cbn  

আজাদ মনসুর
প্রিয় পাঠক, সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে মানুষ আচার, সংষ্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, মানবিক মূল্যবোধ, চিন্তা, নন্দন চর্চা, সৃষ্টিশীলতার বিকাশ ঘটেছে এটা নিশ্চিত। তবে মানবকূলের পারিবারিক পরমপরায় খুব কমই মানবিক মূল্যবোধের চর্চা হচ্ছে। যদি বলি, সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্পণ সংবাদপত্র। কারণ, দর্পণে যেমন কোনো বস্তুর প্রকৃত রূপ ফুটে উঠে-তেমনি সমকালীন বিশ্ব চরাচরের চলমান গতি-প্রকৃতি, ঘটনাপ্রবাহ, জীবনচিত্র ও দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় সংবাদপত্রে। সামাজিক ও রাষ্ট্রিক উন্নয়ন-অগ্রগতি, সত্য-সুন্দর এবং ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠায় সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম। এ জন্যই ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গ্যালারিতে উপস্থিত সংবাদ প্রতিনিধিদের লক্ষ করে রাষ্ট্র কাঠামোতে সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা বোঝাতে এডমন্ড বার্ক সংবাদপত্রকে ‘ফোর্থ স্টেট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সুতরাং প্রত্যেক কিছুরই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। যেটি আমরা নিউটনের তৃতীয় সূত্রে পেয়েছি। যদি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাঁধাগ্রস্ত করে বিপরীত একটি প্রক্রিয়াকে স্থান করে দিই তাহলে সংগত কারণেই এর প্রভাব পড়বেই। যার ফলে আমাদের উচিত স্বাভাবিক গতি ও প্রক্রিয়ায় যাতে কোন বৈরি পরিবেশের আছড় না লাগে সেদিকে লক্ষ্য রাখা। সংবাদপত্রের জন্ম গণতন্ত্রহীন সমাজে। তখন সংবাদপত্রের দায়িত্ব ছিল সমাজকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত করা। মানুষের আশা-চিন্তাকে তুলে ধরা। মানবিক চেতনা জাগ্রত করা। তবে যুগের হাওয়ায় পাশ্চাত্যসহ বিশ্বের নানা দেশে কম-বেশি গণতন্ত্র আজ প্রতিষ্ঠিত হলেও, অনেক দেশেই গণতন্ত্র আজও অধরা। আবার কোথাও কোথাও ছদ্ম-গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এখনও লড়ছে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকরা। এটাও কম কিসের?
সাংবাদিকতা হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও মানবিক চেতনা বিকাশের কেন্দ্র এবং নীতি-নৈতিকতা, দায়-দায়িত্ব ও বুদ্ধি-বিবেকের আধার। তাই সৃজনশীল গণমাধ্যম ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে সংবাদপত্র অগ্রগণ্য। তবে সবচে’ ঝুঁকিপূর্ণ এবং সাহসী, সংবেদনশীল ও নির্মোহ, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ, সত্যনিষ্ঠ ও গণসম্পৃক্ত সার্বক্ষণিক পেশা সাংবাদিকতা। সভ্যতার বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম। সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে বৈশ্বিক অগ্রগতির হাত ধরে। শিক্ষা ও সভ্যতার অগ্রগতিতে সংবাদপত্র আজ অপরিহার্য অঙ্গ। আসলে, সংবাদপত্র হচ্ছে বিশ্বে জনমত গঠনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। সংবাদপত্রে জনগণের আশা-চিন্তা, চাহিদা, অভাব-অভিযোগ উঠে আসে। তাই সংবাদপত্রকে বলা হয়, News paper is the people parliament always sessions. তার মানে বুঝতেই পাচ্ছেন, গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের মর্যাদা কোথায়? কক্সবাজারের সাংবাদিকতার যতকথা’র আজ পনের পর্ব।
কিন্তু আজ আমরা সব ভুলে গেছি বা এই কথাগুলো চর্চা করার মত যোগ্যতা গণমাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্টদের কারও কারও থাকলেও আবার সিংহভাগ সাংবাদিকদের নেই বললেই চলে। যারা পরিচ্ছন্ন সাংবাদিকতা করেন তারাও কিভাবে পরিচ্ছন্ন সাংবাদিকতার বিস্তার ঘটে সেদিকে নজর দেন না। যদি থাকতো তাহলে সাংবাদিকদের নিয়ে কেন এত নেগেটিভ আলোচনা? কেন আমরা আমাদের মান-মর্যাদায় বুলেটের মত আঘাত করছি? কেন দেশের যে কোন নির্বাচনে কারো না কারো পক্ষ নিয়ে ভাড়াটে সাংবাদিকতা চর্চায় মেতে উঠছি?
এই চর্চা আজ শুধু কক্সবাজারে সীমাবদ্ধ নেই এ মাথা ব্যথা আজ পুরো দেশের। তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে বাংলাদেশ আজ ৩৪ টিভি মিডিয়ার সাথে যুক্ত। ৩৪ টিভি মিডিয়া মানে বিশাল অধ্যায়। শুধুমাত্র ইলেকট্রনিক্স এই মিডিয়ার সাথে কোন না কোন ভাবে যুক্ত রয়েছে আনুমানিক ৫,০০০ হাজার জন জনবল। আর প্রতিনিধিত্বশীল ও পেশাদারিত্ব আছে এমন দৈনিক সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল আর সরকারি-বেসরকারী রেডিও মিলে আরও আনুমানিক ১০,০০০ হাজার জনবল। সারা দেশে পেশাদার ও গ্রহণযোগ্যতার দিক দিয়ে এবং পরিচ্ছন্ন প্রতিনিধিত্বশীল স্থানীয় সংবাদপত্রে নিয়োজিত আনুমানিক ৫,০০০ হাজার জন জনবল। এখন যদি বলি এই ২০০০০ হাজার জনবলের মধ্যে একাডেমিক যোগ্যতা ও আরও অন্যান্য যোগ্যতার দিক দিয়ে বিচার করলে পুরো দেশে ২০,০০০ হাজারের বেশি প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিক পাওয়া দুষ্কর হবে।
আমি যদি ভুল না করি তাহলে বলতে পারি দেশের যে সকল প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক্স, অনলাইন ও রেডিও এর মত গণমাধ্যম রয়েছে উক্ত গণমাধ্যমে নিয়োজিত সর্বোচ্চ পদবীধারি ব্যক্তি হিসেবে পুরো দেশে ২০০০০ এর মত জনবল। আর এই সংখ্যার মধ্য থেকে ১০০ জন ব্যক্তিই চাইলে প্রায় ১৭ কোটি মানুষদের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা। কারণ কোন না কোন ভাবে এই ১০০ জন ব্যক্তির কাছে আমরা ২০০০০ হাজার জন জনবল নিয়োজিত।
আমার কেমন জানি মনে হয়, যারা কক্সবাজার হয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে সাংবাদিকতার প্রতিনিধিত্ব করছেন। বিশেষ করে যখন থেকে রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ হয়েছে কক্সবাজারে। এই কয়েক বছরের মূল্যায়নে কক্সবাজারের কারেন্ট বা তাৎক্ষনিক যে সংবাদগুলো হয় এই সংবাদ ব্যতিত কক্সবাজারকে সারা বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে কয়জনে কয়টি রিপোর্ট করেছেন? আর আপনাদের সাংবাদিতার মাধ্যমে তৃণমূলের সাধারণ মানুষরা কি সুবিধা পাচ্ছেন? জেলার বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষদের হরেক সমস্যা অন্ত নেই। এই খোঁজগুলো নিয়ে কেউ কি মানবিক কারণে হলেও একটি সংবাদ আপনার টিভি বা সংবাদপত্রে ছাপিয়েছেন। আবার অনেকে করার চেষ্টা করলেও ডেস্ক পর্যায়ে তেমন মূল্যায়ন না করার কারণে সংবাদটি অনইয়ার হয়না বা সংবাদটি ছাপানো হয় না। কারণ সেখানেও তারা টাকা নামক কাগজের ঘ্রাণ খোঁজে। এই হচ্ছে আমাদের সাংবাদিকতা। একদিন এখান থেকে বের হতে হবে। এভাবে আর চলেনা। প্লিস কেউ না কেউ উদ্যোগি হোন আমার প্রয়োজনে। আগামীর প্রয়োজনে।
আবার একচেটিয়ে কথা বলার মধ্যেও মজা নেই। কিছু বাধ্যবাধকতা তো থেকেই যায়। তাহলে কিভাবে? চাইলে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ, গোছানো ও মার্জিত সাংবাদিকতা চর্চা করার মত পরিবেশ তৈরি করে দেয়া বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট ও জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটই একমাত্র ভরসা করার মত প্রতিষ্ঠান। তাদের বিভিন্ন গবেষণার মধ্যে এ বিষয়গুলোর স্থান থাকা উচিত। যেমন : কোনো কোনো পত্রিকা অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য ছাড়া রিপোর্ট প্রকাশ করেছে মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে তার তালিকা করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সেই পত্রিকার রিপোর্টার ও সম্পাদকের বক্তব্যও জানা দরকার। সম্পাদককে এজন্য পত্রিকায় ভুল স্বীকার করা উচিত। কোনো কোনো টিভি চ্যানেল অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রতিবাদপত্র প্রচার করেনি তাদেরও মাসিক বা ত্রৈমাসিক তালিকা হওয়া উচিত। তাহলে দর্শক ও পাঠকরা জানতে পারবেন কোন কোন পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল সাংবাদিকতার নৈতিকতা অনুসরণ করেন না। কারা অসাধু সাংবাদিকতা ও হলুদ সাংবাদিকতায় মেতে উঠছেন। চলবে…
লেখকঃ আজাদ মনসুর (এম.এ, এলএল.বি) শেষবর্ষ
আইটি স্পেশালিষ্ট, প্রণেতা-কক্সবাজার সাংবাদিক কোষ, সভাপতি-কক্সবাজার সাংবাদিক সংসদ (সিএসএস)
azadcox90@gmail.com ০১৮৪৫-৬৯ ৫৯ ১৬

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •