কক্সবাজারের রামুর চাকমারকুল আল-জামিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার সাবেক মুহতামিম মাওলানা সিরাজুল ইসলাম কর্তৃক গণমাধ্যমে ‘মাদ্রাসার সভা’র কথা উল্লেখ করে বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার এর প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন রামু চাকমারকুল আল-জামিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম মাওলানা মুফতি আবদুর রাজ্জাক।

তিনি গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন, ১৬ মে কক্সবাজারের স্থানীয় সংবাদপত্রে ‘শিক্ষকদের সভার অভিমত অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হবেন না, মুহতামিম মাওলানা সিরাজুল ইসলাম সিকদারের নেতৃত্বে চাকমারকুল মাদ্রাসার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে’ শিরোনামে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাজানো একটি সংবাদ আমার দৃষ্টি গোচর হয়েছে। মাওলানা সিরাজের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যেপ্রনোধিত ও বিভ্রান্তিকর। মাদ্রাসায় আদৌ এ ধরণের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। বাইরের ছবি এনে তিনি মাদ্রাসার বৈঠক হিসেবে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করেছেন। নানা ধরণের মিথ্যা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে মাদ্রাসার শান্তি-শৃংখলা নষ্ট করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্ঠি করতে সাবেক মুহতামিম মাওলানা সিরাজ এসব কারসাজি শুরু করেছেন। যা ইতিপূর্বে এলাকার গণমান্য ব্যক্তিবর্গের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

মূলত: ১৯৪৬ সালে চাকমারকুল আল-জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় জমিদার ও দানবীর মোহাম্মদ আলী সিকদার। সময়ের ব্যবধানে মাদ্রাসাটি দক্ষিণ চট্রগ্রামের ঐতিহ্যবাহি একটি কওমী আকিদার সর্বোচ্চ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতার মৌখিক অছিয়ত অমান্য করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠাতার আত্ত্বীয় পরিচয়ে ২০১৫ সালে মাদ্রাসার মুহতামিমের পদ দখল করেন মাওলানা সিরাজুল ইসলাম। অথচ প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী সিকদার ও তার ছেলেদের মৌখিক অছিয়ত ছিল যে, কোন আত্ত্বীয়-স্বজন যাতে মাদ্রাসার দায়িত্বে না থাকে। আলেম, ওয়ায়েজ, বক্তা হিসেবে এলাকায় তার কোন পরিচিতি নেই। তিনি একজন ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তার কাছ থেকে অনেকেই টাকা পাওনা রয়েছে। একজন পাওনাদার ইতিমধ্যেই তার বিরুদ্ধে মামলার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। কওমী মাদ্রাসার রেওয়াজ অনুযায়ী- মাদ্রাসার মুহতামিম হতে হাক্কানি, আমানতদার, তাওকয়া, পরহেযকার হতে হয়। কিন্তু মাওলানা সিরাজুল ইসলাম এ ধরনের কোন গুন ও যোগ্যতার অধিকারি না হলেও প্রতিষ্ঠাতার নাতি পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করে মুহতামিমের পদ দখল করেন। কলা-কৌশলে মুহতামিমের পদে আসার পর থেকেই মাদ্রাসা পরিচালনায় চরম স্বেচ্ছাচারি ও অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে মাদ্রাসার তহবিল তছরূপ করেন। তার কারণে মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষকও অনিয়ম-দুর্নীতি, বলৎকারসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন।

অন্যদিকে যেসব শিক্ষক এসব অপকর্মের প্রতিবাদ করেন তারা তার রোসানলে পড়েন। ইতিমধ্যেই ৫/৬ জন অত্যান্ত মেধাবী ও ভাল শিক্ষককে তিনি বিতাড়িত করেছেন। এভাবে মাত্র কয়েক বছরে মাদ্রাসাটিতে বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে পিছিয়ে নিচ্ছেন। সর্বশেষ এসব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে গত ২৭ এপ্রিল চাকমারকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মাদ্রাসার মোতওয়াল্লি গ্রুপের সদস্য নুরুল ইসলাম সিকদারের সভাপতিত্বে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে মুহতামিমের অনিয়ম-দুর্নীতি ও মাদ্রাসা পরিচালনায় শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা সিরাজুল ইসলাম সহ কয়েকজন শিক্ষকের অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া ও মাদ্রাসা পরিচালনায় ব্যর্থতার বিষয়টি প্রমানিত হয়।

ফলে মাদ্রাসাটি পরিচালনায় সংস্কারের জন্য মাদ্রাসার চার জন শিক্ষকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত, ২৩ সদস্য বিশিষ্ট মজলিসে শুরা পুর্নগঠন, ৭ সদস্য বিশিষ্ট মজলিসে এলমি পুর্নগঠন, ৭ সদস্য বিশিষ্ট মজলিসে আমেলা পুর্নগঠন এবং ৩ সদস্য বিশিষ্ট অডিট কমিটি পুর্নগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। এছাড়া বৈঠকে মাদ্রাসার প্রধান পৃষ্ঠপোষকের পদ থেকে আল্লামা শফি হুজুরকে বাদ দেয়া, মাদ্রাসা তহবিলের ৫০ লাখ টাকার ব্যয়, ইচ্ছামতো রেজুলেশন তৈরী, মুহতামিম সিরাজের আয়-ব্যয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার এক পর্যায়ে মুহতামিম মাওলানা সিরাজ এ বিষয়ে ক্ষমা প্রার্থণা করেন এবং নিজেকে সংশোধন করবেন বলে অবহিত করেন। এসময় মাওলানা আব্দুর রাজ্জাককে সহকারি মোহতামিম হিসেবে দায়িত্ব প্রদান এবং অভিযুক্ত বিষয়ে মুহতামিম নিজেকে সংশোধন করে নিবেন বলে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। একই সাথে গৃহীত সিদ্ধান্ত যথাযথ নিয়মে বাস্তবায়ন করবে মর্মে মোতয়াল্লি গ্রুপকে দুই দিনের মধ্যে লিখিতভাবে অবহিত করে ২০ রমজানের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য মোহতামিমকে পরামর্শ প্রদান করেন।

অন্যথায় মোতয়াল্লি গ্রুপ ব্যবস্থা গ্রহন করবেন বলে জানানো হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত থেকে সিদ্ধান্তের কপি গ্রহন করেন মুহতামিম। কিন্তু মাদ্রাসার মুহতামিমের পদ দখলে রাখতে মাওলানা সিরাজ তার নিজের ভাই চাকমারকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম সিকদারকে ম্যানেজ করে গোপনে ৩ মে তারিখে মাদ্রাসার প্যাডে ২০ রমজানের মধ্যে মজলিসে শুরার বৈঠক ডাকা সম্ভব নয় বলে চিঠি দেন চাকমারকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম সিকদারকে। ভাই চেয়ারম্যানকে দিয়ে বিবৃতিও প্রকাশ করিয়েছেন। মোতওয়াল্লি ও দাতা গ্রুপকে কিছুই অবহিত না করে মাদ্রাসায় এখতিয়ার বর্হিভূত কার্যক্রম চলমান রাখায় মোতয়াল্লি গ্রুপের সদস্যরা ৫ মে শিক্ষকদের সাথে বৈঠক করেন মাদ্রাসা কার্যালয়ে। সেখানে মুহতামিম মাওলানা সিরাজুল ইসলামকে সাময়িক অব্যহতি দিয়ে সহকারি মুহতামিম মাওলানা আবদুর রাজ্জাককে ভারপ্রাপ্ত মুহতামিমের দায়িত্ব দেয়া হয়। ভারপ্রাপ্ত মোহতামিম আবদুর রাজ্জাক ওমরা পালন এবং মাদ্রাসার কাজে গত ৮ মে সৌদি আরব যাওয়ার সুযোগে সাবেক মুহতামিম মাওলানা সিরাজ নিজেকে মাদ্রাসার মুহতামিম দাবী করে নানা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে গণমাধ্যমে ভুয়া সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রেখেছেন। অবৈধভাবে কালো টাকা দিয়ে দাতা সদস্য, মুতওয়াল্লি সদস্য, শিক্ষক ও এলাকাবাসীকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করছেন। যা এলাকায় হাস্যরসের সৃষ্টি করছে। এছাড়া মাওলানা সিরাজ একটি অস্ত্র নিয়ে মাদ্রাসায় মহড়া দিচ্ছেন। সেখানে ছাত্র-শিক্ষকদের ভয়-ভীতি দেখাচ্ছেন। তাদের হুমকি দিয়ে তার পক্ষাবলম্বনের জন্য চাপ প্রয়োগ করছেন। যা একজন সাবেক মুহতামিমের কর্মকান্ড হতে পারে না। মুতওয়াল্লি, দাতা ও এলাকার মাদ্রাসা পরিচালানার কাজে নিয়োজিত গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ মাওলানা সিরাজকে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সাময়িক অব্যহতি দিয়ে আমাকে (মাওলানা আবদুর রাজ্জাক) ভারপ্রাপ্ত মুহতামিমের দায়িত্ব অর্পন করেন।

মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম হিসেবে আমি সকলের উদ্দেশ্যে জানাতে চাই যে, আমি মাদ্রাসার কাজ ও পবিত্র উমরা পালনে সৌদি আরব অবস্থান করছি। সুতারাং সাবেক মুহতামিমের সাথে মাদ্রাসার স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোন লেনদেন অথবা কর্মকান্ড না করার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি। এছাড়া সাবেক মুহতামিমের ছড়ানো গুজবে কাউকে বিভ্রান্ত হয়ে অস্থিতিশীল কোন কর্মকান্ডে না জড়াতে এবং সবাইকে শান্তি-শৃংখলা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে অনুরোধ জানাচ্ছি। একই সাথে মাদ্রাসার স্বার্থে মাদ্রাসার সুনাম রক্ষায় এলাকাবাসীকেও এগিয়ে আসার আহবান জানাচ্ছি।

মুফতি মাওলানা আবদুর রাজ্জাক
ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম
চাকমারকুল আল-জামিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা, চাকমারকুল, রামু, কক্সবাজার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •