মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

দুর্নীতির তফসিলভুক্ত সব ধরনের অপরাধের মামলা এখন সরাসরি দুদক কার্যালয়ে করতে হবে। আর থানায় করা যাবে না। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এর দেশের ২২ টি দফতরে এ মামলা দায়ের করতে হবে। এমনকি কেউ যদি থানায় দুর্নীতির অভিযোগ করেন, সেক্ষেত্রে পুলিশ সেটি শুধুমাত্র সাধারণ ডায়েরি হিসেবে রেকর্ড করে তা দুদকের কাছে পাঠিয়ে দেবে। শুধু তাই নয়, দুদক চাইলে গুরুত্ব বিবেচনায় যে কোনো অভিযোগ দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান না করে সরাসরি মামলা করতে পারবে। এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে সম্প্রতি দুদক আইনের সংশোধিত বিধিমালা অনুমোদন পূর্বক গত ২০ জুন বৃহস্পতিবার গেজেট প্রকাশ করেছে। দুদকের গণসংযোগ বিভাগের পরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য সিবিএন-কে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এতে দুদক আইনে মামলা দায়েরের বিষয়ে পুলিশী থানার ক্ষমতা খর্ব করা হলো।
প্রণব কুমার ভট্টাচার্য জানান-সংশোধিত বিধিমালার গেজেট মতে, করদাতার আয়কর রিটার্ন ফাইল ও ব্যাংক হিসাব সরাসরি তলব করতে পারবে দুদক। এছাড়া মামলা বা রায় হওয়ার আগে এমনকি মামলার আগেও সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজের সম্পদ ক্রোক বা ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) করা যাবে। আর দুদকের অনুসন্ধান সংক্রান্ত বিদ্যমান সময়সীমা হবে ১৫ দিনের পরিবর্তে ৪৫ দিন করা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে না দিয়ে সরাসরি বিশেষ জজ আদালতে দুর্নীতি মামলার চার্জশিট দাখিল করা যাবে। দুদকের নিজস্ব হাজতখানাও রয়েছে।

কমিশনের সিদ্ধান্তে দুদকের সংশোধিত বিধিমালাটির খসড়া করেছিলেন দুদক থেকে সদ্য পিআরএল-এ যাওয়া মহাপরিচালক (আইন) মঈদুল ইসলাম। সংশোধিত নতুন বিধির বিষয়ে তিনি যুগান্তরকে বলেন, দুদক আইনের উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে অসম্পূর্ণ বিধিটি পূর্ণাঙ্গ করার জন্য কাজ করেছি। অবশেষে সেটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল। যে নতুন বিধি হয়েছে তা যদি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিপালন করা হয় তাহলে দুর্নীতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও দমন করা সম্ভব। তিনি বলেন, থানায় মামলা করতে গেলে হয়রানির সুযোগ ছিল তা দূর হল।
যে কেউ গিয়ে এখন আর যে কারও বিরুদ্ধে থানায় একটা দুর্নীতির মামলা ঠুকে দিতে পারবে না। পুলিশ দুর্নীতি সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পেলে সেটি জিডি এন্ট্রি করে অনুসন্ধানের জন্য দুদকে পাঠাবে। এ ছাড়া দুদকে এসে যদি কেউ দুর্নীতির অভিযোগ করেন এবং সেই অভিযোগ থেকেই যদি দুর্নীতির সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে সরাসরি অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করে তদন্ত শুরু করা যাবে। বিদ্যমান বিধিতে এ সুযোগটি ছিল না।
এ কারণে সময়, অর্থ ও জনবল সবই বেশি পরিমাণ ব্যয় করতে হতো অনুসন্ধানের পেছনে। বর্তমান বিধির আলোকে সরাসরি মামলা হলে কমিশনের কাজে গতি বাড়বে।
মঈদুল ইসলাম আরও বলেন, যে কোনো অভিযোগের সারবস্তু থাকলে যেমন সরাসরি অনুসন্ধান ছাড়াই মামলা করা যাবে, আবার কোনো কোনো অভিযোগ সর্বোচ্চ ৪৫ দিনে অনুসন্ধান শেষ করে দুদক কার্যালয়ে মামলা করতে আর কোনো বাধা থাকবে না। নতুন বিধি অনুযায়ী মামলার আগে বা পরে যদি কারও অপরাধলব্ধ সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা যায়, তাহলে দুর্নীতিবাজদের শক্তি কমবে।
অপরদিকে, দুদকের শক্তি বাড়বে। নতুন বিধির মধ্য দিয়ে এমনিতেও দুদকের ক্ষমতা অনেকাংশে বাড়ছে। তিনি জানান, কোনো আসামির বিরুদ্ধে বিচার চলাকালীন যদি ওই আসামি মারা যান এ অবস্থায়ও তার দুর্নীতিলব্ধ সম্পদ ক্রোক বা জব্দ করা থাকবে। আসামি মারা গেলে তার বিচার চলে না। তবে তার সম্পদের কী হবে সে বিষয়টি দুই পক্ষের আইনজীবীদের শুনানি নিয়ে বিচারক যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটাই চূড়ান্ত। রায়ে সিদ্ধান্ত হবে-ওই সম্পদ মৃত ব্যক্তির পরিবার পাবে নাকি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে। ফৌজদারি কার্যবিধি, দুদক আইন ও বিধি অনুসরণ করে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তারা থানায় হাজির হয়ে দুর্নীতির মামলা দায়ের করে থাকেন। কিন্তু দুদক মনে করছে, তারা স্বশাসিত স্বাধীন সংস্থা। এ সংস্থার পক্ষ থেকে দুর্নীতির মামলা দায়েরের জন্য থানায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু করে যে কোনো জেলা কার্যালয়ে এ মামলা করা যাবে। দুদকে এজাহার দায়েরের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে দুদকের বিধিমালায় বলা হয়, ‘২০০৪ সালের আইন অনুযায়ী দুদক স্বাধীন। এ সংস্থার নিজস্ব অনুসন্ধান ও তদন্তকারী কর্মকর্তা আছে।
মামলা পরিচালনার জন্য আছে নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট। দুদকের তফসিলভুক্ত যে কোনো অপরাধের জন্য থানায় এজাহার দায়ের বা থানার প্রতি মুখাপেক্ষী থাকা কমিশনের স্বাধীন ও স্বশাসিত সত্তার পরিপন্থী। এ ছাড়া থানায় এজাহার দায়েরের অবাধ সুযোগ থাকায় অযথা হয়রানির আশঙ্কাও থাকে।’ এতে আরও বলা হয়, ‘দুদক বনাম মহীউদ্দীন খান আলমগীর’ মামলায় দুদকে এজাহার দায়েরের কথা আপিল বিভাগের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে। অন্যদিকে ২০০৭ সালের বিধিমালার ২ (ছ) ধারায়ও দুদক কার্যালয়ে দুর্নীতি মামলার এজাহার দায়েরের সুযোগ ছিল। কিন্তু বিধিতে সংশোধনী না আনায় কাজটা এতদিন করা সম্ভব হয়নি।’
এদিকে বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী, দুদক আসামিদের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশিট দিয়ে আসছে দুদক। কিন্তু এতে নানা ধরনের আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। চার্জশিট দাখিলের পর কখনও তা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পড়ে থাকে। শুনানির নামে সময়ক্ষেপণ হয়। সেখান থেকে বিচারিক আদালতে যেতেও অনেক সময় পার হয়। সে কারণে নতুন বিধিতে চার্জশিট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দাখিল না করে সরাসরি সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে দাখিলের সুযোগ পাচ্ছে দুদক। দুদকের সংশোধনীতে বলা হয়, চার্জশিট সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে দাখিলের জন্য বিধান সুস্পষ্ট না থাকলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। দুদকের বিধিতে ‘জ্ঞাত আয়’ সম্পর্কিত সংজ্ঞা না থাকায় তা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার কার্যক্রম তদারক করা, তদারককারী কর্মকর্তা ও তার দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দেয়ার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া কমিশনে তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের বিধি করা বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে আদালতে কেউ দুর্নীতির মামলা করলে তা গ্রহণ ও তদন্তের নির্দেশ দিতে সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতকে ক্ষমতা দেয়াসহ বেশ কিছু বিষয়ে সংশোধনী আনা হয়েছে। বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী কাউকে সম্পদের হিসাব দিতে নোটিশ জারির সাত কার্যদিবসের মধ্যে তাকে দুদকের নির্দিষ্ট ছকে হিসাব বিবরণী দাখিল করতে হয়।
এই সময়সীমা (৭ কার্যদিবসের পরিবর্তে) ২০ কার্যদিবস করার প্রস্তাব বিধিতে অনুমোদন করা হয়েছে। ২০ কার্যদিবসেও যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার সম্পদ ও দায়দেনার হিসাব দিতে না পারেন, তবে এর জন্য আরও ১০ কার্যদিবস চেয়ে দুদকে আবেদন করার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ নোটিশ পাওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও দায়দেনার হিসাব দিতে পারবেন। এ ছাড়া সংশোধিত বিধির আলোকে দুদক যে কারও দুর্নীতির অনুসন্ধান বা তদন্তকালে করদাতার আয়কর রিটার্ন ফাইল এবং ব্যাংক হিসাব তলবের ক্ষমতা পেয়েছে। যদিও এনবিআর ও ব্যাংকিং সেক্টর থেকে এ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানানো হয়েছিল তবে শব্দগত কিছু পরিবর্তন ছাড়া দুদকের প্রস্তাবই অনুমোদন করা হয়েছে।
দুদকের সংশোধিত বিধিমালায় বলা হয়েছে, অনুসন্ধান বা তদন্তকাজে নিয়োজিত কমিশনের অনুসন্ধানকারী বা তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রয়োজনে ব্যাংকার্স মুদ্রণ (ব্যাংকার্স বুক এভিডেন্স আইন, ১৮৯১) বা আয়কর অফিস থেকে করদাতার আয়কর রিটার্ন, বিবরণীর হিসাব, সাক্ষ্যপ্রমাণ, অ্যাসেসমেন্ট নথি উদ্ঘাটন বা পরীক্ষা বা জব্দ বা তলব করতে পারবে। এক্ষেত্রে অন্য কোনো আইনের বিধান বাধা হবে না। যদিও এনবিআর থেকে লিখিতভাবে আইন মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছিল- আয়কর অধ্যাদেশের ১৬৩ ধারায় করদাতার বিবৃতি, রিটার্ন গোপনীয় রাখার কথা বলা আছে।
এ ধারায় বলা আছে, সাক্ষ্য আইন বা বর্তমানে কার্যকর অন্য আইনে যা-ই থাকুক না কেন কোনো আদালত বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ আয়কর অধ্যাদেশের অধীনে পরিচালিত কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেকর্ড বা কোনো রিটার্ন, হিসাব-বহি বা দলিলপত্রের অংশবিশেষ সাক্ষ্য প্রদানার্থে তলব করার ক্ষমতা প্রদান করবে না। অর্থাৎ করদাতার রিটার্নের তথ্য অতি গোপনীয় বিষয়, বিশেষ ক্ষেত্র ব্যতীত এটি কোনো দফতর চাইতে পারবেনা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •