এ কে এম ইকবাল ফারুক,চকরিয়া :

টানা এক সপ্তাহ ধরে থেমে থেমে ভারী বর্ষণ ও মাতামুহুরীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পৌর এলাকাসহ উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের বেশিরভাগই বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে আড়াই লাখ মানুষ। বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকায় অঘোষিতভাবে বন্ধ হয়ে গেছে উপজেলার শতশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া উপজেলার প্রায় ৪০ হাজার পরিবারের বাড়ি ঘরে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় এসব পরিবারের চুলার রান্নাবান্না সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে খাবার ও বিশুদ্ধ পানীয় জল নিয়ে এসব লোকজন চরম দূর্ভোগে পড়েছে। রবিবার পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্নস্থানে পাহাড় ধস, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ও পানিতে তলিয়ে গিয়ে এক নারীসহ চারজন নিহত হয়েছে। বৃষ্টি কমে যাওয়ায় মাতামুহুরী নদীর পানি রবিবার (১৪ জুলাই) সন্ধ্যা থেকে কমতে শুরু করেছে। বন্যার পানিতে বিভিন্ন ইউনিয়নের সড়কগুলো ডুবে থাকায় উপজেলা সদরের ওইসব ইউনিয়নের সকল ধরনের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

এদিকে চকরিয়া উপজেলার বন্যাকবলিত বিভিন্ন ইউনিয়নের বানবাসি লোকজনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রান সহায়তা হিসেবে গতকাল রবিবার পর্যন্ত ৪০ মে:টন চাল ও ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। আরও ত্রান সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুরুদ্দীন মোহাম্মদ শিবলী নোমান।

উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহ ধরে ভারী বর্ষণের ফলে মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তাঁর ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে কয়েক হাজার হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসত বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে এসব পরিবারের লোকজন খাবার ও পানীয় জল নিয়ে চরম দূর্ভোগে পড়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে জিদ্দাবাজার-কাকারা-সুরাজপুর-মানিকপুর সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বন্যায় মাঝের ফাঁড়ি ব্রীজ সংলগ্ন একটি মসজিদ ও মানিকপুর রাখাইন পাড়া এলাকার দুইটি মন্দির নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে।

কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত ওসমান বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে প্রবল বর্ষণ ও মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তাঁর ইউনিয়নের অন্তত ২৫ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এছাড়া প্রায় ৫ হাজার পরিবারের বসতবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করায় এসব পরিবারের চুলায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গিয়ে খাবার ও বিশুদ্ধ পানীয় জল নিয়ে তারা চরম দূর্ভোগে পড়েছে। বিষয়টি স্থানীয় সাংসদ আলহাজ্ব জাফর আলম ও উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাড়ে ৮মে:টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। পরে ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের মধ্য থেকে অত্যাধিক ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের তালিকা তৈরী করে সরকারী এসব ত্রাণ সহায়তা তাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

বমুবিলছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মতলব বলেন, এক সপ্তাহ ধরে প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তার ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডই বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। শনিবার রাতেও ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় রাত দুইটার দিকে হঠাৎ ইউনিয়নের বমুরকুল এলাকায় পাহাড়ের একটি অংশ ধসে গিয়ে পাহাড় সংলগ্ন একটি বসতবাড়ির উপর পড়লে ঘুমন্ত অবস্থায় মাটি চাপা পড়ে স্বামী-স্ত্রী দুইজন নিহত হয়। পরে স্থানীয় লোকজন মাটি সরিয়ে ফেলে নিহতদের লাশ উদ্ধার করে। এখনো বন্যার পানি না নামায় ইউনিয়নের অন্তত ১০ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া ৫শতাধিক পরিবারের বসত বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গিয়ে এসব পরিবারের লোকজন খাবার ও পানীয় জল নিয়ে চরম দূর্ভোগে পড়েছে।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জালাল আহামদ সিকদার বলেন, ভারী বর্ষণের ফলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গোবিন্দপুর, ডেইংগাকাটাসহ ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬টি ওয়ার্ড পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ওই ইউনিয়নের অন্তত ২৫ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসত বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এসব পরিবারের লোকজন খাবার ও পানীয় জল নিয়ে চরম দূর্ভোগে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকারী ত্রান সহায়তা হিসেবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ওইসব বরাদ্দ ইউনিয়নের স্ব স্ব ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে বানবাসি লোকজনের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে বানিয়ারছড়া-শান্তিরবাজার-কুতুববাজার সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া বন্যায় ইউনিয়নে বেড়িবাধসহ অন্তত তিন কিলোমিটার কাঁচাপাকা সড়ক সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। পানিতে ডুবে থাকায় এ ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অঘোষিত বন্ধ হয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।

লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা কাইছার বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে টানা বর্ষনের ফলে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে তার ইউনিয়নে পূর্বপাড়া, জহিরপাড়া, হাজীপাড়া, মন্ডলপাড়া ও চরপাড়া এলাকার অন্তত ১০ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া ৫শতাধিক পরিবারের বসত বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে এসব পরিবারের লোকজন খাবার ও পানীয় জল নিয়ে চরম দূর্ভোগে পড়েছে। এসব লোকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়। পরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রান সহায়তা হিসেবে পাওয়া আড়াই মে:টন চাল ইউনিয়নের বানবাসি লোকজনের মাঝে ১০ কেজি করে বিতরণ করা হয়। তিনি আরও বলেন,বন্যা ও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গিয়ে চকরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও আমজাদিয়া ফাজিল মাদ্রাসাসহ বেশকিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অঘোষিত বন্ধ হয়ে গেছে।

এছাড়া কৈয়ারবিল, হারবাং, চিরিঙ্গা, সাহারবিল, পূর্ব ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, বিএমচর, কোণাখালী, ডুলাহাজারা-খুটাখালী, ঢেমুশিয়া, বদরখালী ও চকরিয়া পৌরসভা এলাকায় হাজার হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে চরম দূর্ভোগের শিকার হচ্ছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মোহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, ভারী বর্ষনের ফলে সৃষ্ট বন্যা পরবর্তী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রান সহায়তা হিসেবে বন্যাকবলিত ইউনিয়ন গুলোতে ৪০ মে:টন চাল ও ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এ কন্ট্রোল রুম থেকে বন্যাপরিস্থিতি সার্বিক মনিটরিং করা হচ্ছে। ইউএনও আরও বলেন, আরও ত্রান সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •