আতিকুর রহমান মানিক:
উখিয়ার থাইংখালীর বনভূমিতে নতুন করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প নির্মাণের বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যবহুল সংবাদে সৃষ্টি হয়েছে তোলপাড়। এতে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। শীর্ষস্হানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল কক্সবাজার নিউজ ডটকম (সিবিএন) এ গত বুধবার উক্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়।
গত কয়েকদিন আগে থাইংখালীর ১৯ নং ক্যাম্প সংলগ্ন লন্ডাখালীর বনভূমির বিশাল এলাকা জুড়ে গোপনে গড়ে তোলা হয় নতুন একাধিক রোহিঙ্গা ক্যাম্প। এ নিয়ে উপরোক্ত সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের নজরে আসে।
গতকাল বৃহষ্পতিবার কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্টিত এক সভায় উখিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী গোপনে নতুন করে রোহিঙ্গা শিবির তৈরির উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেন। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, এধরণের উদ্যোগ এলাকাবাসীর কাছে নতুন করে আতংক সৃষ্টি করেছে। যে সময়ে গোটা দেশবাসী রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরাতে তৎপর এমন সময়ে রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গোপনে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ‘হাতে নিয়ে’ শিবির নির্মাণের ঘটনাটি মোটেই কাম্য নয়। এ প্রসঙ্গে সীমান্তবর্তী এই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আরো বলেন, এতে করেই প্রমাণিত হয় বাস্তবে আরাকান থেকে রোহিঙ্গাদের এপাড়ে নিয়ে আসার বিষয়টি ছিল আন্তর্জাতিক গোষ্ঠির দীর্ঘদিনেরই পরিকল্পনা। তিনি আরো বলেন, বর্ষার সময় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ী এলাকায় বসবাসরত রোহিঙ্গাদের অজুহাত দিয়েই নতুন করে দু’টি স্থানে নতুন শিবির করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন বলেন-‘আমি এমন সময়ে এরকম খবরটি শুনে অবাক হলাম। কেননা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আমার (জেলা প্রশাসক) কাছে কড়া নির্দেশনা রয়েছে যে, নতুন করে রোহিঙ্গাদের জন্য এক ইঞ্চি জমির জায়গাও দেয়া হবেনা।’ আমি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দ্দেশনা মোতাবেক কাজ করব। সেখানে নতুন করে রোহিঙ্গা বসতি করা হলে সেসব গুঁড়িয়ে দেয়ার নির্দেশনা দেব।’
এসময় সভায় উপস্থিত উখিয়া উপজেলা সহকারি ভুমি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড) ফখরুল ইসলাম জেলা প্রশাসককে জানান, স্থানীয় প্রশাসনের তরফে তারা এসব নতুন বসতি স্থাপনের ব্যাপারে অনেক বাঁধা দিয়েছেন। কিন্তু রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত প্রশাসন তাদের বাঁধা অমান্য করে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠির কথা মতই নতুন বসতি স্থাপনের কাজ অব্যাহত রেখেছেন।
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্বেও কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের পাহাড়ী এলাকায় নতুন করে এই রোহিঙ্গা বসতি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে নতুন বসতি নির্মাণের নেপথ্যে মিয়ানমারের আরাকানে থাকা অবশিষ্ট সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গাকেও এদেশে নিয়ে আসার নতুন কৌশল রয়েছে কিনা তা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে দেথা দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা ও শংকা। আর যে মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের স্বদেশ ফেরানোর মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে চীন সফরে রয়েছেন এমন সময়টিতে নতুন বসতি নির্মাণের ঘটনায় এলাকার লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।
তদুপরি রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন বসতি নির্মাণ করার স্থানটিও হচ্ছে একটি স্পর্শকাতর এলাকা। যে এলাকার পাহাড়ী গুহায় ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আবিষ্কার করা হয়েছিল দু’টি হরকত জঙ্গি ঘাঁটি। এই জঙ্গি ঘাঁটি থেকে বহু অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সহ গ্রেফতার করা হয়েছিল ৪১ জন নিষিদ্ধ হরকত জঙ্গিকে। পরবর্তীতে আদালতে এসব জঙ্গিকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়েছিল। সেই সময় থেকে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের লুন্ডাখালী পাহাড়ী এলাকাটির নাম হয় ‘হরকত পাহাড়।’
এলাকাবাসী জানান, এই পাহাড়টিতে গত ক’দিনের মধ্যে একদম নিরবে কয়েকশ ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। একই এলাকায় রোহিঙ্গাদের জন্য ঘর নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। এসব ঘর নির্মাণের কাজ শুরুর পর থেকেই এলাকার লোকজন বাঁধা দিয়ে আসছিল। এ বিষয়েজ উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন-‘ রোহিঙ্গা শিবিরের দেখভাল করার কাজে নিয়োজিত ক্যাম্প ইনচার্জ মোহাম্মদ রাশেদ এলাকাবাসীর কোন কথা অমান্য করেই এসব ঘর নির্মাণ কাজ তদারকি করে চলেছেন। সরকারি এই কর্মকর্তা (ক্যাম্প ইনচার্জ) দেশের স্বার্থ বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর স্বার্থকেই বড় করে দেখে যেন এসব কাজ করছেন।’
ইউপি চেয়ারম্যান এ প্রসঙ্গে আরো অভিযোগ তুলে বলেন, নারী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন নামের একটি এনজিও বিদেশী অর্থায়নে এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ইউপি চেয়ারম্যান এলাকাবাসীর আশংকার কথা তুলে ধরে বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এক সুদুরপ্রসারি পরিকল্পনা নিয়ে রোহিঙ্গাদের আরাকান থেকে ২০১৭ সালের আগষ্ট পারবর্তী সময়ে মিয়ানমারের নির্যাতনের অজুহাত তুলে এপাড়ে নিয়ে এসেছে। এখনো পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা মাফিক আরাকানের বাদবাকি রোহিঙ্গাদেরও এপাড়ে নিয়ে আসার কাজ থেমে নেই-এমন দাবি ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরীর।
নতুন করে রোহিঙ্গা শিবির নির্মাণের এমন বিষয়টি নিয়ে কক্সবাজারে এখন তোলপাড় চলছে। জেলা প্রশাসনের অগোচরে এধরনের শিবির নির্মাণের কাজ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা সন্দেহ। ওদিকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের নামে মিয়ানমারের আরাকানকে বাংলাদেশের সাথে একাকার করার জন্য একজন মার্কিন কংগ্রেসম্যানের নতুন করে প্রস্তাবনা উত্থাপনের পর পরই নতুন রোহিঙ্গা শিবির করার বিষয়টি নিয়ে এলাকার লোকজন সহজ ভাবে গ্রহন করছেন না। এমনকি রোহিঙ্গা শিবির নিয়ে জেলা প্রশাসন ও রোহিঙ্গা তদারকির কাজে নিয়োজিত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে এক প্রকারের দ্বন্ধ-সংঘাতের বিষয়টিও এলাকাবাসীর কাছে উঠে এসেছে।
নতুন করে রোহিঙ্গা বসতি নির্মানের কথা স্বীকার করেছেন ১৬, ১৭, ১৮ ও ১৯ নং ক্যাম্প ইনচার্জ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবু ওয়াহাব রাশেদ। তিনি জানান, ক্যাম্পে যাতায়াত সুবিধার উন্নয়নের জন্য এডিবি সড়ক নির্মাণ করলে অসংখ্য বাড়ীঘর সরিয়ে নিতে হবে। তাদের পুর্ণবাসনের জন্য নতুন করে ঘর তৈরি করে রাখা হয়েছে।
কিন্তু বিষয়টি নিয়ে রোহিঙ্গা শিবির তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত সরকারের অতিরিক্ত সচিব ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন-‘আমরা ইউএনএইচসিআর এর তহবিল নিয়ে এক স্থানে এ ধরণের সাড়ে তিনশ ঘর নির্মাণ করছি। অপরদিকে অন্যস্থানে বন বিভাগের সামাজিক আগর বাগানের ১০০ একর পাহাড়ী ভুমিতে আরো ৫০০ এর মত ঘর করছি। যা মোট জমির সাড়ে ৬ হাজার একরের ভিতর। আমরা কোনভাবেই সাড়ে ৬০০ হাজার একরের বেশী ব্যবহার করছি না।’ তিনি বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে কারো ভুলবুঝাবুঝির অবকাশ নেই। তিনি আরো বলেন, এসব কাজ নতুন করে করা হচ্ছে না। এগুলো আগের কাজ মাঝখানে বন্ধ ছিল। তাই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যেহেতু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা রোহিঙ্গাদের রাখার জন্যই এসব নির্মাণ করার কথা জানান তিনি।

সচেতন এলাকাবাসী জানান, এখন রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগে সবাইকে একযোগে কাজ করার উপযুক্ত সময়। আর এমন সময়ে আরো নতুন করে শিবির স্থাপনের কাজটি নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারন জনগন। তাদের মনে সন্দেহ জেগেছে, মিয়ানমারের রাখাইন থেকে নতুন করে রোহিঙ্গা এনে আশ্রয় দিতেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৌশলে নতুন করে শিবির স্থাপন করছে।
তারা আরো বলেন, মিয়ানমার থেকে আরো রোহিঙ্গা নিয়ে আসার আগাম প্রস্তুতি হিসেবে কিছু এনজিও এবং আইএনজিও লন্ডাখালীতে ক্যাম্প তৈরি করেছে। কারণ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নিয়েই তাদের ব্যবসা। রোহিঙ্গারা যদি এ দেশ থেকে চলে যায় তাহলে তাদের কোনো কাজ নেই। এ জন্যে লোকজনের বসতভিটা ও বনভূমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করে চলছে এই সব এনজিও এবং আইএনজিওরা।
স্হানীয়রা বলেন, রোহিঙ্গা বসতি স্হাপন করতে পারলে বিশাল বাণিজ্য হয় রোহিঙ্গা তোষক এনজিও গুলোর। বাঁশ ও পলিথিন দিয়ে নির্মিত ১৫ ফিট বাই ২০ ফিটের একটি রোহিঙ্গা বাসার জন্য ১০ /১৫ হাজার টাকা খরচ করে বিদেশী দাতা সংস্হা থেকে একলাখ টাকা পর্যন্ত বিল আদায় করে এনজিওগুলো। এছাড়াও টয়লেট, নলকূপ, রাস্তা ও ড্রেন নির্মানের ক্ষেত্রেও এভাবে বাণিজ্য করে আসছে তারা। তাই সবুজ পাহাড় কেটে ফের নতুন করে রোহিঙ্গা বসতি স্হাপনে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিতর্কিত এনজিও ও এদের দোসরগন। নতুন করে গড়ে তোলা রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিয়ে এর নেপথ্য নায়কদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নেয়ার দাবী জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •