সাধারণ জনগণের চাওয়া পাওয়া সীমিত। তারা উচ্চাকাঙ্ক্ষা করে না। তারা চাই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় ক্ষমতা হাতের নাগালে, কৃষক চাই তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম, অবিভাবকরা চায় তার সন্তান নিরাপত্তায় স্কুলে গিয়ে আবার ফিরে আসুক, নারীরা চাই রাস্তায় নিরাপদ ভাবে চলাফেরা ও ইভটিজিং মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা, চাকরি প্রার্থীরা চাই ঘুষ মুক্ত চাকরি, সাধারন জনগন চাই প্রশাসনের যে কোন কাজ দুর্নীতি মুক্ত এবং অপরাধের সুষ্ঠু ন্যায় বিচার। যে কোন রাষ্ট্রের সুশাসনই পারে এই দাবিগুলো পূরণ করতে হয়। রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন দলই পারে সুশাসন নিশ্চিত করতে। তার সাথে সাধারণ জনগণের সচেতনতা অবশ্যই প্রয়োজন।

সুশাসন হলো একটি কাঙ্খিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিফলন। সময়ের প্রয়োজনে এবং শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের ভিত্তিতে কোনো দেশের শাসন পদ্ধতির বিবর্তন হয়ে থাকে। শাসিতের কাম্য শুধু শাসন নয়, সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক শাসন- যাকে আমরা সুশাসন বলতে পারি। সরকারের জবাবদিহিতা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক স্বচ্ছতায় আমরা বুঝি সুশাসন।

সুশাসনের বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে- স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্যতা, স্বাধীন প্রচার মাধ্যমে, দুর্নীতিমুক্ত অংশগ্রহণমূলক, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জনবান্ধব প্রশাসন, জীবন ঘনিষ্ঠ ও কল্যাণমূলক, সমতা, জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্যতা,
দক্ষতা। যে রাষ্ট্র বা সমাজ যত বেশি সুশাসন দ্বারা পরিচালিত হয় সেই রাষ্ট্র বা সমাজ ততো বেশি অগ্রগতির দিকে ধাবিত হয়।

কোন দেশের সুশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো দুর্নীতি দমন। দুর্নীতি জাতীয় সম্পদের সঠিক বণ্টনে বাধা প্রদান করে এবং ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অবশ্যই দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

সুশাসন প্রতিষ্ঠার আরেকটি অন্যতম বাধা হলো নাগরিকদের সচেতনতার অভাব। নাগরিকগণ যদি তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হয় তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না। সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় উপাদান যেমন আইনের শাসন, মানবাধিকার সংরক্ষণ, সমাজের সকল স্তরে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা, সমাজের সকল শ্রেণীর প্রতি ন্যায়পরায়ণতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা চর্চা প্রভৃতির কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য দরকার নাগরিক সচেতনতা।

স্বাধীনতা পরবর্তী আজ অবধি প্রতিটি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র ক্ষমতা আঁকড়ে ধরা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। জনগণের চিন্তা কিংবা সুশাসনের নিশ্চয়তাই কারো মাথা ব্যাথা নেই। আমার দেখা সুশাসন দুই বছর (২০০৭-২০০৯) সাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ এর আমলে আইনের শাসন ছিল। এক কথায় যাকে বলে সুশাসন। যদিও নির্বাচিত সরকার নয় তবুও এ ব্যাপারে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। সরকারি সকল দপ্তর, পুলিশ, বিচার বিভাগ সবকিছুর মধ্যে ছিল জবাবদিহিতা। রাস্তাঘাটে নারীরা ভয়হীন ভাবে চলাফেরা করতে পেরেছে ,সড়ক পরিবহন অরাজগতা সৃষ্টি হয়নি, চাঁদাবাজি হয়নি ,টেন্ডারবাজি হয়নি ,চাকরির জন্য ঘুষ বাণিজ্য হয়নি,সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হয়নি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত কিংবা পেশি শক্তিধর কালোবাজারিরা কোন অপকর্ম করতে পারেনি। এক কথায় বলতে গেলে স্বাধীনতার পরবর্তী এ পর্যন্ত ঐ দুই বছর ছিল জনগণের স্বস্তি ও সুশাসনের বছর। ঘুষখোর সরকারি কর্মকর্তারা ছিল সব সময় আতঙ্কিত। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে দলের স্বার্থ নয় জনগণের স্বার্থই মূখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবার আসুক আমরা তা চাই না। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছরের রাষ্ট্র পরিচালনায় কর্মক্ষমতা ও সফলতা তো আমরা অনুসরণ করতে পারি। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহিতায় একটি রাষ্ট্রের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

নিবেদক
শ্রীধর দত্ত

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •