এম.মনছুর আলম, চকরিয়া:
চোখে না দেখলে বানভাসী মানুষের কষ্ট বোঝা বড়ই কঠিন। বন্যাদুর্গত এলাকায় খাবার সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ অত্যান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে প্রাকৃতিক সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে সবাইকে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা একান্ত প্রয়োজন। সামর্থ অনুয়ায়ী সবাইকে বানভাসী দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সময়ের দাবি। ত্রাণের অভাবে বানভাসী মানুষ নিদারুণ কষ্টে জীবন যাপন করছে।
জানা গেছে, গত এক সপ্তাহের অধিক সময় ধরে টানা মুষলধারে বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি চকরিয়া-পেকুয়ায় মাতামুহুরী নদী দিয়ে নেমে আসে ভাটির দিকে। এসময় নদীর দু’কুল উপচিয়ে লামা-আলীকদম প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি চকরিয়ার সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, লক্ষ্যারচর, বরইতলী, সাহারবিল, চিরিংগা, কৈয়ারবিল, কোনাখালী, বিএমচর, ঢেমুশিয়া, পশ্চিম বড় ভেওলা, ফাঁসিয়াখালী ও পৌরসভার অধিকাংশ এলাকা এবং পেকুয়া সদর, উজানটিয়া, মগনামা, বারবাকিয়া, শিলখালীসহ বর্তমানে বেশ ক’টি ইউনিয়নের দু’তাধিক গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। বন্যায় এ পর্যন্ত চকরিয়ায় ৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। প্রাণহানির সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাহাড়ি ঢলের পানিতে চকরিয়া উপজেলার বন্যা পরবর্তী পরিস্থিতি চরম সংকটে।
মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের চাপে উপজেলার বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। ফলে উপকুলীয় ইউনিয়নে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে এখনো পানিবন্দি রয়েছে লক্ষাধিক বানবাসি মানুষ। নদী তীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত বেশ কয়েকটি বসতঘর নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। ভাঙ্গনের মুখে রয়েছে ব্রীজ-কালভার্ট, মসজিদ-মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থাপনা। বন্যায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অভ্যান্তরীণ সড়ক, উপসড়ক লন্ডভন্ড ও খানখন্দকে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় বন্যাকবলিত মানুষ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির চরম সংকটে ভুগছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণের অভাবে বানবাসী মানুষ চরম কষ্টে আছে। নলকূপগুলো ডুবে যাওয়ায় সুপেয় পানির সংকট চরমে। পানিবন্দির মধ্যে বসবাস করলেও বিশুদ্ধ পানি না পেয়ে বাধ্য হয়ে অনেকে বন্যার পানি পান করছে। গবাদিপশু তাদের জন্য বড় সমস্যা। বিভিন্ন এলাকার বানভাসী মানুষ পশুখাদ্য নিয়ে বিপাকে পড়েছে। খাদ্যের পাশাপাশি পশু রাখার জায়গা সংকটে দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি মানুষের যেখানে নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, সেখানে পশু নিয়ে তাদের সমস্যার অন্ত নেই।
বর্তমানে বন্যা দূর্গত এলাকায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও পানি শোধনকারী ট্যাবলেট পাঠানো জরুরি। বন্যাদুর্গত এলাকায় চিঁড়া-মুড়ি-গুড়ের পাশাপাশি শিশুখাদ্য, স্যালাইন, দেশলাই, মোমবাতি ত্রাণের মধ্যে রাখা উচিত। তবে বন্যাকবলিত বেশ কিছু এলাকায় প্রায় ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে। যেখানে সবার ঠাঁই মিলছে না। ত্রাণসংকট চরম আকার ধারণ করেছে। একটু খাবারের জন্য বানভাসী মানুষ দ্বিবিদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। সোমবার বিকেল পর্যন্ত বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।
সুরাজপুর-মানিকপুরের ইউপি চেয়ারম্যান আজিমুল হক, বিএমচর ইউপি চেয়ারম্যান এসএম জাহাংগীর আলম, কোনাখালী ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল হক সিকদার, কাকারা ইউপি চেয়ারম্যান শওকত ওসমান ও লক্ষ্যারচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তাফা কাইছার জানান, বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় বন্যার পানি কমেনি। শতশত পরিবারে রান্নার কাজ বন্ধ রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে পানিবন্দি মানুষের মাঝে খিচুড়ি রান্না করে ও শুকনো খাবার দেয়া হচ্ছে।
চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ফজলুল করিম সাঈদী বলেন, উপজেলার বিভিন্ন বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। বিএমচর ইউনিয়নের কইন্ন্যারকুমের ভাঙ্গনকৃত বেড়িবাঁধ সরজমিন পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্থ বেঁড়িবাধ সমূহ জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বলেছি।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, লোকালয়ে জমে থাকা বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে । পানিবন্দি রয়েছে এখনো শত শত বানবাসি মানুষ। বন্যার্তদের বিতরণের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষথেকে ৪০ মেট্রিক টন চাল ও ২ হাজার পেকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •