কক্সবাজারের সাংবাদিকতার যতকথা (পর্ব-অষ্টম)

আজাদ মনসুর

সংবাপত্র কাগজে কলমে শিল্প হলেও এটির এক তৃতীয়াংশের বেশি এই শিল্পের সাথে জড়িত লোকেরা সুবিধা পাচ্ছেন না। যদিও কিছু কিছু সংবাদপত্রে বিপুল খরচ, অধিক লোকবল, বেতন-ভাতার চাপ, বিজ্ঞাপন নির্ভরতাসহ নানা কারণে অনলাইন ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার প্রসারের কারণে উন্নত বিশ্বে এখন ছাপানো পত্রিকা প্রকাশনা হ্রাস পাচ্ছে। আর এ জন্য উন্নত দেশগুলোতে মিডিয়ায় বিনিয়োগকারী বা প্রকাশ করা ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া তথা টেলিভিশন বা অনলাইনের দিকে ঝুঁকছেন। আবার বাংলাদেশও দেখছি ওই চর্চায় হাঁটছে। তবে এই বাংলায় সংবাদপত্র শিল্প কমে যাওয়ার ছোঁয়া লাগেনি মোটেও। তবুও কেন বেতন-ভাতাদি আর বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত সাংবাদিকবৃন্দ? এ কথা আগেও একবার বলেছি। এ বিষয়ে পরের অন্য কোন পর্বে ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতনকাঠামো নিয়ে কথা হবে। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়েও আমার ধারাবাহিক পর্বে মূল্যায়ন আসা বাঞ্চনীয়। কক্সবাজারের সাংবাদিকতার যতকথার আজকের অষ্টম পর্ব।
যদি বলি দিনদিন বেড়েই চলছে প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক্স সংবাদ মাধ্যম। তাই এখনো দৈনিক পত্রিকা এখানে বেশ জনপ্রিয়। টেলিভিশন বা অনলাইন পত্রিকা নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে তুলনামূলকভাবে ছাপানো সংবাদপত্রের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। তবে যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সাংবাদিকতার সামনে কিছু নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে বা হবে নিশ্চিত।
সাংবাদিকদের রিপোর্ট তৈরির যে ফাইভ ডব্লিউ ওয়ান এইচ ফর্মুলা, সেই ফর্মুলা এখন চলছে না। কারণ, এই ডিজিটাল যুগে কী, কখন, কোথায়, কিভাবে, ঘটনা ঘটছে তা খুব তাড়াতাড়ি ইন্টারনেট ও টিভির মাধ্যমে দ্রুত সবাই জেনে যাচ্ছেন। সকালবেলায় পত্রিকা পাঠকের কাছে সেটা পুরনো বা বাসি খবর। তাই এই বিষয়টি সাংবাদিকতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। লিখতে হলে পড়তে হবে। জানতে হলে পড়তে হবে। পড়ার কোন বিকল্প নেই বৈকি।
কারণ, যে তথ্য জানা হয়ে গেছে, সাংবাদিকদের কাছ থেকে তা আর জানতে চাইবে না, বাড়তি কিছু চাইবে। এটা আমরা জানি। পাঠককে নতুন কিছু দিতে ঘটনার বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধান চালাতে হবে। যে তথ্যগুলো এখনো পাঠক জানেনা, ঘটনার ভিতরের সবগুলো বের করে আনতে হবে। শুধু তথ্য দিলে হবে না, তথ্যগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে, ব্যাখ্যা দিতে হবে। কথা বলতে হবে ঘটনার ভেতরের-বাইরের, চারপাশের পক্ষের-বিপক্ষের মানুষের সঙ্গে, নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে। এখন সাংবাদিকতাকে হতে হবে বিশ্লেষণী ও ব্যাখ্যামূলক। এখন বুঝতেই পারছেন। অনেক সাংবাদিকরাও এ বিষয়ে অবগত। প্রতিটা খবরই হতে হবে অনুসন্ধানমূলক।
সাংবাদিকদের আশা করা ঠিক নয় যে, সব পাঠক সব বিষয়ে আগ্রহী হবে। এটা বলার যুক্তিকতাও রয়েছে। পাঠক, অধিকাংশ পাঠকের সিরিয়াস বিষয়ে আগ্রহ কম থাকে। তাই প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে দরকার আধুনিক শিক্ষা ও চিন্তা-চেতনা সমৃদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রগামী সাংবাদিক। যারা সব সময় তথ্য ও তত্ত্বে এগিয়ে থাকবেন, ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করবেন, তথ্যের প্রমাণ ও অনুসন্ধানে সদা ব্যস্ত থাকবেন। শিক্ষিত মার্জিত ও নিষ্ঠাবান ভালো সাংবাদিক ছাড়া ভালো সংবাদপত্র হবে না। কিন্তু এখনো আমাদের সমাজে সৎ, শিক্ষিত ও ভালো সাংবাদিকের বড়ই অভাব। ভালো সাংবাদিক বেশি দরকার, যারা সবকিছু ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করবেন, সঠিক তথ্য ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তুলে আনবেন।
আসলে সংবাদমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সৎ, সত্যনিষ্ঠ, পক্ষপাতমুক্ত সাংবাদিকতা। সংবাদপত্রকে প্রমাণ করতে হবে কারও প্রতি পক্ষপাত নেই, কারও বিরুদ্ধে বা কারও পক্ষে কোনো অ্যাজেন্ডা নেই। সেটা সম্ভব হলেই সর্বস্তরের পাঠক সেই পত্রিকাকে গ্রহণ করবেন। গণমাধ্যমকে সব সময় মনে রাখতে হবে, সেই অন্যকে সুন্দর ও সঠিক পথে প্রভাবিত করবে। কিন্তু নিজে কখনো ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হবে না। অন্যায়-অসত্যের কাছে নত স্বীকার করবে না। অধিকাংশ গণমাধ্যমের পক্ষে এই কাজটা খুব কঠিন।
কারণ, গণমাধ্যমের সঙ্গে ক্ষমতাবানের স্বার্থ থাকে জড়িত। কিন্তু সেটাকে অতিক্রম করে সংবাদপত্রকে পাঠকের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে হয়। অনুপ্রেরণা জোগাতে হয়। তাই বিরুদ্ধ পরিবেশেও সংবাদপত্রকে শক্ত হয়ে জনতার পক্ষে দাঁড়াতে হয়। জনমত গড়তে হয়। রাষ্ট্র বা সরকার জনমতের কাছে নত হয়। তাই জনতার স্বার্থে সংবাদপত্র ও সাংবাদিককে এগোতে হয় অবিরাম, অবিরত। দেশ-বিদেশের নানা ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে জানার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম সংবাদপত্র। ১৭৮০ সাল থেকে যাত্রা শুরু করে আজ পর্যন্ত পাড়ি দিতে হয়েছে নানা চড়াই-উতরাই। শিক্ষিত মার্জিত ও নিষ্ঠাবান ভালো সাংবাদিক ছাড়া ভালো সংবাদপত্র হবে না মর্মে আগেই আপনাদের সাথে যুক্ত হয়েছি। কিন্তু কথা হচ্ছে গণমাধ্যমগুলো শিক্ষিত, মার্জিত, স্মার্ট ও নিষ্ঠাবান ভালো সাংবাদিক তারা নিয়োগ না দেয়ার কারণ কি?
যদি পত্রিকাগুলোতে ভাল মানের শিক্ষিত সাংবাদিক নিয়োগ দেয়া হয় অবশ্যই তাদের বেতন/ভাতাদি ছাড়াও অন্যান্য সুবিধাদি পাবেন এটা যেমন সত্য আবার পত্রিকাগুলোর কোয়ালিটি ও মানে পাঠক সমাজে আলাদা ভাবে আলোকিত হবে এটাও সত্যি। তাহলে কক্সবাজারসহ সারা দেশে শত শত সংবাদপত্রের মধ্যে ক’য়টি সংবাদপত্রে কোয়ালিটির মানসিকতা রয়েছে? কক্সবাজারে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোতে পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল আর ক’য়টি ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার কয়েকজন সাংবাদিক ছাড়া এক তৃতীয়াংশেরও বেশি সাংবাদিকের একাডেমীক যোগ্যতা নেই। কিন্তু আজ তারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে সবখানে দাপিয়ে চলছে। এটা তাদের কোয়ালিটি বলতে পারেন।
পাঠক, আমি কোন সাংবাদিকের একাডেমীক যোগ্যতা সম্পর্কে জানিনা বললে ভুল করবেন। যখন কক্সবাজার সাংবাদিক কোষ প্রকাশের জন্য সাংবাদিকদের কাছ থেকে তথ্য আহবান করি। তখন অনেকের পাঠানো তথ্যগুলো দেখে অভাগ হয়েছি। সেখানে দেখলাম অষ্টম শ্রেণি পাশ কিন্তু উল্লেখ করেছেন এইচ.এস.সি ও ¯œাতক। কিছু করার ছিলনা। আমার চাহিত তথ্য বিবরণীর ফরম পূরণ করেছেন এরা। ভুল হলেও একাডেমীক যোগ্যতা ভুলই ছাপিয়েছি। অনেকে এটা নিয়ে আলোচনা করেছেন। কিন্তু আমার পরের সংস্করণে কক্সবাজার সাংবাদিক কোষে প্রত্যেক সাংবাদিকের একাডেমীক স্ট্যাটাস মূল্যায়ন করা হবে।
যারা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে তারা বের করেছে স্নাতক পর্যায়ের সার্টিফিকেট। আর ওই জাল সার্টিফিকেটধারী সাংবাদিকরা যখন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত হতে স্থানীয়, জাতীয় ও ইলেকট্রনিক্স গণমাধ্যমের অফিসে সিভি ও একাডেমীক কাগজপত্র পাঠান তখন কর্তাবাবুরা তো ওইসব কাগজপত্র মূল্যায়ন বা অনলাইন ভেরিফিকেশন করেন না। বিশেষ করে ঢাকার যে কোন গণমাধ্যমের অফিসে ডেস্ক পর্যায়ে একাডেমীক কোয়ালিটি সম্পন্ন সাংবাদিক থাকলেও মাঠ পর্যায়ে সাংবাদিক নিয়োগ দিতে তারা মোটেও একাডেমীক কোয়ালিটি দেখেন না। আনুষ্ঠানিকতার দিক দিয়ে কাগজপত্র পাঠালেও তাদের কাছে টাকাই সব। যে টাকা দিবে তার নিয়োগ হবে। এছাড়াও টিভি সাংবাদিকদের তো কথায় নেই।
‘ক’ একজন সাংবাদিক আবুল টিভির সাংবাদিক কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। ‘খ’ যদি কোনভাবে ‘ক’ এর চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে কর্তাবাবুকে সন্তুষ্ট করতে পারেন তাহলে কাল থেকে ‘খ’ ই তো আবুল টিভির সাংবাদিক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে গেলো। এভাবেই চলছে স্থানীয়, জাতীয় ও ইলেকট্রনিক্স গণমাধ্যমের অবস্থা। এখানে সংগত কারণে টিভি সাংবাদিকতার কিঞ্চিত প্রকাশ করা হলো। টিভি সাংবাদিকতা নিয়ে একটি পর্ব আগামীতে প্রকাশ করার কথা দিয়েছিলাম অবশ্যই অন্য কোন পর্বে প্রকাশ করা হবে। আসলে কিছু কিছু গণমাধ্যম কোয়ান্টিটি বুঝে, কোয়ালিটি বুঝে না। ভাল কিছু সংখ্যায় কম হোক তারপরও পরিপূর্ণতার দিক দিয়ে কয়েকটি শ্রেণির গণমাধ্যম যদি আমাদের পরিবর্তন আনে? চলবে…

আজাদ মনসুর (এম.এ, এলএল.বি) শেষবর্ষ
আইটি স্পেশালিষ্ট, প্রণেতা-কক্সবাজার সাংবাদিক কোষ, সভাপতি-কক্সবাজার সাংবাদিক সংসদ (সিএসএস)
[email protected] ০১৮৪৫-৬৯ ৫৯ ১৬

সর্বশেষ সংবাদ

কক্সবাজারের সন্তান ব্যারিস্টার নওরোজ চৌধুরী ডেপুটি এটর্নি জেনারেল হলেন

চকরিয়ায় বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধার উপর সন্ত্রাসী হামলা

জলদাশ পাড়ায় শ্মশান নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা সমাধানে এগিয়ে গেলেন এমপি কমল

বন্যায় দূর্গত মানুষের পাশে নেই বিএনপি নেতা কর্মীরা- রেজাউল করিম

চীনের মাটিতে শিক্ষাজীবন ও নতুন অভিজ্ঞতা

খুটাখালী থেকে অপহৃত জসিম ফিরেছে, আনসার কমান্ডার গিয়াসের খোঁজ নেই

‘পর্যটন শহর কক্সবাজারকে আধুনিকীকরণ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা

চকরিয়ায় স্কুলছাত্রী ধর্ষনের ঘটনায় ৫ জনকে আসামী করে মামলা

পেকুয়ায় স্কুলছাত্র নিখোঁজ

ইউনিয়ন পরিষদ উপ-নির্বাচনে নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত করুন : জেলা আওয়ামী লীগ

মানব কল্যাণ ও সাংবাদিকতা!

পরিবারকল্যান কর্মীদের পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে : এডিএম শাজাহান আলি

কক্সবাজার জেলা ছাত্রদল এর ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

ব্যারিস্টার সুমনের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি

ফাঁসিয়াখালী, বড়ঘোপ ও হ্নীলায় বৃহস্পতিবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা

যশোরের শার্শায় প্রসূতি নারীর তিন পুত্র সন্তানের জন্ম

একাই দুই ছিনতাইকারী ধরে পুলিশে দিলেন সাংবাদিক

চকরিয়ায় অপহরণের ৭ দিন পর স্কুল ছাত্র উদ্ধার

ওলামা লীগ বিলুপ্তির পথে?

দেশ ছেড়ে কোথাও যাবেন না, জানালেন প্রিয়া সাহা