মুহম্মদ নূরুল ইসলাম:
সকল প্রশংসা সেই সত্তার যার হাতের মুঠোতে আমার জীবন-মৃত্যু। সকল প্রশংসা তাঁরই যিনি আমাকে অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন, শুকরিয়া প্রকাশ করছি রাব্বুল আলামীনের যিনি আমার কলমকে সচল রেখেছেন। সে রবের কাছে লাখো-কোটি শুকরিয়া যিনি আমাকে এ বিষয়ে কিছু লেখার জন্য সাহায্য করেছেন।

অসংখ্য দরুদ ও সালাম বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত, মহান শিক্ষক সাইয়্যিদুল মুরসালিন হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি, যিনি ইসলামকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। যিনি পৃথিবীর ইতিহাসে এক ঘোরতর জাহেলিয়াতের যুগে আবির্ভুত হয়ে ইসলামের দাওয়াতের মাধ্যমে জাহেলিয়াতের পংকিলতায় নিমজ্জিত জাতিকে তাওহিদি চেতনায় উদ্ভাসিত ও আলোকিত করেছেন।

ভূমিকা
শেখ সাদি রাহ. একদিন রাজদরবারে গিয়েছিলেন মেহমান হয়ে। কিন্তু তাঁর সাজ-পোষাক ভাল ছিল না। তাই তাঁকে তেমন মেহমানদারী করা হয় নি, এমনকি ভালো খাবারও দেওয়া হয়নি।

শেষমেশ উনি বাড়ি গিয়ে ভাল পোষাক-আশাক পরিধাণ করে আসলেন, উনার সাজ-সজ্জা দেখে উনাকে রাষ্ট্রীয় মেহমানদের সাথে বসানো হল। ভাল কদর করল। উনি কি করলেন?

খাবার নিজে না খেয়ে সব জামার পকেটে পুরতে লাগলেন। অর্থাৎ পোশাককে খাওয়াতে লাগলেন।

শেখ সাদি রাহ. একজন দার্শনিক, বিখ্যাত পণ্ডিত, আল্লাহ্র মুমীন বান্দা হিসেবে নিজের মর্যাদার প্রতি খুবই সচেতন। পূর্বে ভালো পোষাক-পরিচ্ছদ পরিধান না করায় তাঁকে রাজদরবারে কদর করা হয়নি। পরে যখন ভালো পোশাক পরিধান করে এলেন তখন তিনি ক্ষুদ্ধ হয়ে সব খাবার পোষাককে খাওয়ালেন। তিনি ভাবলেন এসব মূল্যবান খাবার তাঁর প্রাপ্য নয়। এটা পোষাকের প্রাপ্য।

পূর্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্য বইতে শিক্ষণীয় বিষয় হিসেবে শেখ সাদি রাহ.হে নিয়ে লিখিত এই গল্পটি পড়ানো হতো। কিন্তু বর্তমানে এই গল্প পড়ানো হয় না। মূলত মানুষের মর্যাদাকে মূল্যায়িত করার জন্য এই গল্প পড়ানো হতো।

শেখ সাদি রাহ. মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাজ দরবারে প্রদত্ত খাদ্যদ্রব্য পোষাকের পকেটে ভরে রাখেন। রাজদরবারে মানুষের পরিবর্তে পোষাক-পরিচ্ছদকেই মূল্যায়িত করা হয়েছিলো।

পোষাকও অনেক সময় মর্যাদার অধিকারী হয় যা রাজদরবারের উদাহরণ আমরা নিতে পারি। আল্লাহ্ তা’আলা মানুষের সৌন্দর্যবর্ধন করার জন্য পোষাক সৃষ্টি করেছেন। যা মানুষ নিজের লজ্জাস্থান সহ নিজেদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য পরিধান করে থাকে।

পোশাক পরিচ্ছদ সংক্রান্ত ভুল-ভ্রান্তি
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামের দিক-নির্দেশনা রয়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদের বিষয়েও ইসলামের মৌলিক দিক নির্দেশনা রয়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদ সম্পর্কে আলোচনার উদ্দেশ্যেই বক্ষমান নিবন্ধে। এ সম্পর্কে সমাজে যেসব ভুলভ্রান্তি ও শিথিলতা লক্ষ করা যায় তার পিছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় হচ্ছে
এ বিষয়ে শরীয়তের কী কী মূলনীতি ও বিধান রয়েছে সে সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই জানা-শোনা নেই। উপরন্তু অনেকের এই ধারণাই নেই যে, পোশাক-পরিচ্ছদ সম্পর্কেও শরীয়তের বিধিবিধান থাকতে পারে। একে তারা পুরোপুরিই ইচ্ছামাফিক ও স্বাধীনতার বিষয় মনে করে। এই ধারণা ঠিক নয়। শরীয়ত এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আল কুরআন কারীম এবং হাদীস শরীফে এ সম্পর্কিত উসূল ও আহকাম তথা নীতি ও বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের রুচি ও স্বভাবের প্রতিও একটা পর্যায় পর্যন্ত শরীয়ত অনুমোদন দিয়েছে। সুতরাং এ বিষয়ে একেবারে উদাসীন থাকা, মন মতো চলা ভুল।

পোশাক-পরিচ্ছদ ও সাজসজ্জার বিষয়ে সমাজে বিজাতীয় সংস্কৃতি ও ফ্যাশনের বড় প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যখন যে ফ্যাশন বের হচ্ছে তখন নির্বিচারে অনুকরণকেই ‘আধুনিকতা’ মনে করা হচ্ছে। আর এ ক্ষেত্রে অমুসলিম বা ফাসেক লোকদের রীতি-নীতিই অধিক অনুকরণীয় হতে দেখা যায়। এসবই ভুল। বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ শরীয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঘৃণিত। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে সামঞ্জস্য রাখে সে তাদের দলভুক্ত।’ (সুনানে আবু দাউদ ২/৫৫৯)

শাড়ি একসময় সনাতনধর্মীয় নারীর পোশাক ছিল, কিন্তু এখন আর তাদের বিশেষ পোশাক থাকে নি। এখন এটা মিশ্র পোশাকের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। সুতরাং শাড়ি পরলে এবং অনুকরণের নিয়ত না করলে বিধর্মীদের সাদৃশ্যের গুনাহ হবে না বটে কিন্তু যেহেতু শাড়ি পরিধান করলে সাধারণত শরীরের বিভিন্ন জায়গা খোলা থাকে যেমন- পেট, পিঠ, বুক হাতের বাহু ইত্যাদি, তাই এভাবে শাড়ি পরিধান করা বৈধ হবে না। হ্যাঁ, কেউ যদি ব্লাউজ এমনভাবে বানায় যদ্দারা উপরোক্ত অংশগুলোও পুরোপুরি ঢেকে যায় এবং শাড়ির উপর থেকে পেট-পিঠ ও বুকের আকৃতি ফুটে না উঠে তাহলে তা পরিধান করা নাজায়েয নয়।

পোশাক-পরিচ্ছদ কেনো?
আদিম যুগে কি মানুষ পোশাক পরিধান করতো? আদিম মানুষকে আমরা পোশাক-পরিচ্ছদ ছাড়া দেখতে অভ্যস্ত। বর্তমান যুগেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুহাবাসী বা পাহাড়ি জনপদের লোকজনকে পোশাক ছাড়া দেখা যায়। বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকার মুরং, খুমি, বমসহ বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্টির লোকজনকে বিগত কয়েক দশক পূর্বেও পোশাক ছাড়া চলাফেরা করতে দেখা গেছে। দিন বদলের সাথে সাথে তাদের মধ্যেও পরিবর্তন আসছে। হযরত আদম আ. ও হযরত হাওয়া আ. যে পোশাক পরিধান করতেন তার বর্ণনা আমরা আল কুরআন কারীম থেকে জানতে পারি।

রাব্বুল আলামীন মানুষের লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য এবং নিজেদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য পোশাক সৃষ্টি করেছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা আল ক্বুরআন কারীমের সূরা আল আ’রাফ-এর (সূরা নম্বর-৭) ২৬ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন এভাবে, “হে বনী আদম! তোমাদের শরীরের লজ্জাস্থানগুলো ঢাকার এবং তোমাদের দেহের সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য বিধানের উদ্দেশ্যে আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি। আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম। এটি আল্লাহ্র নিদর্শনগুলোর অন্যতম, সম্ভবত লোকেরা এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে।”

আল্লাহ্র এই নির্দেশ অনুযায়ী হযরত আদম আ. ও হযরত হাওয়া আ.-এর ঘটনার একটি বিশেষ দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আরববাসীদের সামনে তাদের নিজেদের জীবনে শয়তানী ভ্রষ্টতা প্রতারণার একটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট প্রভাবের প্রতি আংগুলি নির্দেশ করা হয়েছে। আরববাসী কেবলমাত্র সৌন্দর্য সামগ্রী হিসেবে ও বিভিন্ন ঋতুর প্রভাব থেকে শারীরিকভাবে আত্মরক্ষা করার জন্য পোশাক ব্যবহার করতো। কিন্তু এর যে প্রাথমিক ও মৌলিক উদ্দেশ্য শরীরের লজ্জাস্থানগুলোকে আবৃত করা, সেটি তাদের কাছে কোনো গুরুত্ব লাভ করেনি। নিজেদের লজ্জাস্থানগুলোকে অন্যের সামনে উন্মুক্ত করে দিতে তারা মোটেই ইতস্তত করতো না। প্রকাশ্য স্থানে উলংগ হয়ে গোসল করা, পথে ঘাটে যেখানে সেখানে প্রকাশ্য জায়গায় প্রকৃতির ডাকে উদোম হয়ে বসে পড়া, পরনের কাপড় খুলে পড়ে যেতে এবং লজ্জাস্থান উন্মুক্ত হয়ে যেতে থাকলেও তার পরোয়ানা না করা ইত্যাদি ছিলো তাদের প্রতিদিনের অভ্যাস। সবচেয়ে মারাত্মক ছিলো হজ্জের সময় তাদের অসংখ্য লোকের কা’বার চারদিকে উলংগ হয়ে তওয়াফ করা। এ ব্যাপারে তাদের পুরুষদের চেয়ে মেয়েরাই ছিলো কিছু বেশি নির্লজ্জ ও অগ্রগামী। তাদের দৃষ্টিতে এটি ছিলো একটি ধর্মীয় কাজ এবং সৎকাজ মনে করেই তারা এটি করতো। আর যেহেতু এটি কেবল আরবদেরই বৈশিষ্ট ছিলো না বরং দুনিয়ার অধিকাংশ জাতি এ নির্লজ্জ বেহায়াপনায় লিপ্ত ছিলো এবং আজো আছে, তাই এখানে কেবলমাত্র আরববাসীদেরকে সম্বোধন করা হয়নি বরং ব্যাপকভাবে সারা দুনিয়ার মানুষকে সম্বোধন করা হয়েছে। এখানে সমগ্র মানব জাতিকে এই বলে সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে যে, দেখো শয়তানী প্রতারণার একটি সুস্পষ্ট আলামত তোমাদের নিজেদের জীবনেই রয়েছে। তোমরা নিজেদের রবের পথনির্দেশনার তোয়াক্কা না করে এবং নিজেদের নবী-রাসূলদের দাওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজেরাই নিজেদেরকে শয়তানের হাতে তুলে দিয়েছো। আর সে তোমাদেরকে মানবিক প্রকৃতির পথ থেকে বিচ্যুত করে সেই একই নির্লজ্জতার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে যার মধ্যে ইতিপূর্বে সে তোমাদের প্রথম পিতা-মাতাকে নিক্ষেপ করতে চেয়েছিলো। এ ব্যাপারে চিন্তা করলে প্রকৃত সত্য তোমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে। অর্থাৎ রাসূলদের নেতৃত্বে ও পথনির্দেশনা ছাড়া তোমরা নিজেদের প্রকৃতির প্রাথমিক দাবীগুলো পর্যন্তও বুঝতে এবং তা পূর্ণ করতে অক্ষম।

এর পরে একই সূরার ২৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা এরশাদ করেছেন এভাবে, “হে বনী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে আবার ঠিক তেমনিভাবে বিভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ না করে যেমনিভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল এবং তাদের লজ্জাস্থান পরস্পরের কাছে উন্মুক্ত করে দেবার জন্য তাদেরকে বিবস্ত্র করেছিল। সে ও তার সাথীরা তোমাদেরকে এমন জায়গা থেকে দেখে যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। এ শয়তানদেরকে আমি যারা ঈমান আনে না তাদের অভিভাবক করে দিয়েছি।”

উপরের আয়াত থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সুস্পষ্ট হয়ে সামনে ভেসে উঠে
এক. পোশাক মানুষের জন্য কোনো কৃত্রিম জিনিস নয়। বরং এটি মানব প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবী। আল্লাহ্ মানুষের দেহের বহির্ভাগে পশুদের মত কোনো লোমশ আচ্ছাদন জন্মগতভাবে তৈরি করে দেননি। বরং লজ্জার অনুভূতি তার প্রকৃতির মধ্যে গচ্ছিত রেখে দিয়েছেন। তিনি মানুষের যৌন অংগগুলোকে কেবলমাত্র যৌনাংগ হিসেবেই তৈরি করেননি বরং এগুলোকে আবৃত্ত রাখা বা ঢেকে রাখার জন্য বানিয়েছেন। আবার এ প্রকৃতিগত লজ্জার দাবী পূরণ করার জন্য তিনি মানুষকে কোনো তৈরি করা পোশাক দেননি। বরং তার প্রকৃতিকে পোশাক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেছেন, যাতে নিজের বুদ্ধি ব্যবহার করে সে প্রকৃতির এ দাবীটি উপলদ্ধি করতে পারে এবং আল্লাহ্র সৃষ্ট উপাদান ও উপকরণসমূহ কাজে লাগিয়ে নিজের জন্য পোশাক তৈরি করতে সক্ষম হয়।

দুই. এ প্রাকৃতিক ও জন্মগত উপলদ্ধির প্রেক্ষিতে মানুষের জন্য পোশাকের নৈতিক প্রয়োজনই অগ্রগণ্য। অর্থাৎ প্রথম সে নিজের লজ্জাস্থান আবৃত করবে। আর তার স্বভাবগত চাহিদা ও প্রয়োজন দ্বিতীয় পর্যায়ভুক্ত। অর্থাৎ তারপর তার পোশাক তার দৈহিক সৌন্দর্য বিধান করবে এবং আবহাওয়ার প্রভাব থেকে তার দেহ সৌষ্ঠবকে রক্ষা করবে। এ পর্যায়েও মানুষ ও পশুর ব্যাপার স্বভাবতই সম্পূর্ণ ভিন্ন। পশুর শরীরের লোমশ আচ্ছাদন মূলত তার জন্য শরীরের শোভা বর্ধন ও ঋতুর প্রভাব থেকে তাকে রক্ষা করে। তার লোমশ আচ্ছাদন তার লজ্জাস্থান ঢাকার কাজ করে না। কারণ তার যৌনাংগ আদতে তার লজ্জাস্থান নয়। কাজেই তাকে আবৃত করার জন্য পশুর স্বভাব ও প্রকৃতিতে কোনো অনুভূতি ও চাহিদা থাকে না এবং তার চাহিদা পূরণ করার উদ্দেশ্যে তার জন্য কোনো পোশাকও সৃষ্টি করা হয় না। কিন্তু মানুষ যখন শয়তানের নেতৃত্ব গ্রহণ করলো তখন ব্যাপারটি আবার উল্টে গেলো। শয়তান তার এ শিষ্যদেরকে এভাবে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হলে যে, তোমাদের জন্য পোশাকের প্রয়োজন পশুদের জন্য পোশাকের প্রয়োজনের সমপর্যায়ভুক্ত, আর পোশাক নিয়ে লজ্জাস্থান ঢেকে রাখার ব্যাপারটি মোটেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বরং পশুদের অংগ-প্রত্যংগ যেমন তাদের লজ্জাস্থান হিসেবে বিবেচিত হয় না, ঠিক তেমনি তোমাদের এ অংগ-প্রত্যংগগুলোও লজ্জাস্থান নয় বরং এগুলো নিছক যৌনাংগ।

তিন. মানুষের পোশাক কেবলমাত্র তার লজ্জাস্থান আবৃত করার এবং তার শারীরিক শোভা বর্ধন ও দেহ সংরক্ষণণের উপায় হবে, এতটুকুই যথেষ্ট নয়। বরং আসলে এ ব্যাপারে তাকে অন্তত এতটুকু মহত্তর মানে পৌঁছতে হবে, যার ফলে তার পোশাক তাকওয়ার পোশাকে পরিণত হয়। অর্থাৎ তার পোশাক নিয়ে সে পুরোপুরি ‘সতর’ তথা লজ্জাস্থান ঢেকে ফেলবে। সৌন্দর্য চর্চা ও সাজসজ্জার মাধ্যমে শরীরের শোভা বর্ধন করার ক্ষেত্রে তা সীমা অতিক্রম করে যাবে না বা ব্যক্তির মর্যাদার চেয়ে নিম্নমানেরও হবে না। তার মধ্যে গর্ব, অহংকার ও আত্মম্ভরিতার কোনো প্রদর্শনী থাকবে না। আবার এমন কোনো মানসিক রোগের প্রতিফলনও তাতে থাকবে না যার আক্রমণের ফলে পুরুষ নারীসুলভ আচরণ করতে থাকে, নারী করতে থাকে পুরুষসুলভ আচরণ এবং এক জাতি অন্য জাতির সাদৃশ বানাবার প্রচেষ্টায় নিজেই নিজের হীনতা ও লাঞ্ছনার জীবন্ত প্রতীকে পরিণত হয়। যেসব লোক নবীদের প্রতি ঈমান এনে নিজেদেরকে পুরোপুরি আল্লাহ্র পথনির্দেশনার আওতাধীন করে দেয়নি তাদের পক্ষে পোশাকের ব্যাপারে এ কাংখিত মহত্তর মানে উপনীত হওয়া কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। যখন তারা আল্লাহ্র পথনির্দেশনা গ্রহণে অসম্মতি জানায় তখন শয়তানদেরকে তাদের পৃষ্ঠপোষক ও অভিভাবক বানিয়ে দেয়া হয় এবং শয়তানরা তাদেরকে কোনো না কোনোভাবে ভুল-ভ্রান্তি ও অসৎকাজে লিপ্ত করেই ছাড়ে।

চার. দুনিয়ার চারদিকে আল্লাহ্র যেসব অসংখ্য নির্দশন ছড়িয়ে রয়েছে এবং যেগুলো মহাসত্যের সন্ধানলাভের ব্যাপারে মানুষকে সাহায্য করে, পোশাকের ব্যাপারটিও তার অন্যতম। তবে এখানে শর্ত হচ্ছে, মানুষের নিজের তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। ওপরে যেসব সত্যের দিকে ইংগিত করা হয়েছে সেগুলোকে একটু গভীর দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে পোশাক কোন্ দৃষ্টিতে আল্লাহ্র একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন তা সহজেই অনুধাবন করা যেতে পারে।

আল কুরআন কারীমের একই সূরার ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা এরশাদ করেছেন ভাবে, “তারা যখন কোনো অশ্লীল কাজ করে তখন বলে, আমাদের বাপ-দাদাদেরকে আমরা এভাবেই করতে দেখেছি এবং আল্লাহ্ই আমাদেরকে এমনটি করার হুকুম দিয়েছেন। তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহ্ কখনো নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনার হুকুম দেন না। তোমরা কি আল্লাহ্র নাম নিয়ে এমন কথা বলো যাকে তোমরা আল্লাহ্র কথা বলে জানো না?”

এই আয়াতে যে বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে তা হচ্ছে, এখানে আরববাসীদের উলংগ অবস্থায় কা’বা শরীফ তওয়াফ করার প্রতি ইংগিত করা হয়েছে। ইতিপূর্বে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। একটি ধর্মীয় কাজ মনে করেই তারা এটি করতো। তারা মনে করতো, আল্লাহ্ তাদেরকে এমনটি করার হুকুম দিয়েছেন।

আল কুরআন করীম উক্ত আয়াতে উলংগ তওয়াফকারীদের জাহেলী আকীদার বিরুদ্ধে মস্ত বড় যুক্তি পেশ করেছে।

এক. আরববাসীরা যদিও নিজেদের কোনো কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের সময় উলংগ হতো এবং একে একটি পবিত্র ধর্মীয় কাজ মনে করতো। কিন্তু উলংগ হওয়াটাকে তারা এমনিতে একটি লজ্জাজনক কাজ বলে মনে করতো এবং এটি তাদের নিকট স্বীকৃত ছিল। তাই কোনো সম্ভ্রান্ত ভদ্র ও অভিজাত আরব কোনো সংস্কৃতিবান মজলিসে বা কোনো বাজারে অথবা নিজের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে উলংগ হওয়াটাকে কোনোক্রমেই পছন্দ করতো না।

দুই. উলংগপনাকে লজ্জাজনক জানা সত্ত্বেও তারা একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠনিকতা হিসেবে নিজেদের ইবাদাতের সময় উলংগ হতো। আর যেহেতু নিজেদের ধর্মকে তারা আল্লাহ্র পক্ষ থেকে প্রেরিত ধর্ম বলে মনে করতো তাই তারা মনে করতো এ আনুষ্ঠানিকতাটিও আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নির্ধারিত। এরই ভিত্তিতে কুরআন করীম এখানে এ যুক্তি উপস্থাপন করেছে যে, যে কাজটি অশ্লীল এবং যাকে তোমরা নিজেরাও অশ্লীল বলে জানো ও স্বীকার করো সে সম্পর্কে তোমরা কেমন করে একথা বিশ্বাস করো যে, আল্লাহ্ এর হুকুম দিয়ে থাকবেন? আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কখনো কোনো অশ্লীল কাজের হুকুম আসতে পারে না। আর যদি তোমাদের ধর্মে এমন কোনো হুকুম পাওয়া যায় তাহলে তোমাদের ধর্ম যে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে প্রেরিত নয়, এটিই তার অকাট্য প্রমাণ।

ইবাদত কী?
আল্লাহ্ তা’আলা এই বিশ্বসহ বিশ্বের যাবতীয় প্রাণীকুল সৃষ্টি করেছেন। রাব্বুল আলামীন তাঁর সৃষ্টির সকল প্রাণধারীদের ভালোবাসেন। সকল প্রাণধারী নিজেদের সৃষ্টির প্রতিদান স্বরূপ রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে। রাব্বুল আলামীন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি প্রাণধারীকে আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন পন্থা শিখিয়ে দিয়েছেন, যাকে এক কথাতেই বলতে পারি ‘ইবাদত’। প্রশ্ন আসতে পারে কোন্ ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’আলার নৈকট্য অর্জন করা যাবে, কীভাবে আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জন করা যাবে?

আল্লাহ্ তা’আলার নৈকট্য অর্জন করার জন্য সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বিভিন্ন উপায় শিখিয়ে দিয়েছেন। নামাজ আদায় করা, আল কুরআন কারীম তেলাওয়াত করা, জিকির আজকান করা, তাসবিহ-তাহলীল করা, দরুদ পাঠ করা, দান খয়রাত করা, প্রতিবেশির খোঁজখবর নেওয়া, অসুস্থ রোগীকে দেখতে যাওয়াসহ হেন কোনো ভালো কাজ নেই যা ইবাদতের আওতায় পড়ে না। নামাজই হচ্ছে সর্বোত্তম ও প্রধানতম ইবাদত। এখানে একটি সুক্ষè বিষয় খেয়াল করার আছে, আর তা হলো ‘নামাজ পড়া নয়’, ‘নামাজ আদায় করা’। নামাজ আদায় করা প্রতিটি সাবালক মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক। রাব্বুল আলামীন নামাজকে সাবালক মুসলমানের জন্য ফরজ করে দিয়েছেন। নামাজকে আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বলেই তা আদায় করতে হবে। তবে নামাজের মধ্যে ফরজ ছাড়াও রয়েছে সুন্নাত ও নফল নামাজ। ফরজ নামাজ ছাড়া অন্য নামাজ মানুষকে তাকওয়া অর্জনে সাহায্য করে। কারণ নামাজই হচ্ছে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ট ইবাদত। শেষ বিচারে আল্লাহ তা’আলা প্রতিজন মানুষের কাছ থেকে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেবেন। ফলে এই ইবাদত করার জন্য বা নামাজ আদায় করার জন্য কোন পোশাক-পরিচ্ছদকে পছন্দ করবেন?

পোশাক সম্পর্ক আমাদের প্রচলিত ধারণা
আপনি বাজারে যাচ্ছেন। বাজারে অনেকে পরিচিতি-অপরিচিত লোকজন থাকে। সে কারনে মোটামুটি সুন্দর ও মানান সই কাপড় পড়ে বাজারে যান। আবার শ^শুর বাড়ি যাচ্ছেন বা ছেলেমেয়ের শ^শুর বাড়ি যাচ্ছেন। তখন মনের মতো পছন্দসই কাপড় পড়ে, শরীরের আতর বা পারফিউম মেখে যাচেছন। অথবা আপনাকে এলাকার চেয়ারম্যান বা জেলা প্রশাসক বা কোনো মন্ত্রী ডেকে পাঠিয়েছেন, তখন সাধ্য মতো সুন্দর ও পরিপাটি কাপড় পড়ে, পারফিউম মেখে যাচ্ছেন। যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি আপনার সাথে সাক্ষ্যাৎ করবেন। তখন কি কাপড় পড়ে যাবেন? নিজের সংগ্রহের সবচেয়ে সুন্দর, মার্জিত ও পরিপাটি কাপড়টা পরিধান করেন, জুতাকে পলিশ দিয়ে চকচক করিয়ে নেন, সুন্দর ম্যাচিং টাই বা শিরোয়ানি পরিধান করেন। যতদূর সম্ভব দামী পারফিউম শরীরে মেখে দুরু দুরু বুকে হাজির হন প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির দরবারে। আর যখন শ্রেষ্ট ইবাদত নামাজে যাচ্ছেন তখন যে কোনো ধরনের পোশাক পরিধান করে যাচ্ছেন। ধারনাটা এই যে, যে কোনো ধরনের কাপড় পড়ে গেলেই নামাজ আদায় হয়ে যাবে। এটা আমাদের প্রচলিত ধারণা। হয়তো নামাজ ঠিকই আদায় হবে কিন্তু তা আল্লাহ্ তা’আলার কাছে কতটুকু গ্রহণ যোগ্য হয়েছে সেটা তো আমরা জানি না।

প্রধানমন্ত্রীদের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতিদেরও রাষ্ট্রপতি, রাজাধিরাজ, এই বিশ্বের স্রষ্টা, আমাদের সবার স্রষ্টা আল্লাহ্ তা’আলার দরবারে হাজিরা দিতে যাওয়ার সময় আমরা পরিধান করি ময়লা, জির্ণ, ছিঁড়া-ফাঁটা জামা বা পাঞ্জাবী নিয়ে। এতো কৃপণতা কেনো?

ইবাদতের প্রতি না আল্লাহ্র প্রতি অবহেলা
নামাজ আদায় করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক যা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। নামাজ আদায় করার জন্য আমরা কোন ধরনের পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত হবো?

মসজিদে আযান হয়েছে, নামাজ আদায় করতে মসজিদে যেতে হবে। এসময় আমাদের শরীরে যা জড়ানো থাকে তা নিয়েই মসজিদে যাই এবং নামাজ আদায় করি। বিশেষ করে শরীরে গেঞ্জি, টি শার্ট, হাফ হাতা শার্ট যাই থাক না কেনো তা নিয়ে আমরা মসজিদে গিয়ে নামাজে শামিল হই। এমনও দেখা যায়, ঘরে সুন্দর পরিপাটি পোশাক আছে ওদিকে হাত না দিয়ে হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তা ময়লা, জির্ণ, ছিঁড়া-ফাঁটা জামা বা পাঞ্জাবি হোক তাতে কোনো আপত্তি নেই, আর পরনে তো লুঙ্গি আছেই। ঘরে আইরন করা পাজামা বা প্যান্ট থাকলেও লুঙ্গির উপরেই আমাদের শেষ ভরসা। শুধু ভরসা না, ওই লুঙ্গি পরিধান করেই আমরা মসজিদে গিয়ে নামাজে সামিল হই। বাড়িতে একা নামাজ আদায় করলে তো কথাই নেই। আবার অনেকক্ষেত্রে দেখ যায় একটি সেন্ডো গেঞ্জি বা হাফ হাতা গেঞ্জি গায়ে তার উপর গোসলের গামছা জড়িয়ে নামাজ আদায় করতে মসজিদে ছুটে যাই। আমাদের দেশের গ্রামের দৃশ্য আরো একটু এগিয়ে। মনে হবে বাড়িতে ওটা ছাড়া অন্য কোনো কাপড় আর নেই।

প্রতিটি মসজিদই আল্লাহর দরবার, আর এই মসজিদেই যাচ্ছি তাঁর আহবানে (আযানে) হাজিরা দিতে, নামাজ আদায় করতে বা নামাজ কায়েম করতে পরিধান করেন আপনার সংগ্রহের সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাপড়টি? এখানে মনস্তাস্তিক বিষয়টি হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন, তারা আপনাকে সামনা-সামনি দেখবেন, যে জন্য সুন্দর ও পরিপাটি কাপড় পরিধান করছেন। আধুনিক, পরিপাটি পোশাক-পরিচ্ছন পরিধান করে নিজেকে আকর্ষণীয় করে যাচ্ছেন। আর ‘আল্লাহ্ আপনাকে দেখছেন না’ এই ভেবেই আল্লাহ্র দরবারে যাওয়ার সময় যাচ্ছে-তাই কাপড় পরিধান করে যাচ্ছেন, এটা কিন্তু সঠিক বিবেচনা ও সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। এটা দিনমজুর, কৃষক, শ্রমিক, কুলি, রিক্সাচালক, গাড়িচালকের জন্য বা নিজে অন্যত্র সফরের সময় হলে সেটা ভিন্ন কথা। কারণ দিনমজুর মাঠে-ঘাটে কাজ করছেন, কৃষক ক্ষেতে কাজ করছেন, শ্রমিক রাস্তায় বা মাঠে কাজ করছেন, রিক্সাচালক রিক্সা নিয়ে রাস্তায় যাত্রী সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, আপনিও কোথাও সফরে আছেন তখন পরনে যাই থাকে তাই নিয়ে নামাজ আদায় করা ছাড়া বিকল্প থাকে না। কিন্তু যখন ঘর থেকে মসজিদে নামাজ আদায় করতে যাচ্ছেন তখন যাচ্ছে-তাই কাপড় পরিধান করা কি সঠিক সিদ্ধান্ত? এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া বা আল্লাহ্ আমাকে দেখছে না এটা ভাবা বোকামী।

মনে রাখতে হবে আল্লাহ আপনাকে, আমাকে, আমাদের কর্মকা- প্রতিটি মূহুর্তে দেখছেন। আপনার, আমার কর্মকা-ের উপর নজরদারী করছেন। ভুলে গেলে চলবে না, আল্লাহ্র তা’আলার ফেরেস্তারা প্রতিমূহুর্তে আপনার কর্মকা- যেভাবে লিখছেন, তেমনিভাবে আল্লাহ্ তা’আলা স্বয়ং আপনাকে দেখছেন।

ইবাদতের পোশাক : আল্লাহর নির্দেশনা কি?
আল্লাহ্ তা’আলা আল ক্বুরআন কারীমের সূরা আল আ’রাফ এর ৩১ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেছেন এভাবে, “হে বনী আদম! প্রত্যেক ইবাদতের সময় তোমরা নিজ নিজ সুন্দর সাজে সজ্জিত হও। আর খাও ও পান করো কিন্তু সীমা অতিক্রম করে যেয়ো না, আল্লাহ্ সীমা অতিক্রমকারীদেরকে পসন্দ করেন না।”

এখানে সুন্দর সাজ বলতে পূর্ণ পোশাক-পরিচ্ছদের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ্র ইবাদাত করার জন্য দাঁড়াবার সময় কেবলমাত্র লজ্জাস্থান ঢাকাই যথেষ্ট হবে না বরং একই সাথে সামর্থ অনুযায়ী নিজের পূর্ণ পোশাক পরে নিতে হবে, যার মাধ্যমে লজ্জাস্থান আবৃত হবার সাথে সাথে সৌন্দর্যের প্রকাশও ঘটবে। মুর্খ ও অজ্ঞ লোকেরা নিজেদের ভ্রান্তনীতির ভিত্তিতে ইবাদাতের ক্ষেত্রে যেসব কাজ করতো এবং এখনো করে চলছে, এ নির্দেশে তার প্রতিবাদ করা হয়েছে। তারা মনে করে উলংগ বা অর্ধ-উলংগ হয়ে এবং নিজেদের আকার আকৃতিও বেশভূষা বিকৃত করে আল্লাহ্র ইবাদাত করা উচিত নয়। আল্লাহ্ বলেন, নিজেকে সুন্দর সাজে সজ্জিত করে এমন আকার আকৃতি ধারণ করে ইবাদাত করতে হবে যার মধ্যে উলংগপনা তো দূরের কথা অশ্লীলতার লেশমাত্রও যেন না পাওয়া যায়।

আল্লাহ্ তা’আলার নির্দেশার সাথে সাথে আল্লাহ্র রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশনা অনুযায়ী পোশাক পরিধান করা উচিত। আল্লাহ্র রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরুষদেরকে পায়ের গোড়ালির নিচে পায়জামা পরতে নিষেধ করেছেন। একটি হাদীসে উল্লেখ আছে, “পায়ের গোড়ালির নিচে পোশাক পরলে ওই অংশ জাহান্নামের আগুনে পুড়ানো হবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭৮৭)

পোশাকের ব্যাপারে আরো নির্দেশনা পাওয়া যায়। যেমন হাদীসে বলা হয়েছে, “সাদা পোশাক পরিধান করো কারণ এটা সর্বোত্তম এবং মৃতকে সাদা পোশাকে জড়াও।” (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৪০৫০)

ইবনে জাবির রা. বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট এলেন এবং এক ব্যক্তির মাথার চুল এলোমেলো দেখলেন। তখন তিনি এরশাদ করলেন, ‘এই লোকের কি এমন কিছু নেই, যা দিয়ে সে তার মাথা পরিপাটি করবে?’ অপর এক ব্যক্তিকে ময়লা কাপড় পরিহিত দেখে বললেন, ‘এর কাছে কি এমন কিছু নেই যা দিয়ে তার কাপড় ধৌত করবে।’-আবু দাউদ, হাদীস : ৪০৫৬

উপসংহার
আল্লাহ্ তা’আলা মানুষের জন্য কাপড় সৃষ্টি করেছেন। বিশেষ করে মানুষের লজ্জাস্থান ঢাকা এবং নিজের সৌন্দর্য প্রদর্শনের জন্য কাপড়। কোথায় কোন ধরনের পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করা যাওয়া উচিত সে বিবেচনা বোধ আমরাই তৈরি করে নিয়েছি। রাব্বুল আলামীন যেখানে স্বয়ং বলেছেন, “হে বনী আদম! প্রত্যেক ইবাদতের সময় তোমরা নিজ নিজ সুন্দর সাজে সজ্জিত হও।” সেক্ষেত্রেও আমরা আল্লাহ্র দরবারে হাজিরা দেওয়ার সময় ঘরের ময়লা, অপরিচ্ছন্ন ও অসুন্দর কাপড়টা নিয়ে যাচ্ছি কেনো? আমাদের এই বোধ-বিবেচনা কবে নাগাদ পরিবর্তন হবে? বা আদৌ পরিবর্তন হবে কিনা?

আসুন, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি বা বিয়াইর বাড়ি যাওয়ার সময় আমরা যে পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করি বা সাজসজ্জা করি বা নিজেকে আকর্ষণীয় করি আল্লাহ্ তা’আলার দরবারে হাজির হওয়ার সময় তার চেয়ে উত্তম পোশাক নির্বাচন করতে চেষ্টা করি। রাব্বুল আলামীনের নির্দেশ অনুযায়ী নিজের সংগ্রহের সবচেয়ে সুন্দর, পরিপাটি ও উত্তম পোশাক পরিধান করে ইবাদাতে সামিল হওয়ার চেষ্টা করি।

পোষাক যেহেতু আল্লাহ্ তা’আলার নেয়ামত তাই তা পরিধান করে রাব্বুল আলামীনের শুকরিয়া আদায় করা উচিত। আল্লাহ্ তা’আলার নির্দেশনা অনুযায়ী পোশাক পরিধান করতে এবং সেসব পোশাক পরিধান করে ইবাদাত-বন্দেগী করতে রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সাহায্য করুন। আল্লাহ্র সকল ধরনের নির্দেশনা আমল করতে আমাদেরকে তওফিক দান করুন। রাব্বুল আলামীন আমাদের প্রচেষ্টাকে কবুল করুন। আমাদের অজ্ঞতা, আমাদের অনিহাকে ক্ষমা করুন। আমিন, সুম্মা আমিন।

লেখক : গবেষক, ইতিহাস লেখক, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী।

সাহায্যকারীগ্রন্থ-
তাফহীমুল কুরআন, ১৯শ খ-, সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী র., অনুবাদ : আবদুল মান্নান তালিব। আধুনিক প্রকাশনী, ঢাকা। ২৩তম প্রকাশ মার্চ ২০১০।

  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •