রেবেকা সুলতানা আইরিনঃ
কক্সবাজার জেলা কারাগারে লেগেছে কাঠামো ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ছোঁয়া, বদলেছে কারাভ্যন্তর ও বাইরে সামগ্রিক চিত্র। যোগ্য ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে কক্সবাজার জেলা কারাগার আজ বাংলাদেশের অন্যান্য কারাগারের চেয়ে দূর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে। সামগ্রিক উন্নয়নের চিত্র, পরিবেশ এবং সুদক্ষ পরিচালনা ও অভিজ্ঞতার বাস্তবিক কার্যক্রমে কক্সবাজার জেলা কারাগার মডেল কারাগারের এক অনন্য উদাহরণ। কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেল সুপার বজলুর রশীদ আখন্দ জেলার রীতেশ চাকমার নেতৃত্বে কারাগারের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সহযোগিতায় “রাখিব নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ” এ স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিতে কক্সবাজার জেলা কারাগারের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী সততার সাথে একাগ্রচিত্তে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
তথ্য মতে, ২০০১ সালে ২৭ মে কক্সবাজার জেলা কারাগারের সূচনা হয়েছিলো। বর্তমানে কক্সবাজার জেলা কারাগারে ধারণ ক্ষমতার প্রায় ৮ গুণ বন্দি রয়েছে। ১২ দশমিক ৮৬ একর আয়তনের জেলার এ কারাগারের ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৫৩০ জন। কিন্তু বর্তমানে এ কারাগারে অবস্থান করছেন ৪ হাজার ২৯৮ জন বন্দি। কারাভ্যন্তরের পরিমাণ ৪ দশমিক ৭৭ একর। সাধারণত কারাগারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ধারণ ক্ষমতার প্রেক্ষাপট অনুসারে, ৪৯৬ জন পুরুষ ও ৩৪ জন নারী বন্দি থাকার কথা। কিন্তু সে তুলনায় কারা কর্তৃপক্ষ ধারণ ক্ষমতার প্রায় ৮ গুণ বন্দিকে পরম যত্নে এবং সেবায় আগলে রেখেছেন। জেল সুপার তাঁর টিমকে সাথে নিয়ে কারাগারে শান্তি-শৃংখলা সৃষ্টি, কারা মনিটরিং, অসুস্থ বন্দিদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা, কারা ক্যান্টিনে ন্যায্যমূল্যের ব্যবস্থা, সার্বক্ষণিক তদারকি, বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ, উন্নতমানের খাবার পরিবেশণ, পয়োঃ নিষ্কাশন ব্যবস্থা, সর্বোপরি মানুষের মৌলিক চাহিদাসমূহ পৌঁছে দিতে কাজ করছেন অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে।সততায় অবিচল থেকে মডেল কারাগার রূপান্তরে তাঁর টিমকে সাথে নিয়ে জেল সুপার বজলুর রশিদ আখন্দ আজ সফলতার নিশ্বাস ফেলছেন।
সদ্য কারামুক্ত নরসিংদীর বাকের থেকে কারাগার ও কারাগারে অবস্থানরত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জিআর ২৪৮/১৮ মূলে কারান্তরিন ছিলাম। বর্তমানে কারাগারের পরিবেশ বেশ চমৎকার। কারাগারে প্রত্যেক বন্দি সমান সুযোগ-সুবিধা পায়। আমিও একটি ওয়ার্ডে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সাথে ছিলাম, আমি দেখেছি, কোন ইয়াবা ব্যবসায়ী যাতে বাড়তি কোন সুযোগ-সুবিধা তথা আরাম আয়াশে থাকতে না পারে সেজন্য জেল সুপার সর্বদা সজাগ রয়েছেন এবং তিনি কারাগারের সকল ওয়ার্ড পরিদর্শন করে বন্দি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কারণে কারো অসুবিধা হচ্ছে না কিনা সে ব্যাপারে খোঁজ খবর নেন। কোন ইয়াবা ব্যবসায়ী যাতে বাড়তি কোন সুযোগ সুবিধা এবং অনৈতিক কর্মকা- করতে না পারে সেজন্য তিনি কারারক্ষীদের এব্যাপারে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। খাবার দাবারের কথা বললে তিনি বলেন, কারা বিধি মোতাবেক সকল বন্দিদের খাবার পরিবেশণ করা হয়। বাইরে থেকে খাবার আনা নেওয়া করার কোন সুযোগ নেই। প্রত্যেক বন্দি কারা বিধি মোতাবেক খাবার গ্রহণ করে। সে মোতাবেক ইয়াবা ব্যবসায়ীরা ও খাবার দাবার খেয়ে থাকেন। তিনি আরো বলেন, কারা রক্ষীরা যাতে কোন অনিয়মের সাথে জড়িত না হয়, সেজন্য মাসিক দরবার ও রুল কলে তাদেরকে সচেতন করা হয় এবং সঠিক দায়িত্ব পালনে কাজের প্রতি প্রেষণা সৃষ্টি করা হয়। জেল সুপার এ বিষয়ে সব সময় সুনজর প্রদান করছেন।
আরেক সদ্য কারামুক্ত টেকনাফের শাহজালাল থেকে কারাগারের ক্যান্টিন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মূলত আমি কারাগারের ক্যান্টিনে থাকার সুযোগ হয়েছিলো, বিগত ৬ মাস কারা ক্যান্টিনে আমি নিয়োজিত ছিলাম। কারা ক্যান্টিনে ন্যায্যমূল্যে বাজার মূল্যের হিসাব অনুসারে পণ্য বিক্রয় করা হয়। বন্দিরা কারা ক্যান্টিন থেকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য ক্রয় করে ভোগ করে থাকেন, এবং ক্রয় করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। মূলত প্রত্যক্ষ সেবা উপভোগ করার জন্য জন্য কারা ক্যান্টিন স্থাপান করা হয়, যা আমি কারাভ্যন্তরে কারা ক্যান্টিনের প্রত্যক্ষ কার্যক্রমে উপলব্দি এবং চৌকস সাক্ষী। বর্তমান জেল সুপার একজন গুণি মানুষ, তাঁর কারণেই বর্তমান কারাগারের পরিবেশ শান্তিতে ও সুন্দরভাবে বিরাজমান রয়েছে।
তবে দর্শনার্থীরা বলেন, প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী কারাগারে বন্দিদের সাথে দেখা করতে আসেন। সুন্দর মনোরম পরিবেশে সাউন্ড সিস্টেম অপেক্ষাঘর তৈরী করা হলেও কারান্তরীণ কারো সাথে দেখা করতে হলে অপেক্ষা করতে হয় বিধায় গণশৌচাগার ও পাবলিক টয়লেটের অভাবে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। যার কারণে নারী দর্শনার্থীরা চরম সমস্যার সম্মুখীন হয়। এ ব্যাপারে দর্শনার্থীরা কারা কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
জেলা কারাগারের জেলার রীতেশ চাকমা জানান, আমি জেলার হিসেবে যোগদান করেছি প্রায় ৫ মাস যাবত। যোগদানের পর থেকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে কারা বন্দিদের প্রত্যক্ষ সেবা প্রদান করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কারাগারে যাতে কোন অপ্রীতিকর তথা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, এমন কার্যক্রম যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে আমরা সজাগ রয়েছি।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেল সুপার বজলুর রশীদ আখন্দ বলেন, কারাগার একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান। কারাগারে বিগত ৩ বছর যাবত আমি কর্মরত আছি। কাঠামো ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আমি আমার সার্বিক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম করেছি, কর্তৃপক্ষের নিকট তদবির করেছি। কক্সবাজার জেলা কারাগারের উন্নয়নের চিত্রসমূহ আমাদের সকলের পরিশ্রমের ফসল। কারাগারে মাদকের প্রবেশ যাতে না হয়, সে ব্যাপারে আমরা সজাগ রয়েছি, ফলশ্রুতিতে জেলা কারাগারে প্রায় ১০ বারের চেয়ে বেশী ইয়াবা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। যার পরিমাণ ১০ হাজারের চেয়েও বেশী।
তিনি আরো বলেন, কারাভ্যন্তরে নতুন ৬ তলা ভবনের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। ২০০ জনের ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ১২ কক্ষ বিশিষ্ট ভবনটি জুনের শেষের দিকে উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। ভবনটির নির্মাণ কাজ শেষ হলে, বন্দি পুনর্বাসনের পাশাপাশি একটু স্বস্তি ও শান্তি পেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •