বঙ্গোপসাগরে মৎস শিকার নিষেধাজ্ঞার কেনো প্রয়োজন?

ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন

বাংলাদেশর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ আসে মৎস সম্পদ থেকে। এর সাথে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা জড়িত। তবে অতিমাত্রায় বানিজ্যিক মৎস শিকার, ক্ষতিকর জালের ব্যবহার, সমুদ্রের পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইত্যাদির কারনে কেবল সমুদ্রের মাছই নিঃশেষ হচ্ছেনা, মৎস ব্যবসার উপর নির্ভরশীল একটি বিরাট জনসংখ্যা বিপর্যয়ে পড়ছে।

বৈজ্ঞানিক গবেষনায় দেখা গেছে, জলবায়ূ পরিবর্তন সমুদ্রের মৎস প্রজাতির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সমুদ্রজলের উত্তাপ বেড়ে যাওয়ায়, শীত প্রধান মেরু অঞ্চলে সমুদ্রে মৎস উৎপাদন যেমন ক্রমশ বেড়েছে তেমনি গ্রীষ্মপ্রধান দেশে তা কমতে শুরু করেছে। মেরু অঞ্চলের দেশ নরওয়ে, আইসল্যান্ড, রাশিয়া ও আলাস্কায় মাছ উৎপাদন ৩০-৭০ শতাংশ বেড়েছে অন্যদিকে মৎস আরোহনের উপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশে ২০-৪০ শতাংশ কমেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মাছের প্রজনন কাল ও মা মাছের ডিম পাড়ার স্থানেরও পরিবর্তন হচ্ছে।

শিল্প-কারখানা, কৃষি খামার, শহরের ড্রেইনেজ ব্যবস্থা থেকে দূষিত পানি, রাসয়ানিক সার, ও বর্জ্য, বঙ্গোপসাগরের পানিতে এসে মিশছে। ফলে সাগরের পানি অক্সিজেনশূণ্য হচ্ছে; মাছ, বিভিন্ন জাতের প্রাণিকুল, উদ্ভিদরাজি মারা যাচ্ছে। কেমব্রিজ বিশ^বিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৬০ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে অক্সিজেন শূণ্য এলাকা বা “ডেড জোন” সৃষ্টি হয়েছে। এই এলাকার পরিধি ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে। এটা প্রতিরোধে ত্বরিত ব্যবস্থা না নিলে মাছ ও সমুদ্রের বিভিন্ন প্রজাতীর প্রানীর জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।

দেশের সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের সুরক্ষায় বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকায় ৬৫ দিন মাছ শিকার নিষিদ্ধ করেছে সরকার। মাছের প্রজননকাল বিবেচনা করে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ ধরার নৌযান নিয়ে যে কোনো ধরনের মাছ আহরণ বন্ধ থাকবে। উল্লেখ্য, সামুদ্রিক মাছের সংরক্ষণের জন্য প্রজনন সৌসুমে ভারত, মিয়ানমার ও শ্রীলংকার সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাতেও দুই মাসের মত মাছ ধরা বন্ধ থাকে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের কথাই ধরা যাক। সমুদ্রের মাছ সংরক্ষণের জন্য আশি দশক দেশে ভারতে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা চালু রয়েছে। সমুদ্র উপকূলের এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোনের উপর মূলত এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। বিশাল উপকূলবর্তী এলাকা এবং পরিবর্তিত প্রজনন মৌসুম বিবেচনা করে ভারতের পশ্চিম উপকূলে জুন-জুলাই এবং পূর্ব-উপকূলবর্তী এলাকায় এপ্রিল-মে মাসে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সর্বনিম্ন ৪৫ দিন থেকে সর্বোচ্চ ৭৫ দিন পর্যন্ত বলবৎ থাকে।

মাছের প্রজননকাল এবং আহরিত মাছের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বছরে কমপক্ষে দুই মাসের জন্য মাছ ধরা বন্ধ রাখলে বছরের বাকী দিনে তিন থেকে চার গুন বেশী মাছ পাওয়া যায়। এর চেয়ে কম সময়ের মধ্যে মাছ উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। সেই হিসাবে কর্তৃপক্ষের আরোপিত ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা যুক্তিযুক্ত এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর নেয়া পদক্ষেপের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। অনেক সময় বর্ষা মৌসুমে বিরূপ আবহাওয়া উপক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরার জন্য জেলেরা সমুদ্র পাড়ি দেন। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে বহু জেলের জীবন রক্ষা পাবে।

২০১৫ সাল থেকে শুধু ট্রলারের উপরই ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু এবার সব ধরনের নৌযান অর্থাৎ ছোট ফিশিং বোট, ইঞ্জিন চালিত নৌকা, এমনকি দাঁড়বাহি এবং ছোট ডিঙ্গি নৌকাও এর আওতায় পড়েছে। এর ব্যাপ্তিও বাড়ানো হয়েছে, যার মধ্যে দ্বীপাঞ্চল যেমন সন্দ্বীপ চ্যানেল, কুতুবদিয়া এবং মহেশখালী মোহনাও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে।

৬৫ দিনের এই নিষেধাজ্ঞায় ফলে উপার্জনহীন হয়ে যাবার আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ সাগর পাড়ের জেলেরা। এ নিয়ে তারা প্রতিবাদও শুরু করেছেন। জেলেদের অসোন্তষ অমূলক নয়। সমুদ্র অঞ্চরের জেলে পেশার সাথে জড়িত হাজারো পরিবার দৈনিক মাছ ধরে যা আয় করেন তা দিয়েই সংসার চালান। দীর্ঘ দুই মাস কাজ বন্ধ থাকলে তিন বেলা খাবার, সন্তানদের লেখাপড়া সহ সংসারের অন্যান্য খরচ কিভাবে চালাবেন সে নিয়ে তাঁরা শংকিত।

এদিকে সরকার ক্ষতিগ্রস্থ জেলে পারিবারকে ভিজিএফ কার্ডের মাধমে চাল বিতরণ কার্যক্রম চালু করেছে। তবে জেলা মৎস অফিসের তালিকায় নিবন্ধিত জেলেরাই শুধু এই সুবিধা পাবেন। নিবন্ধিত পরিবারকে ৪০ কিলো করে চাল দেয়া হলেও মধ্যস্বত্বভোগীদের জন্য ৩০ কিলোর বেশী চাল জেলেদের কাছে যাচ্ছে না বলে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোড় আসছে। সমুদ্র উপকুলে এমন আরো বহু জেলে রয়েছেন যারা মৎস অফিস কর্তৃক নিবন্ধিত নন। তাদের কি হবে?

মৎস সম্পদ রক্ষার জন্য মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজন রয়েছে। তবে ছোট বড় এমনকি ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত সেটা কর্তৃপক্ষকে একটু খতিয়ে দেখতে হবে। এই নিষেধাজ্ঞা বড় বড় মৎস ব্যবসায়ীদের তেমন কোন ক্ষতি করবে না। তবে বংশ পরাম্পরায় মাছ ধরা এবং বিক্রি সংশ্লিট কাজ করে সংসার চালান এমন হাজারো জেলেরা ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। মাছ ধরা বন্ধ থাকার সময় চাল সরবারাহের পাশাপাশি বহু এলাকায় খাদ্য উপকরণের প্যাকেটও দেয়া হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু তিন বেলার খাবার সরবরাহ করলেই কি সংসারের প্রয়োজন মিটবে? তাদের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে। সমুদ্র উপকূল থেকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নৌকার আকার এবং কি ধরনের জাল ব্যবহার করা যাবে সে সম্পর্কে কিছু শর্ত আরোপ করে এই সব ক্ষুদ্র জেলেদের মাছ শিকার করার অনুমতি দেয়ার কথা কর্তৃপক্ষ ভাবতে পারে। ভারতে মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞার আওতায় সমুদ্র উপকূলের ১২ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে এই ধরনের ছাড় দেয়া হয়েছে।

অত্যধিক বানিজ্যিক মৎস শিকারের পাশাপাশি বহু রকমের ক্ষতিকর জালের ব্যবহার মাছের বংশ বৃদ্ধির প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো হচ্ছে মশারী জাল, কারেন্ট জাল, সিমফ্রাই জাল, চরঘেরা ইত্যাদি। তবে চিংড়ীর পোনা সংগ্রহের জন্য মশারী জালের অবাধ ব্যবহারের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে টেকনাফ উপকূলের মৎস সম্পদ এবং জীব বৈচিত্র। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে এই ধরনের জাল। চিংড়ী সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সমুদ্র উপকূলে এসে ডিম ছাড়ে। উপকূলের অগভীর জলে পোনাগুলো বড় হতে থাকে। চিংড়ীর পোনা ব্যবসায়ীরা সেগুলো ধরার জন্য মশারী জাল বসায়। মাত্র দৈনিক ৮০-১০০ টাকার বিনিময়ে অনেক জেলে পোনা আহরণের কাজ করে। মশারী জালে চিংড়ির সাথে নানা জাতের মাছের পোনা ও সামুদ্রিক প্রাণীর লার্ভাও মারা পড়ে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউ পরিচালিত এক জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, পোনা সংগ্রহকারীরা একটি গলদা চিংড়ির পোনা ধরতে গিয়ে ধ্বংস করছে ৩৮টি ভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি, ছয় প্রজাতির অন্য মাছ ও ১০০ প্রজাতির জলজ প্রাণীর পোনা বা লার্ভা। এছাড়া ঠেলা জালে ধরা পড়া চিংড়ীর পোনা আলাদা করে বাদবাকি পোনা ও লার্ভা সমুদ্র সৈকতে ফেলে দেয় জেলেরা। এভাবে নষ্ট হচ্ছে শয়ে শয়ে মূল্যবান ইলিশের ডিম। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ এবং অন্য প্রজাতির মাছকে বাঁচাতে হলে মোহনার কাছে বা অগভীর সমুদ্রে ট্রল নেট এবং চিংড়ি চাষে ব্যবহৃত মশারী ও মহেন্দি জাল নিষিদ্ধ করতে হবে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যাতে জেলেরা এই ধরণের জাল ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ ও ইকো সিস্টেমের উপর এ পর্যন্ত যেসব গবেষণা ও জরীপ চালানো হয়েছে, তা খুবই সীমিত ও অপর্যাপ্ত। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মাছের বিচরণ ও প্রজননস্থল চিহিৃত করে তা সুরক্ষিত করার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বিশদ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এর ফলে আমাদের সমুদ্রে কি কি প্রজাতির ও কত পরিমান আছে তা জানা যাবে। উপরোন্তু, কখন, কোথায় এবং কতদিন পর্যন্ত মাছ শিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া অনেক সহজ হবে।

(লেখকঃ কাতার সরকারের নগর পকিল্পনাবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, কক্সবাজার শহরের বাহারছড়ার কৃতি সন্তান)

সর্বশেষ সংবাদ

চকরিয়ায় শিশু ওয়াসী খুনের মামলার চার্জসিট ৬মাসেও দাখিল হয়নি

চকরিয়ায় এক স্কুল ছাত্র পেকুয়া থেকে ৩দিন ধরে নিখোঁজ

কক্সবাজার পরিবেশ ও মানবাধিকার উন্নয়ন ফোরামের ৫ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

কক্সবাজার সিটি কলেজে ব্লাড গ্রুপ নির্ণয় ও ব্লাড ডোনেটিং ক্যাম্প সম্পন্ন

কক্সবাজার সদর হাসপাতালকে ৫ শ’ শয্যায় উন্নীত করা হবে : স্বাস্থ্য মন্ত্রী জাহিদ

চট্টগ্রামে কলোনীতে আগুন লেগে মা-মেয়ের মৃত্যু

উখিয়ার বিশিষ্ট ঠিকাদার শাকের উদ্দিনের পিতা আর নেই

উখিয়ায় র‌্যাবের বিশেষ অভিযানে ইয়াবাসহ আটক ২

লামায় তাজিংডং ফুটবল টুর্ণামেন্টের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত

মহেশখালীতে ছাত্রলীগের আয়োজনে বঙ্গবন্ধু গোন্ডকাপ ফুটবল টূর্নামেন্ট শুরু

শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভুয়া ও নকল লাইসেন্সধারী টমটম

মেধু বড়ুয়ার পিতার মৃত্যুতে জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের শোক

জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় আটক হলো মাদক ব্যবসায়ী দম্পতি

জেলা ছাত্রদলের শোকজ নোটিশের জবাব দিলেন মোঃ সানাউল্লাহ সেলিম

মাঝ সমুদ্রে পড়ে গেলেন প্রিয়াঙ্কা!

১৫ দিনের ভারী বর্ষণে ৫০ হাজার রোহিঙ্গা ক্ষতিগ্রস্ত, পাহাড়ধস ঠেকাতে ‘সেফ প্লাস’ কর্মসূচি

হাসতে হাসতে ২৫ ছাত্রী অজ্ঞান!

প্রতি কেজি পেঁয়াজ ১৬ টাকায় বিক্রি!

সাম্প্রতিক খুন-ধর্ষণের ঘটনা বিএনপি-জামায়াতের নিখুঁত ষড়যন্ত্র: আইনমন্ত্রী

নাইক্ষ্যংছড়ি হাজী এম এ কালাম ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক আব্দুস সাত্তারের স্মরণ সভা