ইব্রাহিম খলিল মামুন:
দুই দশকের ব্যবধানে কক্সবাজারের হ্যাচারিগুলোয় চিংড়ির পোনা উৎপাদন অর্ধেক নেমে এসেছে। প্রত্যাশিত পরিমাণে পোনা উৎপাদন করতে না পেরে লোকসানে বন্ধ হয়ে গেছে ১৫টির মতো হ্যাচারি। আর ভালো পোনার অভাবে কমে যাচ্ছে উপকূলীয় জেলাগুলোয় চিংড়ি উৎপাদন। হ্যাচারি-সংশ্লিষ্টদের দাবি, চোরাইপথে নিম্নমানের পোনা আমদানি, সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার কারণে মা চিংড়ি সংগ্রহ ব্যাহত হওয়া ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের উন্নত পোনা উৎপাদন করতে না পারার কারণে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে চিংড়ি খাত। এদিকে চিংড়ি রফতানি বাড়ানের লক্ষ্যে পোনা উৎপাদনে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ও আলাদা চিংড়ি চাষ জোন স্থাপন করা হচ্ছে বলে জানান মত্স্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কে গড়ে ওঠে ৫৫টির মতো চিংড়ি হ্যাচারি। এসব হ্যাচারি থেকে প্রতি বছর ১ হাজার ৫০০ কোটির বেশি চিংড়ি পোনা চাষের জন্য সরবরাহ করা হতো খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, বাগেরহাট, চকরিয়া ও মহেশখালীতে। কিন্তু নানা সমস্যায় জেলার হ্যাচারিগুলোয় চিংড়ি পোনা উৎপাদন কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে জেলায় সচল রয়েছে ৩০টি হ্যাচারি। বর্তমানে এসব হ্যাচারিতে উৎপাদন হচ্ছে ৭০০ কোটি পোনা।

হ্যাচারি সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের নীতিগত ত্রুটি চিংড়ি পোনা উৎপাদন কমার সবচেয়ে বড় কারণ। এ সুযোগে চোরাইপথে নিম্নমানের পোনা বাজারে ছেয়ে গেছে। এছাড়া উন্নত পোনা উৎপাদনে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অভাবে হ্যাচারিগুলো মার খেয়ে যাচ্ছে। এ কারণে চিংড়ি রফতানিও ধারাবাহিকভাবে কমছে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশ থেকে ৪৭ হাজার ৬৩৫ টন চিংড়ি রফতানি হয়। ওই অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৫৫ কোটি ডলার। এরপর ধারাবাহিকভাবে কমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চিংড়ি রফতানি দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ১৬৮ টন, যা থেকে আয় হয়েছে ৪০ কোটি ৮৭ লাখ ডলার।

কোয়ালিটি হ্যাচারির ব্যবস্থাপক সাগর আহমেদ বলেন, এখন চিংড়ি পোনা উৎপাদনের মূল মৌসুম। কিন্তু সাগরে ৬৫ দিন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এ কারণে মা চিংড়ি আহরণ করতে না পারায় পোনা উৎপাদন করা যাচ্ছে না। যে সময়ে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে, সে সময়ে দুটি সার্কেলে ১৬ কোটি পোনা উৎপাদন করা যেত। কিন্তু এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আমাদের ২ কোটি টাকার বেশি লোকসান হয়েছে।

বেঙ্গল বে হ্যাচারির ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, চাষীদের চাহিদা অনুযায়ী পোনা সরবরাহ করতে পারছি না। কক্সবাজার উপকূল ছাড়াও সাতক্ষীরা, খুলনা ও যশোরে বর্তমানে চিংড়ি পোনা সরবরাহ কম। এতে চিংড়িচাষীরাও বেকায়দায় রয়েছেন। বলাকা হ্যাচারির ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ রুবেল বলেন, কক্সবাজার থেকে ভালো মানের চিংড়ি পোনা সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর ও বাগেরহাটে সরবরাহ করতে না পারায় চাষীরা চোরাইপথে ভারত থেকে আনা নিম্নমানের পোনা কিনছে। ঘেরে ছাড়ার পর এসব পোনা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে মারা যাচ্ছে। ফলে দেশে চিংড়ি উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে চিংড়ি রফতানিতে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ হাঁটছে উল্টো পথে। সামুদ্রিক মত্স্য বিশেষজ্ঞ সামশুল হাদী খান বলেন, প্রতি বছরই চিংড়ি রফতানি বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে আসছে। রফতানি কমার মূল কারণ হলো আমাদের হ্যাচারিতে ভালো মানের চিংড়ি পোনা উৎপাদন কমে গেছে। তিনি আরো বলেন, সরকারের উদাসীনতা, পরিকল্পনার অভাব ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অভাব দিন দিন চিংড়ি রফতানি কমছে। তাই এ খাতকে রক্ষা করতে চাইলে যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে আগাতে হবে। তবেই এ খাত আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

এ ব্যাপারে মত্স্য অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কর্মকর্তা এসএম খালেকুজ্জামান জানান, চিংড়ি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে আলাদা চিংড়ি চাষ জোন করা হচ্ছে। আগামী বছর এ চিংড়ি চাষ জোন চালু হওয়ার পর কক্সবাজারের হ্যাচারিগুলোকেও এর আওতায় আনা হবে। এমনটি করা গেলে মা চিংড়ি ও পোনা উৎপাদন বাড়বে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •