cbn  

মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজার শহরের হলিডে মোড় থেকে পূর্বদিকে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল পর্যন্ত পুরাতন প্রধান সড়কটির মালিকানা কার? কি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের, কি সড়ক ও জনপদ বিভাগের, নাকি কক্সবাজার পৌরসভার। কেউ এটির আপাতত মালিকানা স্বীকার করতে রাজী হয়নি। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো সড়কটির কর্তৃত্ব কার সেটা স্বীকার না করায় তার চরম মাশুল দিতে হচ্ছে- কক্সবাজারের শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের।

শহরের হলিডে মোড় থেকে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল পর্যন্ত যাতায়াতে নাগরিকদের প্রতিদিন হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রধান সড়কের বন বিভাগের মোড় (ঘুন গাছতলী) থেকে পূর্বদিকে সিটি কলেজের গেইট পর্যন্ত পুরাতন প্রধান সড়কের অবস্থা খুবই শোচনীয়। প্রতিদিন অহরহ গাড়ি, টমটম (ই-বাইক), রিক্সা, সিএনজি অটোরিকশা দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে ও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আহত হচ্ছে অনেক যাত্রী। প্রধান সড়কটি যেন আর রাস্তা নেই, একটা বড় ড্রেন বললে কম বলা হবে। একজন রসিক প্রবীণ গণমাধ্যম কর্মী বলেছেন, ‘এ সড়ক দিয়ে কোন সন্তান সম্ভাবা গর্ভবতী মহিলা গেলে রাস্তার খানা খন্দকে পড়ে রিকসা কিংবা গাড়ির ঝাঁকুনিতে সন্তান প্রসব করার সম্ভাবনা খুব বেশী। যা মাতৃসদনের অর্থাৎ মা ও শিশু কল্যান কেন্দ্রের কাজ করবে’।

এ সড়কটি সংস্কারের ব্যাপারে কোন বিভাগ বা সংস্থা এ বিষয়ে কোন উদ্যোগ না নেয়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগের অন্ত নেই। অনেকে প্রধান সড়ক দিয়ে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সারতে যেতেও একটু ক্ষতি হলেও অনীহা প্রকাশ করছে। অথচ প্রধান সড়কটি উন্নয়ন ও সংস্কারের ব্যাপারে প্রতিদিন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি হচ্ছে হরদম। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যেন সড়কের এই করুণ অবস্থা আর লেখালেখি কিছুই দেখছেন না। উপলব্ধি করছেননা, মানুষের সীমাহীন কষ্ট আর রিকসা ও অন্যান্য যান চলাচলের করুণ অবস্থা। গত মঙ্গলবার ৩০ জুলাই বিকেলে কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত আনন্দ সমাবেশে বিশিষ্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব কামাল হোসেন চৌধুরী প্রধান সড়ক সংস্কারের জন্য ২৪ ঘন্টা সময় দিয়ে বলেছিলেন, এর মধ্যে সংস্কার কাজ শুরু নাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তিনি ‘জুতা পিটা’ দেবেন। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানের দেয়া এ আল্টিমেটামের সময় পার হয়ে গেলেও কোন কাজ হয়নি।

সংস্কার কাজ শুরু হওয়াতো দুরের কথা, খবর নিয়ে জানা গেছে, এবিষয়ে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কেউ কোন উদ্যোগই নেননি। বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব কামাল হোসেন চৌধুরীদের হুকারে হানাদার বাহিনী পালালেও প্রকৃত জনস্বার্থে প্রদত্ত এই হুংকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলদের কারো কানে যায়নি। ফলে কক্সবাজার শহরের জনগণ এ বিষয়ে আরো বেশী হতাশ হয়ে পড়েছে। একই সমাবেশে কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব জাফর আলমও তাঁর বক্তব্যে প্রধান সড়কের উল্লেখিত অংশের এ করুণ দশা নিয়ে চরম উষ্মা প্রকাশ করেন।

এদিকে, প্রধান সড়কের বনবিভাগের মোড় (ঘুন গাছতলী) হতে পূর্বদিকে কক্সবাজার সিটি কলেজের গেইট পর্যন্ত রাস্তাটি সংস্কারের ব্যাপারে কক্সবাজার সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা’র কাছে জানতে চাইলে তিনি সিবিএন-কে বলেন, প্রায় ৫ মাস আগে সড়কটি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) কে স্টাম্প করে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এখানে সড়ক ও জনপদ বিভাগের আর কোন দায় দায়িত্ব নেই। কউক সড়কটি নান্দনিকভাবে নির্মাণের জন্য প্রাক্কলন তৈরী করেছে, যা ইতিমধ্যে একনেকে পাশ হয়েছে। তাছাড়া বিধিসম্মত ভাবে সড়ক ও জনপদ বিভাগ এ সড়কটি সংস্কারের কোন এখতিয়ার নেই এবং সে বিষয়ে সরকারের কোন ফান্ডও বরাদ্দ নেই। তারপরও কউকের অনুরোধে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে অন্য জায়গা থেকে ফান্ড ডাইভার্ট করে প্রধান সড়কের টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের সামনে ও আলিরজাহাল পয়েন্টে ব্রিক সলিং করা হয়েছে। যে সংস্কারের পদ্ধতিগত ভাবে বৈধতা নিয়ে যে কোন সময় প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু এ সড়ক সংস্কার নিয়ে কিছুই নাজেনে, অনেকে যখন সড়ক ও জনপদ বিভাগেকে তুলোধুনো করেন, তখন কেন ঝুঁকি নিয়ে, বিধি লংঙ্গন করে আমরা সড়কটির সংস্কার কাজ করতে যাবো। এ সড়ক তো এখন আনুষ্ঠানিকভাবে কউক’কে দিয়ে দেয়া হয়েছে, সুতরাং অযথা ঝুঁকি নিয়ে আর কত কাজ করবো।

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) এর চেয়ারম্যান লেঃ কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমেদ পবিত্র হজ্জ পালনের জন্য সৌদিআরব থাকায় এবিষয়ে কউকের সদস্য প্রকৌশল লেঃ কর্নেল আনোয়ারুল ইসলামের কাছ থেকে জানতে চাইলে তিনি সিবিএন-কে বলেন, আমরা শুধু সড়কটি প্রসস্থ ও উন্নয়ন করবো। যে প্রকল্পটি একনেকে ইতিমধ্যে পাশ হয়েছে, সেটি সরকারি বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে কাজ শুরু হতে আরো ৪/৫ মাস সময় লাগবে। উন্নয়ন আর প্রশস্তকরণের কাজ শেষ হলে আমরা সড়কটি আবার সড়ক ও জনপদ বিভাগের কাছে দিয়ে দেবো। তাছাড়া সড়কটি রক্ষণাবেক্ষণ করার কোন লোকবল ও ফান্ড আমাদের নেই। তাই কউকের উন্নয়ন কাজ শুরু নাহওয়া পর্যন্ত সড়কটি সংস্কার করার জন্য কক্সবাজার সড়ক ও জনপদ বিভাগকে আমরা আগেই অনুরোধ করেছিলাম। আশা করছি, কউকের অনুরোধ সড়ক ও জনপদ বিভাগ রক্ষা করে জনসাধারণের ভোগান্তি লাগব করবেন বলে লেঃ কর্নেল আনোয়ার হোসেন সিবিএন-কে বলেছেন।

এ বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ নুরুল আলমের কাছে জনাতে চাইলে তিনি সিবিএন-কে বলেন, এ সড়কটি কক্সবাজার পৌরসভার নয়। তারপরও মেয়র মুজিবুর রহমান জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে গত মঙ্গলবার ৩০ জুলাই রাত্রে রুমালিয়ার ছরা টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের সামনে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ইট বালি দিয়ে কিছুটা সংস্কার কাজ করে দিয়েছেন। নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ নুরুল আলম বলেন, এটা বিধি সম্মত নয়।

মেয়র তো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, জনস্বার্থে কক্সবাজার পৌরসভার উদ্যোগে সড়কটি সংস্কার করে দেয়া যায়না, এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ নুরুল আলম সিবিএন-কে বলেন, কক্সবাজার পৌরসভার নিজস্ব রাস্তা ও গলি গুলো পুরোপুরি সংস্কার ও মেরামত করতে পারছি না, সেখানে কক্সবাজার পৌরসভার পক্ষে প্রধান সড়কের সংস্কার কাজ করা কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়।

এবিষয়ে কক্সবাজার জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন সিবিএন-কে বলেন-বিগত জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় ক্ষত বিক্ষত প্রধান সড়কটি সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, আশা করি জনস্বার্থে সড়ক ও জনপদ বিভাগ দ্রুত এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবেন।

কিন্তু রাষ্ট্রের ৩ টি বিভাগের সড়কটির মালিকানা নিয়ে আর কতো রশি টানাটানি হবে? কক্সবাজার প্রধান সড়কটি যেন বেওয়ারিশ লাশ। আর কতো মানুষ কষ্ট পেলে, আহত হলে, গাড়ী নষ্ট হলে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের বোধোদয় হবে, এটাই এখন ভুক্তভোগী জনগণের প্রশ্ন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •