cbn  

জসীম উদ্দীনঃ

দেশে লবণের ঘাটতি নেই উল্লেখ করে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন এমপি বলেছেন, কোরবানির ঈদে চামড়া শিল্পে লবণ ব্যবহারের পরও স্বাভাবিক চাহিদার লবণ উদ্বৃত্ত থাকবে।

শিল্পমন্ত্রী বলেন,২০১৮-১৯ অর্থ অর্থবছরে লবণের চাহিদা ছিল ১৬ দশমিক ৫৭ লক্ষ মেট্রিক টন। ১৮ লক্ষ মেট্রিক টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বিপরীতে মাঠে নেমে মৌসুম শেষে উৎপাদন হয়েছে ১৮ দশমিক ২৪ লক্ষ মেট্রিক টন। চাহিদা ও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি লবণ উৎপাদন হয়েছে। তাই কেউ চাইলেও আমদানির কোন প্রশ্নই আসে না।

গত ৫ জুলাই কক্সবাজারের একটি তারকা মানের হোটেলে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) ‘লবণ চাষ ও আয়োডিনযুক্তকরণ:সার্বজনীন আয়োডিনযুক্ত লবণ’ শীর্ষক কক্সবাজারে আয়োজিত কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্পমন্ত্রী এসব কথা বলেছিলেন।

শিল্পমন্ত্রীর বক্তব্যের ঠিক ১৫ দিনের মাথায় ২০ জুলাই থেকে কক্সবাজারে একের পর এক ভারতীয় লবণ বোঝাই ট্রাক জব্দ হচ্ছে।এ নিয়ে ২০ জুলাই ৫টি ও ২৩ জুলাই ৬টি ট্রাকসহ ভারতীয় লবণ বোঝাই মোট ১১টি ট্রাক জব্দ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, বিভিন্ন সময় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে আরোও অন্তত ১৭টি ভারতীয় লবণ বোঝাই ট্রাক। যেগুলো পরবর্তী পটিয়া ও চট্রগ্রামে বিভিন্ন মিলে খালাস করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

জব্দকৃত ট্রাকগুলোর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হীরা ভ্যাকুয়াম ইভাকরপোরেশন সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ। যদিওবা আমদানিকারকরা দাবি করেছে, এগুলো লবণ নয়, কাঁচামাল। তারা বিনিয়োগবোর্ড নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। বিগত এক দশক ধরেই গার্মেন্টস ও ডায়িং শিল্পে ব্যবহারউপযোগী ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিক্যাল তৈরী ও সরবরাহ করে আসছে এ প্রতিষ্ঠানটি।

ভাষ্যমতে, এসব লবণ বৈধ পন্থায় আইন মেনে ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছে। এবং তাদের বৈধ কাগজ পত্র আছে।আমাদানিকৃত ইন্ডাস্ট্রিজটির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে কক্সবাজার সদরে শিল্প এলাকা ইসলামপুরে।

ইসলামপুরে খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, হীরা ভ্যাকুয়াম ইভাকরপোরেশন সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ নামের কোন অস্থিত্ব নেই। এটি নিশ্চিত করেছে কক্সবাজার বিসিক ও মিল মালিকরা।

কক্সবাজার বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক সৈয়দ আহামদ জানান, তাদের হাতে লবণ মিলের যে তালিকা রয়েছে তার মধ্যে হীরা ভ্যাকুয়াম ইভাকরপোরেশন সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ নামের কোন ইন্ডাস্ট্রিজ নেই। অস্থিত্বহীন সল্টের নাম ব্যবহার করে লবণ আমদানির জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে দায়ি করেন।

এত কিছুর পরও আটককৃত লবণের ট্রাক গুলো পরবর্তী বৈধ কাগজ পত্রের অজুহাতে থানা পুলিশ ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হীরা ভ্যাকুয়াম ইভাকরপোরেশন সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ নামে লবণ ইন্ডাস্ট্রিজ এর কোন অস্থিত্ব ইসলামপুরে নেই। তবে গ্রামীণ সল্ট নামক এক লবণ ইন্ডাস্ট্রিজ পাশে একই কারখানা একটি নাম মাত্র সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। গ্রামীণ সল্ট এটি খাল ভরাট করে অবৈধভাবে নির্মিত লবণ মিলদেরও একটি বলে জানা গেছে।

এদিকে ৫৮ বছরের ইতিহাস রেকর্ড লবণ উৎপাদন। লবণ চাষী, ব্যবসায়ী ও মিলাদের উপস্থিতে শিল্পমন্ত্রীর লবণ আমদানির কোন সম্ভাবনা নাই। ঘোষণার পরও নামে বেনামে কথিত মিলারদের লবণ আমদানি দেশীয় লবণ শিল্প ধ্বংসের ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন লবণ সংশ্লিষ্টরা।

বিসিকের তথ্যমতে, এখনো মাঠে ও মিলে পড়ে রয়েছে প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন অবিক্রিত লবণ। মিল মালিক লবণ ব্যবসায়ী ও চাষীদের মতে যার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ।

সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রতিনিয়ত আসছে ভারতীয় ও চায়না লবণ। কৃত্রিম লবণ সংকট তৈরি করে এসব লবণ আনা হচ্ছে। তাও আবার ট্যাক্স ফ্রি সোডিয়াম সালফেটের নাম করে ক্লোরাইড।বিসিকের মতে ক্লোরাইড বাজারজাতকরণের কোন নিয়ম নেই।এটি মানবদেহে ক্যান্সারসহ মরণ ব্যাধি নানান রোগের কারন হতে পারে।

কক্সবাজারের সিংহভাগ চাষীরা এখনো লবণ বিক্রি করতে পারেননি।মাঠের গর্তে ও গুদামে লাখ লাখ মন লবণ পড়ে আছে। দামে কম এবং মিলারদের গুদামেও পর্যাপ্ত লবণ মজুদ থাকায় এ বেহাল দশা।

এমতাবস্থায় অসাধু সেন্ডিকেটের মাধ্যমে
টেক্স ফ্রি সোডিয়াম সালফেট নামে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর সোডিয়াম ক্লোরাইড বাজারজাতকরণের চেষ্টাই আতংকিত লবণ সংশ্লিষ্ট প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ।

বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির বলেন, দেশীয় লবণ শিল্প নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে কিনা তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন। অসাধু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টেক্স ফ্রি সোডিয়াম সালফেট নামে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর সোডিয়াম ক্লোরাইড বাজারজাতকরণের চেষ্টা সত্যি দেশের লবণ শিল্পের জন্য হুমকি। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

ইসলামপুর লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি শামসুল আলম আজাদ বলেন, কাঁচামালের আড়ালে মূলতঃ অবৈধভাবে ইন্ডিয়ান লবণ আমদানি করেছে হীরা ভ্যাকুয়াম ইভাকরপোরেশন সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ। যা দেশীয় লবণ শিল্পের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। মাঠে লক্ষ লক্ষ মন লবণ পড়ে থাকতে এভাবে অবৈধভাবে বাইরের লবণ আমদানি করা হলে দেশীয় লবণশিল্প ধ্বংস হবে। তিনিও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করে দেশীয় লবণ শিল্পকে রক্ষার জন্য সরকাররের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানান।

এ ব্যাপারে কক্সবাজারের সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল বলেন, আমি সবসময় লবণ আমদানির বিরুদ্ধে। যেহেতু দেশে এ বছর রেকর্ড সংখ্যক লবণ উৎপাদন হয়েছে সেহেতু আমদানির প্রশ্নই আসে না। আর যদি কেউ অবৈধভাবে পন্থায় অস্থিত্বহীন মিলের ঠিকানা ব্যবহার করে লবণ আমদানি করে থাকে, এ বিষেয় তদন্ত করে ব্যবস্থাগ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের জানানো হবে বলেও জানান এমপি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •