সিবিএন ডেস্ক:
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের ছাড়াই ‘একলা চলোনীতি’তে চলছে দলটি। নিজেদের রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক কোনও কর্মকাণ্ডেই শরিককে ডাকছে না তারা। বিএনপির এই ‘একলা চলোনীতি’ নিয়ে শরিক দলগুলো দুই মেরুতে অবস্থান করছে। এমন পরিস্থিতে ‘সরকারের সঙ্গে বিএনপির গোপন সমঝোতা’র বিষয় খুঁজলেও অন্যপক্ষ বিষয়টিকে দেখছে ইতিবাচকভাবেই।

ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন বিএনপি সাংগঠনিকভাবে ঝিমিয়ে পড়েছিল। কোনও কর্মসূচি না থাকায় দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। ওই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এককভাবে কর্মসূচি পালনের মধ্যে দিয়ে দলকে সংগঠিত করার দিকে মনযোগ দিয়েছেন তারা। বিষয়টিকে তরা স্বাগত জানাচ্ছেন। একইসঙ্গে শরিক দলগুলোও নিজ-নিজ সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর কাজে মনোযোগ দিচ্ছে। মাঠে থাকারও চেষ্টা করছে কর্মসূচি নিয়ে।

প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি ও পুনঃনির্বাচনের দাবিতে ইতোমধ্যে ৮ বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করছে বিএনপি। এরমধ্যে গত ৮ জুলাই বরিশাল, ২০ জুলাই চট্টগ্রাম ও ২৫ জুলাই খুলনায় সমাবেশ করে দলটি। এসব সমাবেশে ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের রাখা হয়নি। ২০ দলীয় জোটের শরিক এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, ‘‘আমি বিএনপিকে অভিন্দন জানাই। বহু দেরিতে হলেও তারা উপলব্ধি করেছে, দলকে টিকিয়ে রাখতে হলে এককভাবে কিছু প্রোগ্রাম করে সংগঠিত হতে হবে। আমি কয়েকটি দল নিয়ে ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ করেছিলাম। সেই মঞ্চের ১৮ দফা দাবি মধ্যে মূল দাবি ছিল খালেদা জিয়ার মুক্তি ও পুনঃনির্বাচন। এখন বিএনপি মূলত সেই দুটি দাবি নিয়ে জনগণের কাছে যাচ্ছে। নতুন কোনও দাবি বিএনপির কাছে নেই।’

কর্নেল (অব.) অলি আহমদ আরও বলেন, ‘সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সমাবেশ, মিটিং-মিছিল করে জনগণকে সংগঠিত করলে একসময় সরকার পুনঃনির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতেও বাধ্য হবে।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘রাজনীতিতে একটা সময় নিতে হয়। আমরা সময় নিচ্ছি, বিএনপি দল গোছাচ্ছে, এতে ক্ষতি কী? এটাকে আমরা পজেটিভলি নিচ্ছি। আমরাও বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে রাস্তায় থাকার চেষ্টা করছি। সবকিছু মিলিয়ে জাতীয়কে আরও ঐক্যবদ্ধ করে আমরা মাঠে নামবো।’

প্রত্যেক দলের নিজস্ব কিছু সমস্যা থাকে বলে উল্লেখ করে সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘সেগুলো তো গোছানো সময়সাপেক্ষ। ফলে বাইরে থেকে বিএনপির সমালোচনা করবো, এটা তো হয় না।’

২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের একাংশ বলছে, বিএনপি অনেকটা হঠাৎ করেই ‘একলা চলোনীতি’ গ্রহণ করেছে। তারা এককভাবে কর্মসূচি পালন করার আগে জোটের কারও সঙ্গে কোনও আলোচনা করেনি। এই নিয়ে জোট নেতাদের কোনও ইঙ্গিতও দেননি বিএনপির নেতারা। সর্বশেষ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মিটিংয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা বলেছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগী। আর ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে জোটবদ্ধভাবে কর্মসূচি পালন করার কথা দিয়েছিলেন জোটের সমন্বয়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।

উভয় জোটের এই নেতারা বলছেন, সম্প্রতি জোটসঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই বিএনপি এককভাবে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন সরকারের সঙ্গে বিএনপির কোনও সমঝোতা হয়েছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। কোনও সমঝোতাই ছাড়াই সরকারও কেন হঠাৎ করে বিএনপিকে রাস্তাঘাট বন্ধ করে সমাবেশ করার অনুমতি দিচ্ছে? আবার একে একে বিএনপির নেতারাও সবাই কারামুক্ত হচ্ছেন? হঠাৎ করে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের বিষয়টি সামনে এনে তার মুক্তিও চাচ্ছে বিএনপি?

জানতে চাইলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘বিএনপির এককভাবে কর্মসূচি পালনের বিষয়ে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে কোনও কথা হয়নি। আমি যেটা বুঝি যে, বিএনপি এখন একলা চলতে চায়। আমরা আমাদের সাংগঠনিক শক্তি অনুযায়ী দিয়ে কাজ করছি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০ দলীয় জোটের একটি শরিক দলের শীর্ষ নেতা বলেন, ‘খালেদা জিয়া মুক্তি বা অন্য কোনও কিছু নিয়ে সরকার সঙ্গে বিএনপির কোনও সমঝোতা হয়ে থাকতে পারে। না হলে বিএনপি যেখানে সমাবেশ করার অনুমতি চাচ্ছে সরকার দিয়ে দিচ্ছে ভালো মানুষের মতো। এখানে সন্দেহ করার মূল জায়গাটা।’

ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির এক নেতা বলেন, ‘‘ঐক্যফ্রন্টের ক্ষতি যেটা হওয়ার, সেটা হয়েই গেছে। যত বড় জায়গা ফ্রন্ট এসেছিল, এখন সেই জায়গা নেই। এখন বিএনপি আবার ড. কামালের নেতৃত্বে প্রতি কোনও আস্থা নেই। তিনি তো আমাদের একক নেতা ছিলেন না। বিএনপি একসময় তাকে একক নেতা বানানোর চেষ্টা করেছিল। একসময় কারও ওপর সওয়ার হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার আশাবাদীও ছিল বিএনপি। তা না হওয়ায় এখন মন খারাপ করে এখন ‘একলা চলানীতি’ গ্রহণ করছে!’’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এই নেতা আরও বলেন, ‘এখন হয়তো অন্যকিছুতে আশাবাদী আছে বিএনপি, যা আমরা জানি না। কাউকে কিছু বললো না, হঠাৎ করে তারা চলে গেলো একক কর্মসূচিতে!’

এদিকে, ২০ দলীয় জোটের কেউ কেউ বিএনপির ‘একলা চলোনীতি’র পেছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্যও দেখছেন। তারা বলছেন, নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন হওয়ার পরে ২০ দলীয় জোটের নেতাদের দাবি ছিল, এই জোটটিকে বিএনপি বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। তাদের দীর্ঘদিনের ২০ দলীয় জোটকে অবহেলা করছে। এই কারণে তারা কর্মসূচিগুলোতে জোট কিংবা ঐক্যফ্রন্টের কাউকে না রেখে এককভাবে পালন করছে। এরমধ্যে দিয়ে দুই জোটের কাউকে খুশি কিংবা অখুশি না করে সমান মূল্যায়ন করছে, এমনটিও বোঝাতে চাচ্ছে হয়তো বিএনপি।

জানতে চাইলে ২০ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক বলেন, ‘বিএনপিকে বলে দিয়েছি, ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে মাতামাতি করলে আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকবো না।’ বিএনপিরকে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী দল মনে করেই দলটির সঙ্গে তারা আছেন বলেও তিনি জানান।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •