বিশেষ প্রতিবেদক:
রোহিঙ্গাদের দেখতে আবার এসেছে মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধি দল। শনিবার (২৭ জুলাই) কুতুপালং এক্সটেনশন-৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের পর সেখানে উভয়পক্ষে বৈঠক হয়। এই বৈঠকে রোহিঙ্গা নেতারা বরাবরের মতো তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরলে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকা দেশটির পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ে বলেছেন, ‘এটি মিয়ানমার সরকার বিবেচনা করছে। আমরা আপনাদের ফিরিয়ে নিতে এসেছি। রাখাইনে আপনাদের জন্য ঘরবাড়ি, স্কুলসহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপনারা (রোহিঙ্গা) মিয়ানমারে ফিরে যান।’ তবে তার কথায় আশ্বস্ত হতে পারেননি রোহিঙ্গা নেতারা। রোহিঙ্গাদের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে না পারায় মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলটি জানিয়েছে, আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

এর আগে ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি সকাল ১০টার দিকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছে। এরপর ইনানীতে অবস্থিত রয়েল টিউলিপ হোটেল হয়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উখিয়ার কুতুপালং এক্সটেনশন-৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। পরিদর্শন শেষে দুপুর ১টার দিকে রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তারা। এ সময় রোহিঙ্গা ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম, অতিরিক্ত কমিশনার শামসুদ্দোজা নয়ন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এসএম সরওয়ার কামালসহ ‘আরআরআরসি’ জেলা প্রশাসন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতা সংস্থার লোকজন উপস্থিত ছিলেন।

কক্সবাজারে সফরে আসা মিয়ানমারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক আহা সেন্টারের একটি প্রতিনিধি দলও। আহা সেন্টার ও মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল একসঙ্গে রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নিতে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বুঝিয়েছে। এ সময় প্রতিনিধি দলটি রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমার সরকার যেসব কাজ করছে, সেগুলো তুলে ধরে।

কক্সবাজারস্থ শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ আবুল কালাম জানিয়েছেন, মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলটির সঙ্গে আসিয়ানের (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের আঞ্চলিক জোট) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক মানবিক সহায়তা কেন্দ্র বা আহা সেন্টারের একটি প্রতিনিধি দলও রয়েছে। রাখাইনের পরিবেশ নিয়ে গত মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর সমালোচনার মুখে পড়ে আহা সেন্টার। ওই প্রতিবেদনকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে সমালোচনা করেছে আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ দেশ মালয়েশিয়া। অবশ্য গত বছরও মিয়ানমারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা শিবিরে গিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছিল। তবে তাতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় কোনও গতি আসেনি।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার শামসুদ্দোজা নয়ন। তিনি জানিয়েছেন, প্রতিনিধি দলের সদস্যরা কয়েকটি ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে সেখানে কী ধরনের সুযোগ সুবিধা তৈরি করা হয়েছে, সে ব্যাপারে তাদের জানিয়েছেন।

মিয়ানমারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা জানান, বৈঠকে প্রত্যাবাসন ইস্যুতে যৌথ ডায়ালগে সম্মতি জানিয়েছেন মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা।

বৈঠকে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গা নেতা মুহিব উল্লাহ জানিয়েছেন, ‘দ্বিতীয়বারের মতো মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসে আমাদের সঙ্গে আলাপ করেছেন। আমাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু, কীভাবে, কখন মিয়ানমারে ফিরে যাবো, সে ব্যাপারে আশ্বস্ত করেননি। আমরা আমাদের মৌলিক অধিকারগুলো ফিরিয়ে দিতে বার বার তাদের অনুরোধ করেছি। কিন্তু, মিয়ানমার কথা দিয়ে কথা রাখেনি।’

রোহিঙ্গা নেতা জোবায়ের হোসেন জানান, ‘আমরা ৪০ জন রোহিঙ্গা নেতা বৈঠকে অংশ নিয়েছি। আমাদের সবার একই দাবি ছিল, আমাদের প্রথমে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। অবাধ চলাফেরার সুযোগ দেওয়াসহ একটি দেশের নাগরিকরা যেসব সুযোগ-সুবিধা পায়, তা আমাদের দিতে হবে। উত্তরে মিয়ানমারের প্রতিনিধিন দল বলছে, সেটি মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে আমাদের জানাবে এবং নিয়মিত সংলাপে বসতে চেষ্টা করবে।’

আরেক রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ একই কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মিয়ানমার আমাদের কোনোদিন ফিরিয়ে নেবে না। এটি একটি নাটক শুরু করছে। আন্তর্জাতিকভাবে যখন মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়, তখনই নানা ফন্দি শুরু করে মিয়ানমার সরকার। আজকের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন এটির একটি অংশ।’

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর রাখাইন রাজ্যে চলা হত্যা, ধর্ষণসহ বিভিন্ন সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে এই পর্যন্ত বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। বর্তমানে তারা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ পাহাড়ে ৩২টি ক্যাম্পে অবস্থান করছে। দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার পর রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে দ্বিপক্ষীয় একটি চুক্তিতে সই করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। সব রকমের প্রস্তুতির পরও মিয়ানমার রহস্যজনক কারণে চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি। পরে জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করে। চীনের ভূমিকা অস্পষ্ট থাকলেও সম্প্রতি তারাও সবুজ সংকেত দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এর আগে ২০১৭ সালের ১৯ ও ২০ মার্চ রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের ‘মিথ্যেবাদী’ বলে পাশ কাটাতে চেয়েছিল মিয়ানমার। তবে আবারও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ায় রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিনে দেখে দ্বিতীয়বারের মতো মিয়ানমারের উচ্চপর্যায়ের এই প্রতিনিধি দলের আগমন বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্ট মহল। আগামীকাল রবিবার রোহিঙ্গা হিন্দু ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দলটির গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার কথা রয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •