শাহেদ মিজান, সিবিএন:

মনিষীরা বলেছেন- বই হচ্ছে সব থেকে বড় বন্ধু। বই অকৃত্রিম বন্ধু। বই শুধু দিয়েই যায়, কখনো তার বদলা বা প্রতিদান চায় না। যারা বই পড়ে তারাই হয়ে উঠেন সত্যিকারের মানবিকতা সম্পন্ন মানুষ। তাই তথ্য-প্রযুক্তির এই দাপটের যুগেও এখনো বইয়ের কদর কমেনি। বইপ্রেমী মানুষগুলো এখনো ছুটে যান বইয়ের আতুড়ঘর গন্থাগারগুলোতে। এই দৃশ্য সব সময় বিরাজ করে কক্সবাজার জেলা গণগন্থগারে। এই গণগন্থগারে প্রতিদিন শত শত পাঠক আসেন বই পড়তে। এক সময় নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও তা ক্রমান্বয়ে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে এই গণ-গন্থাগারটি।

জানা গেছে, দীর্ঘ ধরে এই গণগন্থগারে বেশ কিছু সীমাবদ্ধ ছিলো। গত দুই বছরে তা প্রায়ই কাটিয়ে তোলা হয়েছে। দুই বছর আগে গ্রন্থাগার ছিল অপরিচ্ছন্ন। পাঠক সেবা ছিল খুব নিম্নমানের। পাঠকক্ষকে অনেকের কাছে বইয়ের ‘গোদাম’ বলে মনে হত। রাতে গ্রন্থাগার চত্বর ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। এ যেন এক ভূতের বাড়ি! বিদ্যুৎ করতো আসা-যাওয়া।

এই গণগন্থাগারের বেশ ক’জন নিয়মিত পাঠকের সাথে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে জেলার প্রধান এই গণগন্থারে সঠিক ও যথোপযুক্ত পাঠের পরিবেশ ছিলো। পাঠ কক্ষ ছিলো অনেকটা অপরিচ্ছন্ন। বইয়ের সঠিক রক্ষাবেক্ষণ ছিলো না। তাই কাঙ্খিত বইটি খুঁজতে বেগ পেতো হতো পাঠকদের। সংকট ছিলো বইয়েরও। ছিলো না সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। এছড়াও শৃঙ্খলাতেও ছিলো অযতেœর ছাপ! এসব কারণে পাঠের পরিবেশ অনেকটা সংকীর্ণ হয়ে থাকতো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে জেলার বই পাঠের প্রধান আতুড়ঘর কক্সবাজার গণগন্থগারে সহকারী-পরিচালককের (লাইব্রেরিয়ান) পদটি শূন্য ছিলো। বহু বছর পর এই সরকারি গণগন্থাগারের উপ-পরিচালক হয়ে আসেন ঋষিকেশ পাল। তিনি ২০১৭ সােেলর ২৯ জানুয়ারি যোগ দেন। তিনি যোগদান করার পর আস্তে আস্তে এই গণগন্থাগারের পরিবেশ উন্নত করণে কাজ শুরু করেন। তিনি যোগদান করেই গণগন্থাগারের সমস্যা এবং সংকীর্ণতা রোধ করতে উদ্যোগ নেন। একে একে তিনি পাঠে বিঘœ সৃষ্টিকারী সমস্যাগুলো সমাধান করেন। এক শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসেন পুরো গণগন্থাগারটিকে। এতে মুছে গেলো নিয়মিত পাঠকদের বহুদিনের জমানো ক্ষোভ। সেই সাথে বেড়েছে নতুন বহু সংখ্যক পাঠকও।

গন্থাগারের দাপ্তরিক সূত্রে জানা গেছে, গন্থাগারে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবাহের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরে সহযোগিতায় তিন খুটি বিশিষ্ট উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘ রূপকল্প বাস্তবায়নের অংশীদার হিসেবে কক্সবাজার গণগ্রন্থাগারেই বাংলাদেশের প্রথম কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে ফ্রি ইন্টারনেট ব্যবহার ও স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে কম্পিউটার কোডিং/প্রোগ্রামিং শেখানো হয়। একই সাথে পাঠকদের জন্য ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবহার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। গ্রন্থাগারকে মানুষের কাছে আরো পরিচিত করে তুলতে রাস্তার পাশে আধুনিক ডিজিটাল সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। রাতের অন্ধকারে এটি গ্রন্থাগার চত্বর, রাস্তা ও আশে পাশের এলাকা আলোকিত করে তুলে গ্রন্থাগারের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। গ্রন্থাগারের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য্য বর্ধনে নতুন করে রং করণসহ সাজ-সজ্জা করা হয়েছে। একই সাথে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নারী পাঠকদের জন্য আলাদা পাঠকক্ষের ব্যবস্থা করা হয়ছে। গ্রন্থাগারের ভিতরে-বাইরে পর্যাপ্ত আলোক বাতি ও ফ্যানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাঠকক্ষের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ যেমন- বই, বইয়ের আলমিরা, চেয়ার-টেবিল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে সার্বক্ষণিক তদারকির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এই গণগন্থাগারের নিয়মিত পাঠক মাস্টার মোঃ রিদুয়ান বলেন, ‘বর্তমান সহকারী-পরিচালক (লাইব্রেরিয়ান) করার পর তিনি এই গন্থাগারের সার্বিক পরিবেশ উন্নতি করণে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি শুরু থেকেই এসব কার্যক্রমের জন্য অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ে অনেক পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে প্রতি মুহূর্ত গন্থাগারের সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে তৎপর থাকেন।’

তবে পাঠকদের অভিযোগ, সব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হলেও একটি সমস্যা কাটানো যায়নি। তা হলো- গরম প্রশমনে কোনো উদ্যোগ করা হয়নি। গন্থাগারের ভবনটি একতলা বিশিষ্ট। তার সাথে গাছ-গাছালির ছায়া নেই তাই সারাদিন সূর্যের তাপ পড়ে ভবনের উপর। এতে পুরো দিন ভবনের ভেতর বিরাজ করে অত্যন্ত গরম। অধিক পরিমাণ ফ্যানের ব্যবস্থা থাকলেও তা দিয়ে অতিরিক্ত গরম কাটানো যায় না। একতলা হওয়ায় গ্রীষ্মকালে এবং অন্যান্য সময়ে কড়া রোদ উঠলেই পাঠকক্ষ ভয়াবহভাবে ভ্যাপসা গরমে ভরে উঠে। তখন গরমে পাঠক পাঠকক্ষ থেকে বের হয়ে যায় অনেক পাঠক। সেই সাথে কম্পিউটার ল্যাবেও অসহ্য গরম অনুভূত হয়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য দরকার এসি। এখন এসিই সমস্যা হিসেবে রয়েছে। এসিটা লাগাতে পারলে শতভাগ পাঠের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হয়ে যাবে।

সার্বিক প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা গণগন্থাগারের সহকারী-পরিচালক (লাইব্রেরিয়ান) ঋষিকেশ পাল বলেন, ‘আমি যোগদান করার পর দেখি গন্থাগারের ভেতরে-বাইয়ে নানা সমস্যা। প্রথমেই আমি সমস্যাগুলো চিহ্নি করে তা উত্তরণে তড়িৎ উদ্যোগ গ্রহণ করি। উর্ধ্বতন মহলকে সমস্যাগুলো অবহিত করে তা সমাধানের জন্য সহযোগিতা চাই। আমি নানাভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে সব সমস্যা লাগব করতে পেরেছি। শুধু আরেকটি সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। তা হলো- গরমের এসি সমস্যা। এসিটা লাগাতে পারলেই আমার প্রচেষ্টা পূর্ণতা পাবে। আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তা অবহিত করেছি। তা পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •