শহিদুল করিম শহিদঃ

কক্সবাজার সুগন্ধা বীচের বালিয়াড়িতে সরকারি জমি দখল করে দোকানপাট নির্মাণের ব্যাপারটা কমবেশি সবারই জানা।
তবে, দোকানগুলোর প্রকৃতপক্ষে মালিক কারা? দোকান বরাদ্দের নামে কি পরিমাণ টাকা আদায় করা হয়েছে? কাদের হাতে টাকার ভাগ যায়? তা অনেকেরই জানা নাই। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসবের অজানা কাহিনী।
বিগত ২০০৭ সালের দিকে মাত্র ৮-১০ জন হতদরিদ্র ও ক্ষুদ্র ঝিনুক ব্যবসায়ীকে অস্থায়ীভিক্তিতে নামমাত্র মূল্যে কার্ড প্রদান করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক।
কয়েক বছর পর কার্ড তথা দোকানের সংখ্যা বাড়িয়ে ১৩০টির মতো করে জেলা প্রশাসন। প্রতি কার্ডের ফি নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার টাকা।
এমতাবস্থায় সুগন্ধা বীচের বালিয়াড়িতে দোকানের সংখ্যা প্রায় আড়াইশ থেকে তিনশত হয়ে যায়। কার্ডের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪০০টি।
অবাক করা বিষয় হলো, জেলা প্রশাসন নির্ধারিত ৮ হাজার টাকার স্থলে প্রতি কার্ড বাবদ হকারদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে তিন থেকে চার লক্ষ টাকা। এসব দোকান কেন্দ্রিক গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
যাতে জেলা প্রশাসনের একজন কর্মচারী সরাসরি জড়িত বলে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর মুখে অভিযোগ শোনা গেছে।
ওই চিহ্নিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কার্ডগুলো ২য় ব্যক্তিকে বিক্রি করছে সাত থেকে আট লক্ষ টাকায়। এমনও রয়েছে, একটি দোকান থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে দখলবাজচক্র। যা হয়তো জেলা প্রশাসনের কেউ জানে না। দখলবাজ সিন্ডিকেটে কয়েকজন কথিত সাংবাদিকের নামও শোনা গেছে। যারা সাংবাদিকতাকে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে দীর্ঘদিন থেকে।
আরো অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, তৎকালীন প্রশাসন অসহায় হতদরিদ্র ঝিনুক ব্যবসায়ীদের দোকানগুলো বরাদ্দ দিলেও বর্তমান পরিস্থিতি তার উল্টো।
এখন যাদের নামে দোকানের কার্ড আছে তারা প্রত্যেকেই সমাজের প্রতিষ্ঠিত ও সাবলম্বী ব্যক্তি। প্রকৃত ঝিনুক ব্যবসায়ী দোকানের মালিক নয়।
৯ জুন সরজমিনে খোঁজখবর নিতে গেলে এসব তথ্য উঠে আসে। বের হয় রাঘব বোয়ালদের অজানা কাহিনী।
কয়েকজন ব্যবসায়ী জানায়, সুগন্ধা বীচ ঝিনুক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. রুবেল, সুগন্ধা বীচ ঝিনুক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকের হোসেন, যুবদল নেতা জয়নাল, নুরুল হুদা, সী-গাল পয়েন্টস্থ ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি জালাল ও অপর ব্যবসায়ী লালুর নেতৃত্বে ঈদের ছুটিতে রাতের অন্ধকারে সুগন্ধা পয়েন্টের দু’পাশে অর্ধশতাধিক দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এদের নেতৃত্বে গত দুই ঈদের রাতেও মার্কেট নির্মিত হয়। এবারও  ঈদুল ফিতরের আগের ও পরের রাতে দু’পাশে অর্ধশতাধিক দোকান নির্মাণ করে। এতে প্রতিটি দোকান থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ২ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত।
সরেজমিন সুগন্ধা পয়েন্টে দেখা যায়, নতুন করে উত্তর পাশে ২৪ টি দোকান এবং পূর্ব পাশের মার্কেটের ভিতরে প্রতি গলিতে একটি করে মোট ৭ টি দোকান নির্মাণ হচ্ছে।
ঈদের ছুটিতে দখলবাজরা তড়িঘড়ি করে রাতারাতি নির্মাণ কাজ চালায়। এসব নিউজ বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যম ও ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে ভাইরাল হয়। পরে প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান চালায়।
পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজেষ্ট্রিট সাইফুল ইসলাম জয়ের নেতৃত্বে অভিযানে উত্তর পাশের কিছু দোকান ভাঙ্গা হলেও পূর্ব পাশের দোকানগুলোতে হাত দেয়া হয়নি। রয়ে গেছে অক্ষত। অধিকন্তু, মার্কেটের ভেতরের গলিতে নতুন দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পূর্ব পার্শের মার্কেটের মালিকদের সাথে বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির ভালো খাতির রয়েছে। তাই ওই ৭ টি দোকান ভাঙ্গা হয়নি।
উচ্ছেদ অভিযানকালে দখলবাজরা সাথে থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
সমুদ্র নগরীর বাসিন্দারা বলছে, পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় সুগন্ধা পয়েন্টে ডেসটিনি গ্রুপের বহুতল ভবন নির্মাণ বন্ধ করে দেয় হাইকোর্ট।
অথচ বালিয়াড়ি দখল করে অবাধে স্থাপনা নির্মাণ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে দখলবাজ একটি চক্র।
বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সবচেয়ে বেশি মাথা ঘামানোর কথা। কিন্তু তারা নিরব কেন? প্রশ্ন স্থানীয়দের।
সুগন্ধা বীচ মার্কেটের কয়েক জনের (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মার্কেটের কার্ডহোল্ডার জাকিরের সাথে ডিসি অফিসের পর্যটন ডেস্কের অফিস সহকারী উত্তম বাবু সাথে ভালো খাতির রয়েছে। দুই জনের লিয়াজুতেই টাকার পরিমাণের ভিত্তিতে কার্ড ইস্যু করে।
বীচ মার্কেটের একাধিক কমিটি থাকায় তাদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষমূলক আচরণের প্রেক্ষিতে মার্কেটে নতুন করে স্থাপনা নির্মাণের প্রতিযোগিতা চলছে।
এদিকে, সুগন্ধা বীচ ফটকের পাশে পর্যটকদের চলাচলের পথ ব্যাঘাত সৃষ্টি করে নতুন করে আরো চারটি দোকান নির্মিত হচ্ছে। উচ্ছেদকৃত দোকানগুলো পুনঃনির্মাণের ফন্দি আঁটছে দখলবাজরা।
এব্যাপারে পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম জয়ের কাছে জানতে চাইলে বলেন, পরিবেশ বিঘ্নিত করে সমুদ্রের বালিয়াড়িতে অবৈধ দোকানপাট নির্মাণের কোন সুযোগ নাই। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ঈদের আগের ও পরের রাতে বালিয়াড়িতে মার্কেট নির্মাণের বিষয়টি কেউ আমাকে অবগতও করেনি। বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি শনিবার সকালে জানতে পারেছি। সাথে সাথে দুপুরের মধ্যে লম্বা একটি নির্মাণাধীন মার্কেট উচ্ছেদ করা হয়েছে।
ডিসি বলেন, অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এবিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে রোববার বিকালে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনে কর্মরত কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে তারও ছাড় নেই।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •