মাদকের বিষাক্ত ছোবল…

-হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর 

আজকের প্রজন্ম আগামী দিনের কর্ণধার। তাদের নিয়ে জাতি স্বপ্ন দেখে সুস্থ সমাজ বিনির্মাণের। কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয়, আজ সেই প্রজন্মের উঠতি বয়সের অনেকেই অনৈতিকতা ও অপসংস্কৃতির ভয়াল ছোবলে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। নানা অপরাধ- অপকর্ম ফেরি করেই চলছে তাদের জীবনযাত্রা। কেবল অপসংস্কৃতির চর্চাই নয়; ইয়াবা, হেরোইন, গাজা, মদসহ নেশা সৃষ্টিকারী প্রবল ক্ষতিকর দ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয় ও সেবন চরম উদ্বেগজনকহারে বেড়ে চলেছে। গত ১২ অক্টোবর’২০১৪ইং দৈনিক ইনকিলাবে “বিপথগামী তরুণ প্রজন্ম” শীর্ষক এক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী “বাংলাদেশে বর্তমানে ৯০ লাখ মাদকাসক্ত। এদের ৯১ শতাংশই কিশোর ও তরুণ। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাদক নিরাময় কেন্দ্র নিউ মুক্তি ক্লিনিকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে মাদকাসক্তের শতকরা ৯০ ভাগ মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ছাত্র- ছাত্রী।”
আরেক জরিপ অনুযায়ী “২০১০ সালে বাংলাদেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ছিল ৪৬ লাখ, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৭০ লাখ৷ ৭০ লাখের মধ্যে ১৫ বছরের বেশি বয়সের মাদকসেবী আছে ৬৩ দশমিক ২৫ শতাংশ৷ তাদের মধ্যে ৭০ ভাগের বয়সই ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে৷”
এভাবে নবপ্রজন্মের বৃহৎ এক অংশ মাদকের করাল গ্রাসে নিমজ্জিত হওয়ায় সমাজ আজ বিষাদের কাল ছায়ায় আচ্ছন্ন। ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা, মানবিক সৌহার্দ- সম্প্রীতি ও পারিবারিক বন্ধন এখন বিপন্ন প্রায়। প্রতিনিয়ত মাদকাসক্তদের হাতে কোন না কোন জায়গায় কেউ না কেউ আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এমনকি মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে মা-বাবা, বাবার হাতে শিশু সন্তান, ভাইয়ের হাতে বোন, বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন হওয়ার মত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনাও ঘটছে। ২০১৩ সালে মাদকাসক্ত ঐশীর হাতে উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা বাবা ও মা নির্মমভাবে খুন হওয়ার ঘটনা যার রাজ সাক্ষী।
শুধু এগুলি নয়; পুরো দেশে প্রায় প্রতিদিন মাদকের এহেন বিষাক্ত থাবায় অহরহ প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। বাড়ছে সামাজিক অপরাধ ও পারিবারিক কলহ। মাদক সেবনের প্রয়োজনীয় খরচ জোগাড় করতে অনেক মাদক সেবনকারীরা চুরি- ছিনতাই, ডাকাতির মত অপরাধও সংঘটিত করছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ ভাষ্যেও এমনটাই ফুটে উঠেছে।
“সমাজ বিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা সামাজিক ও পারিবারিক অপরাধ বৃদ্ধির জন্য প্রধানত দায়ি করেছেন সারা দেশে মাদকের অবাধ বিস্তারকে।” (দৈনিক আমাদের সময়, ১২ অক্টোবর’১৪ইং)। “ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক শিক্ষার অপরিপূর্ণতা, আকাশ সংস্কৃতি, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং নৈতিক শিক্ষার অভাবেই দিন দিন এ সব অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সমাজ বিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে এর ভয়াল থাবা পড়ছে তরুণ তরুণীদের উপর। ফলে ভবিষ্যতের কারিগররা একদিকে যেমন গড়ে উঠছে অনৈতিকতা ও মাদকের উপর ভর করে, তেমনি হ্রাস পাচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতাও।” (দৈনিক ইনকিলাব ১২ অক্টোবর’১৪ইং)। এছাড়াও মাদক শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যও চরম ক্ষতিকর বলে চিকিৎসকদের অভিমত।
মাদকদ্রব্য শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ক্ষতি করে থাকে।
মাদক শেখার ক্ষমতা এবং কাজের দক্ষতা কমিয়ে দেয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তির বিচার-বিবেচনা, ভুল ঠিক বোঝার করার ক্ষমতা হারিয়ে যায়, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। আবেগ নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকেনা।
উগ্র আচরণের জন্ম দেয়।
মানসিক পীড়ন বাড়িয়ে দেয়, আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ব্যাহত হয়।
মাদক মস্তিষ্ক ও শ্বাসযন্ত্রের ক্ষমতা ও শরীরের সূক্ষ্ম অনুভূতি কমিয়ে দেয় এবং স্মৃতি শক্তি কমিয়ে দেয়।
স্বাভাবিক খাদ্য অভ্যাস নষ্ট করে। এইডস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। হৃদরোগ সহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এছাড়াও পরিবারে সৃষ্টি হয় অর্থনৈতিক চাপ।
মাদকের এই বিষাক্ত কুফল থেকে দেশ ও জাতি যাতে নিরাপদ থাকে সেই জন্য সব ধর্মেই মাদক দ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ। মানব জাতির পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান ইসলামে মাদককে শান্তি-সম্প্রীতি বিনষ্টের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করে এর ক্রয়- বিক্রয় ও সেবনকে সমান অপরাধ হিসাবে তুলনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন মজীদে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “অবশ্য শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর যিকির ও নামায থেকে বিরত রাখতে চায়। অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না!” (সূরা মায়িদা, আয়াত ৯১)। মানবতার মুক্তির অগ্রদূত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.) মাদককে সব পাপাচারের চাবি হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। হযরত আবু দারদা (র.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসুল (স.) ইরশাদ করেন, “মদ্যপান করোনা কেননা তা হচ্ছে সকল পাপাচারের চাবি।” (ইবনে মাজাহ)। রাসুলে কারীম (স.) ইরশাদ করেন, “সবধরণের নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্য হারাম।” (ইবনে মাজাহ)। তিনি ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা’আলার ওয়াদা আছে, যে ব্যক্তি নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্য পান করবে আল্লাহ তাকে “তীনাতুল খাবাল” থেকে পান করাবেন। সাহাবীগণ (র.) জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (স.) “তীনাতুল খাবাল” কি? উত্তরে বললেন, তা হচ্ছে দোযখের পুঁজ।” (মুসলিম)
উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়, মাদক শুধু ইহজীবনে নয়; পরজীবনেও ভয়াবহ কুফল বয়ে আনবে।

যেহেতু মাদকাসক্তি একটি জঘন্য সামাজিক ব্যাধি, তাই মাদকের বিষাক্ত ছোবল থেকে প্রজন্মকে বাঁচাতে প্রয়োজন জনগণের সামাজিক আন্দোলন, গণসচেতনতা ও সক্রিয় প্রতিরোধের মাধ্যমে এর প্রতিকার করা সম্ভব। পিতা-মাতা থেকে শুরু করে প্রতিটি বাড়ি – ঘর, পাড়া, মহল্লা, শিক্ষাঙ্গন যার যার অবস্থান থেকে মাদকদ্রব্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে ঘৃণা প্রকাশের আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মাদকদ্রব্যের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তুলতে নিয়মিত সভা-সমিতি, সেমিনার, কর্মশালার আয়োজন করতে হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় বিধিবিধান-সম্পর্কিত শিক্ষামূলক ক্লাস নিতে হবে। সেই সাথে অপসংস্কৃতি ও প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধেও সরকার, পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডল থেকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
সর্বোপরী মাদক নিরাময়ে চাই পরিবারের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতা। ধর্মভীরু পরিবারের পিতা-মাতাই সন্তানকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে পারেন। পিতা-মাতারা যদি তাঁদের ব্যস্ত সময়ের একটা নির্দিষ্ট অংশ সন্তানের জন্য বরাদ্দ রাখেন, তাদের ইসলামের বিধিবিধান ও ধর্মীয় অনুশাসন শিক্ষা দেন, তাদের সঙ্গে সদাচরণ করেন, তাদের জীবনের জটিল সমস্যাবলি সমাধানে অত্যন্ত সচেতন ও মনোযোগী হন, তাহলেই যুবসমাজে মাদকাসক্তির প্রতিরোধ বহুলাংশে সম্ভব। মাদকদ্রব্য পরিত্যাগের ব্যাপারে আসক্ত ব্যক্তিদের স্বভাব বদলে ফেলে ধর্মভীরু ও আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হওয়া দরকার। একই সঙ্গে মাদক প্রতিরোধ করতে হলে ব্যাপক গণসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। অভিভাবক ও মুরব্বিদের নিয়ে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে হবে। মাদকাসক্তি ত্যাগে আসক্তদের উৎসাহিত ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ দলমত-নির্বিশেষে দেশের তিন লাখ মসজিদের ইমাম বা ধর্মীয় নেতাদেরও অগ্রণী ভূমিকা পালন করা বাঞ্ছনীয়।
তথাপি মাদকদ্রব্য উৎপাদন, বিপনন ও সেবন রোধে প্রচলিত আইনের বাস্তব প্রয়োগ ও কঠোর বিধান কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়ে কার্যকর ভাবে অব্যাহত রাখতে হবে।

লেখক-
খতীব
শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউট জামে মসজিদ, কক্সবাজার।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
কক্সবাজার ইসলামী সাহিত্য ও গবেষণা পরিষদ।

সর্বশেষ সংবাদ

ইবোলা সংক্রমণ : বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা

আদালতের প্রশ্নেরও সদুত্তর দিতে পারেননি মিন্নি

কক্সবাজারের সাংবাদিকতার যতকথা (পর্ব-১২)

সৌদিআরবে শাহজাহান চৌধুরীর জন্মদিন পালন

হিন্দু কলেজ ছাত্রীকে কোরান বিলির নির্দেশ ভারতের আদালতের

মিন্নির পাশে কেউ নেই! পুলিশ সুপারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

রুবেল মিয়ার মেজ ভাইয়ের মৃত্যুতে সদর ছাত্রদলের শোক প্রকাশ

হালদা দূষণের অপরাধে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখার নির্দেশ : জরিমানা ২০ লাখ টাকা

তরুণ সাংবাদিক হাফিজের জন্মদিন আজ

চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান সাঈদী’র বরাদ্দ থেকে ১৫০০ পরিবারে চাউল বিতরণ

কলেজ আমার কাছে দ্বিতীয় পরিবার

রামু উপজেলা ছাত্রদল যুগ্ম আহবায়ক সানাউল্লাহ সেলিম কে শোকজ

No more than 2500 Easy Bikes in the city, Acting D.c Ashraf

An awaiting repatriation

25 elites relate to Yaba, SP Masud Hussain

উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই : সড়ক বিভাগের জমিতেই নান্দনিক ৪ লেন সড়ক

কক্সবাজারে এইচএসসিতে পাসের হার ৫৪.৩৯%

নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করতে পারেন কাদের

ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন করবেন যেভাবে

নিমিষেই এনআইডি যাচাই করবে ‘পরিচয়’