রাসেল চৌধুরী॥
বলা যায়, এটি কক্সবাজার পুলিশের নজিরবিহীন ইতিহাস। যেমন ঘোষণা তেমন কাজ। স¤পূর্ণ তদবির ও ঘুষ বাণিজ্য ছাড়া কনস্টেবল(টিআরসি) পদে চাকরির জন্য চুড়ান্ত ভাবে মনোনীত হয়েছেন ৩৮৬ জন। তাও মাত্র ১০৩ টাকা খরছে। আর এটিই ছিল গত দুদিন কক্সবাজারের আনাচে-কানাচে আলোচ্য বিষয়। মাত্র ১০৩ টাকায় চাকরি দিয়ে এমন অনন্য নজির স্থাপন করে টক অব দ্যা ডিস্ট্রিকে পরিণত হয়েছেন জেলা পুলিশের অভিভাবক এবিএম মাসুদ হোসেন বিপিএম। এ জন্য প্রশংসায় জোয়ারেও ভাসছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ভূয়সী প্রশংসা করে শত শত স্ট্যাটাস ভাইরাল হতে দেখা গেছে।
কক্সবাজারের সিনিয়র সাংবাদিক তোফায়েল আহম্মদ তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, বিনা টাকায় নিয়োগ পরীক্ষায় ফলাফল জেনে উত্তীর্ণরা সবাই কেঁদেছেন। ফ্যাক্ট: কক্সবাজারে ঘুষমুক্ত পুলিশের নিয়োগ পরীক্ষা।
কাজী রাসেল নামের এক সমাজকর্মী লিখেছেন, ‘আমার জীবনে প্রথম দেখলাম এবং কক্সবাজার এর ইতিহাসেও সর্ব প্রথম, কোন প্রকার আর্থিক লেনদেন ব্যতীত, সিপাহী পদে তাও আবার পুলিশ এর চাকরি পেতে যাচ্ছে ভর্তি পরিক্ষায় পাস করা সকল ব্যক্তি। ইনশাহআল্লাহ ধীরে ধীরে এমন প্রকার সৎ অফিসারদের এক- একটি সৎ উদ্যোগ এর মাধ্যমে আমরা সকলে মিলেমিশে গড়বো, ১০০% দুর্নীতি মুক্ত বাংলাদেশ। স্যালুট মাননীয় পুলিশ সুপার। আন্তরিক ধন্যবাদ জেলা পুলিশ কক্সবাজার।
কক্সবাজারের বিভিন্ন দায়িত্ববান ব্যক্তিবর্গ, চাকরি প্রার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কনস্টেবল নিয়োগের অন্যান্য বারের চিত্র ও এবারের চিত্রের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক লক্ষ্য করা গেছে। অন্যান্য বার যে কনষ্টেবল পদ পাওয়ার জন্য লাখ লাখ টাকার বান্ডিল নিয়ে এ নেতা, ওই নেতার কাছে ছুটাছুটি করা লাগতো, তা এবার হয়নি। এবার যে প্রক্রিয়ায় কনষ্টেবল নিয়োগ হয়েছে তা ছিল শতভাগ স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত। যদিও শুরু থেকে পুলিশের ঘোষণা ছিল, এবার কনষ্টেবল নিয়োগ হবে স¤পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত। নিয়োগ প্রক্রিয়ার একমাস আগে থেকে পুলিশ সুপার কনস্টেবল নিয়োগ পেতে কোন দালাল, ফড়িয়া, প্রতারককে ঘুষ না দিতে গণমাধ্যম, মাইকিং, লিফলেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সভা-সেমিনারে ব্যাপক প্রচারনা চালান। আগ্রহী প্রার্থীদের শুধুমাত্র ১০০ টাকা চালানের মাধ্যমে নির্ধারিত কোড নম্বরে সোনালী ব্যাংকে জমা দিয়ে এবং ৩ টাকায় আবেদন ফরম ক্রয় করে অর্থাৎ সর্বমোট ১০৩ টাকা ব্যয় করে, আর কোন খরচ ছাড়া স¤পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কনস্টেবল নিয়োগ পাওয়া যাবে এমন ঘোষনা দেন। কেউ প্রতারক বা দালালের মাধ্যমে ঘুষ দিয়ে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করলে দালাল ও প্রার্থীকে আইনের আওতায় আনা হবে বলে হুশিয়ারী দেন। তিনি এও বলেছেন, দুর্নীতি করে কেউ চুড়ান্ত নিয়োগ পেলেও সে নিয়োগ প্রমাণ সাপেক্ষে বাতিল করা হবে। সেটা নিয়োগের যে কোন পর্যায়ে হোক না কেন, ঘুষ দিয়ে কনস্টেবল নিয়োগের কোন তথ্য পাওয়া গেলে, তা কোন অবস্থাতেই বরদাস্ত করা হবেনা। এজন্য কোন প্রার্থী কিংবা অভিভাবক যাতে প্রতারকের খপ্পরে না পড়ে, সেজন্য পুলিশ সুপার নিজস্ব গোয়েন্দাও নিয়োগ দিয়ে নিয়োগ পুরো প্রক্রিয়াটি সার্বিক গোয়েন্দা নজরদারীতে রেখেছিলেন।
তারপরও পুলিশের এ ঘোষণা নিয়ে আস্থাহীনতায় ভোগছিলেন চাকরি প্রার্থী ও তাদের স্বজনরা। শেষপযন্ত চুড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর মানুষের সেই সন্দেহ ও অবিশ্বাস কেটে যায়।
পুলিশের কনস্টেবল পদের জন্য চুড়ান্ত ভাবে মনোনীত হয়েছেন উখিয়া উপজেলার রুমখা চৌধুরী পাড়া এলাকার ছৈয়দ আহম্মদ প্রকাশ লালুর পুত্র আকতার হোসেন। তিনি জানান, এটি তার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। খবর শুনার পর সে খুশিতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। জানায়, আমার আব্বা পেশায় একজন জেলে। কোন টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমার পরিবারের নেই। টাকা ছাড়া পুলিশের চাকরি হবে খবর পেয়ে আবেদন করেছিলাম। যথারীতি সব প্রক্রিয়া শেষ করেছি। কিন্তু আস্থা রাখতে পারছিলাম না বলে ফলাফল ঘোষণার সময় কক্সবাজার যায়নি। অন্যান্য দিনের মতো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু রাত সাড়ে তিনটায় এক বন্ধুর ফোন পেয়ে ঘুম ভাঙ্গে। বন্ধু জানায়, কনস্টেবল পদের জন্য তার নাম ঘোষণা করেছে এসপি স্যার। এমন খুশির খরর শোনার পর তার পরিবারে যেন ঈদের আনন্দ নেমে আসে। পাড়াপড়শির মধ্যেও আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। সবাই তাকে দেখার জন্য ঘরে ভীড় করে। আকতারের মতোই কনস্টেবল চাকরির জন্য মনোনীত হয়েছেন তার নিকট প্রতিবেশী ফারজানা আকতার। তার পিতাও পেশায় একজন জেলে। এই দুজন কনস্টেবল পদের জন্য মনোনীত হওয়ার ঘটনাটি ছিল এলাকাবাসীর জন্য সময়ের সেরা একটি চমক। এলাকার সীমানা ছাড়িয়ে উখিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ষ্টেশনগুলোতে খবরটি চাউর হলে দিনভর আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে ছিল এ দুজনও। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, আকতার, ফারজানার মতো জেলায় কনস্টেবল পদের জন্য মনোনীত হওয়া অধিকাংশই অনুন্নত, পিছিয়ে থাকা গ্রামীণ জনপথের দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়ে। কোন ধরনের তদবির, সুপারিশ ছাড়া মাত্র ১০৩ টাকা খরছে চাকরি পেয়েছেন তারা।
জানা যায়, গত ১ জুন লিখিত পরীক্ষার ফলাফলে ৬১৯ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়। একইদিন উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। গত ২ জুন মনস্তাত্ত্বিক ও মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে ৩৮৬ জনকে টিআরসি হিসাবে নিয়োগ প্রদানের জন্য চুড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। চুড়ান্ত ফলাফলের মধ্যে সাধারণ কোটা (পুরুষ) ৩৩৭ জন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা (পুরুষ) ৪ জন, পুলিশ পোষ্য কোটা (পুরুষ) ২ জন, আনসার ভিডিপি কোটা (পুরুষ) ১ জন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টি কোটা (পুরুষ) ২ জন, সাধারণ কোটা (নারী) ৩৯ জন, পুলিশ পোষ্য কোটা (নারী) ১ জন সহ সর্বমোট ৩৮৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। এছাড়া অপেক্ষামান তালিকায় আরো ৩৭ জনকে রাখা হয়েছে। অপেক্ষামানের মধ্যে সাধারণ কোটা (পুরুষ) ৩৬ জন ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টী কোটা (পুরুষ) ১ জন রয়েছে।
কক্সাবাজার জেলায় ট্রেইনি রিক্রট কনষ্টেবল(টিআরসি) পদে নিয়োগ সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা এবং বিভিন্ন জেলা হতে আগত একজন পুলিশ সুপার ও তিনজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সহ জেলা পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তা এবং কর্মচারীবৃন্দ।
পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বিপিএম জানান, এটি চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছিলাম। নিয়োগে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও সততা রক্ষার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। কতটুকু সফল হয়েছি জানিনা। এটির মূল্যায়ন করবেন জনগণ। তিনি বলেন-যারা টিআরসি হিসাবে চুড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন, তারা স¤পূর্ণ মেধা, যোগ্যতা ও নিয়োগের নীতিমালা অনুসারে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমি কথা দিয়ে কথা রাখার চেষ্টা করেছি। যারা নিয়োগের জন্য চুড়ান্ত হয়েছে তাঁরা বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, দেশপ্রেম, সততা, আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে পুলিশ বাহিনীতে দায়িত্বপালন করবেন বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •