ আমরা মাছের প্রজন্ম ধ্বংস করে ফেলছি আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কি খেয়ে বেঁচে থাকবে। পূর্বে আমরা যে মাছগুলো খেয়েছি বর্তমান প্রজন্ম সে মাছগুলো পায়নি। বর্তমান যে মাছগুলো আছে ভবিষ্যত প্রজন্ম সে মাছগুলো পাবে কিনা সন্দেহ। জনগণের সচেতনতা ও সরকারের সুষ্ঠু পদক্ষেপই পারে মিঠা পানির মাছের বংশকে রক্ষা করতে।

আমাদের জীবনে মৎস্য প্রীতি যে জড়িয়ে রয়েছে তা না বললে নয়। মাছ নিয়ে আছে প্রবাদ-প্রবচন ও বাগধারা। কথাগুলো হলো- ‘রাঘব বোয়াল’, ‘গভীর জলের মাছ’, ‘মাছের মা’, ‘মাছের তেলে মাছ ভাজা’, ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’, ‘ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না’ ও ‘মাছের মায়ের পুত্রশোক’ ইত্যাদি। বাঙালি সংস্কৃতির বিয়েবাড়িতে কিংবা গায়ে হলুদে রুই মাছ সাজিয়ে পাঠানো মঙ্গলের প্রতীক। আরো ও প্রকাশ পায়- আলপনায়, শাড়ির পাড়ে, আঁচলে, কানের দুলে, গলায় হারের নকশায় অথবা লকেটে ইত্যাদি।

বাংলা সাহিত্যে মাছ, মাছ ধরা ও জেলেদের জীবন কাহিনী নিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, সমরেশ বসু, হরিশঙ্কর জলদাসের লেখায় ফুটে উঠেছে।

কবি ঈশ্বর গুপ্ত লিখেছেন,
‘ভাত-মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙ্গালি সকল
ধানে ভরা ভূমি তাই মাছ ভরা জল।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন,
‘খেঁদুবাবুর এঁধো পুকুর, মাছ উঠেছে ভেসে
পদ্মমণি চচ্চড়িতে লঙ্কা দিল ঠেসে।’
এছাড়া মাছ নিয়ে নানা ছড়া, কবিতা ও গল্প রচিত হয়েছে। ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, বিজয় গুপ্ত, দ্বিজবংশীদাস মাছ নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছেন। বাঙালির সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হলো মাছ। মাছ আমাদের জীবন, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সাথে অতোপ্রতভাবে জড়িয়ে আছে। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাছের বংশ সংরক্ষণ করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •