বাংলা ট্রিবিউন

আগামী বছর থেকে দেশে কয়লাচালিত বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসছে। এরপর ক্রমান্বয়ে দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রর উৎপাদন বাড়তে থাকবে। সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে অন্তত ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হবে কয়লা। এই পরিমাণ কয়লাকেন্দ্র চালাতে বছরে অন্তত ৩৩ মিলিয়ন টন কয়লার প্রয়োজন। বিপুল পরিমাণ এই কয়লা পোড়ালে যে দূষণ হবে তা নিয়ন্ত্রণে এখনও কোনও কার্যক্রম গ্রহণ করতে দেখা যায়নি সরকারকে। আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এবার পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য বায়ুদূষণ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে। চীনে এবার বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রধান আয়োজন হবে।

বলা হয়, আগ্রাসী উন্নয়ন নীতির কারণে চীনের বাতাসে বিষ ছড়াচ্ছে। বিষাক্ত বাতাসের কারণে বিশ্ব মিডিয়ায় বেইজিং-সাংহাই সংবাদের শিরোনাম হয়েছে বারবার। এবার সেই চীনই বিশ্ব পরিবেশ দিবসের হোস্ট কান্ট্রি বা আয়োজক দেশ। আর পরিবেশের প্রধান উপাদান বাতাস এবার পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য। জাতিসংঘের আয়োজনে প্রতিবছর ৫ জুন সারাবিশ্বে পরিবেশ দিবস পালিত হয়। এবার এ দিবসে বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সরকারি অফিস আদালত ছুটির কারণে দেশে পরিবেশ দিবস পালন হবে ২০ জুন। ওইদিন বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় ঢাকায় পরিবেশ দিবসের প্রধান আয়োজন করবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘ বলছে, পরিবেশ দিবসটি একান্ত গণমানুষের। এইদিন মানুষ পৃথিবীর জন্য শুভ কিছু করার প্রত্যয় ব্যক্ত করবে। এতে পৃথিবীর পরিবেশ সুন্দর হয়ে উঠবে। প্রতিবছর একটি দেশই পরিবেশ দিবসের আয়োজন করে, যা এবার করছে চীন। সঙ্গত কারণে চীনেই হবে এবার পরিবেশ দিবসের মূল আয়োজন।
পরিবেশ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জানান, আগ্রাসী উন্নয়ন নীতিতে সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবেশ। যেসব দেশ উন্নয়নের শুরুর দিকে পরিবেশকে বিষিয়ে তুলেছে চীন তাদের মধ্যে অন্যতম। তবে চীন সারাদেশে ব্যাপকভাবে বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা করার চেষ্টা করছে। আগে বেইজিংয়ের বাতাসে যে দূষণ দেখা যেত এখন আর তা দেখা যায় না। এ কারণে আগ্রাসী অর্থনৈতিক উন্নয়নের বদলে টেকসই উন্নয়ন খুব জরুরি। বাংলাদেশেও আগ্রাসী উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে কিনা তা এখনই ভেবে দেখার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে পরিবেশ সংগঠনগুলো। বিশেষ করে দেশের দুটি অঞ্চল পটুয়াখালী এবং কক্সবাজারে নির্মাণ করা হচ্ছে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই দুই এলাকায় ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার মেগাওয়াট কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
প্রতিদিন এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে দরকার ৯ হাজার টন কয়লা। সেই হিসেবে প্রতিদিন ১০ হাজার মেগাওয়াটের জন্য প্রয়োজন পড়বে ৯০ হাজার টন কয়লা। বছর শেষে ৩৬৫ দিনের জন্য প্রয়োজন হবে ৩২ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন টন কয়লা। দাবি করা হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর ৯৯ দশমিক ৯ ভাগ ছাই ‘অ্যাশ হপারে’ ধরা হবে। নির্গত গ্যাস ধরতে ফ্লু গ্যাস ডিসালফারাইজার ইউনিট (এফজিডি) নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রটির ৯৬ ভাগ ফ্লু গ্যাস ধরা হবে। কিন্তু এরপরও পরিবেশের উপর কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনও প্রভাব ফেলবে না এমন চিন্তা করা ঠিক নয়।
মাতারবাড়িতে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করছে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ‘আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল’ব্যবহার করে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। এমনিতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে যে ধরনের দূষণ হয় তারচেয়ে কোনও অবস্থাতেই যাতে বেশি না হয় সেই চেষ্টাই করা হচ্ছে। কয়লা ব্যবহারের বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের গাইডলাইন আছে, আমাদের সরকারি গাইডলাইনও আছে, আর এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে টাকা দিচ্ছে জাইকা। জাপানের এই সংস্থাটি খুবই সংবেদনশীল। গাইডলাইনগুলোতে কার্বন ও সালফার নির্গত হওয়ার যে মাত্রা দেওয়া আছে তার চেয়েও কম করার চেষ্টা থাকবে আমাদের।” তিনি বলেন, ‘শুধু বায়ু নয়, মাটি ও পানি যাতে কম দূষিত হয় সে চেষ্টা আমরা করছি। দূষণ কমাতে কেন্দ্রের চিমনিও ২৭৫ মিটার উচ্চতার করা হচ্ছে। অনেক দেশেই এখন চিমনির উচ্চতা কমিয়ে আনছে কিন্তু আমরা সাবধানতা হিসেবে উচ্চতা বেশিই রাখছি।’
এদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আব্দুল মতিন বলেন, ‘জাতিসংঘের দূষণ না করার চুক্তিতে সই করেছে বাংলাদেশ।বিশ্বের অনেক দেশ এখন কয়লা থেকে সরে আসছে। বলা হচ্ছে, কয়লা হচ্ছে ডার্টি ফুয়েল। এই কয়লার কারণে সারাবিশ্বে দূষণের মাত্রা বাড়ছে। সময় দেওয়া হয়েছে, আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে সারাবিশ্ব কয়লা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা এখন কয়লার ব্যবহার শুরু করতে যাচ্ছি। সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রজ্ঞাবান- আমরা মনে করি না। এখন কয়লা ছাড়া অন্য জ্বালানি দিয়েও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। কাজেই বায়ু দূষণ কমাতে হলে কয়লা বর্জন করতেই হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •